Saturday, September 24, 2016

ওরা যা ভেবে দেখে না

মানুষের ভাবনার জায়গাটা যেন ছোট হয়ে আসছে। সবাই ভাবছে, তবে ভাবনার পেছনের ভাবনাগুলো ভাবার সময় কারও নেই। যেমন ধরুন- বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জঙ্গিবাদ। বিভিন্নজন বিভিন্ন ধরনের জটিল চিন্তার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ নির্মূলের বিষয়টির সমাধানের পথ খুঁজছে। বিষয়টিকে বাস্তবতার নিরিখে সমাধান করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অপূর্ণতা কাজ করছে। গতানুগতিক ভাবনা থেকে বিষয়টিকে অন্যভাবে সমাধানের চিন্তা করা যায়। সাম্প্রতিককালে হলি আর্টিজানের বিষয়টি আমরা উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি। ধরুন একজন শিক্ষিত তরুণের কথা। এখানে আমি বড় বড় বই পড়া শিক্ষিত তরুণের কথা বলছি, কিন্তু স্বশিক্ষিত তরুণের কথা বলছি না। তরুণটি যদি গতানুগতিক শিক্ষার সঙ্গে স্বশিক্ষিত হতো তাহলে সে জঙ্গিবাদে জড়ানোর আগে অনেক বিষয় চিন্তা করত। মনে করুন, সেই তরুণটির পরিবারে যদি মা, বাবা, তিনটি ছোট বোন ও দুটি ছোটভাই থাকে তাহলে ব্যাপারটা কী হতো?
আমরা কিন্তু সেই ভাবনার জায়গাটা তরুণদের মধ্যে তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। হলি আর্টিজানে যে জঙ্গিরা মারা গেল তাদের বাবা-মাসহ পরিবার তাদের শনাক্ত করার জন্য এগিয়ে এলো না। বাবা-মায়ের যারা আদরের দুলাল ছিল, তাদের লাশও গ্রহণ করল না। কবর দেয়ার সময়ও দেখা মিলল না। এটি গেল ঘটনার একটি দিক। ঘটনার আরেকটি দিক আছে। আর সেই দিকটির কথা যদি আমরা তরুণদের মানসপটে ধারণ করাতে পারি, তবে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এখন দেশে সব মানুষের কাছে জঙ্গিবাদীদের পরিবারগুলোর পরিচয় পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন তাদের অবস্থা কী হয়েছে, তা যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তবে দেখব জঙ্গি তরুণটির তিন বোনের বিয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ এমন কেউ কি আছে যারা জঙ্গির বোনের সঙ্গে বা তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে যাবে? বোনেরা গুণবতী, রূপবতী হলেও সবাই মুখ ফিরিয়ে নেবে। তার মানে তিন বোন যে আগামীতে সোনার সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তা আর কখনও বাস্তবে রূপ নেবে না। ছোট দুই ভাই হয়তো বড় সরকারি চাকরির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিল; কিন্তু কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উচ্চমানের শিক্ষিত হলেও জঙ্গির ওই দুই ভাইকে চাকরি দেবে? বাস্তবতা বলে তারা চাকরি থেকে বঞ্চিত হবে। সমাজে বাস করতে হলে পাড়া-প্রতিবেশীসহ অন্য আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।
পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজন কি জঙ্গির সেই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবে? বাস্তবতা হল, পারবে না। ধরে নিলাম ওই পরিবারের সবাই ফেরেশতার মতো মানুষ। তারপরও তারা যখন রাস্তাঘাটে প্রয়োজনের তাগিদে চলাফেরা করবে, সবাই তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে। বিদেশে ভাইবোনরা হয়তো উচ্চশিক্ষার চিন্তা করেছিল। কিন্তু বাইরের দেশগুলো কি জঙ্গির ভাইবোনদের বিদেশে যাওয়ার লাইসেন্স দেবে? কঠিন সত্য হল, দেবে না। আর ওই পরিবারটিও কি মাথা উঁচু করে সমাজে বাঁচতে পারবে? পারবে না। তার মানে ওই তথাকথিত শিক্ষিত তরুণটি বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে তার পরিবারের বিপর্যয়ের কথা একবারও ভাবেনি। যদি একবারও ভাবত তবে সে কখনোই নিজেকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করত না। এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। তার মানে দাঁড়াল- সে নিজেকেও শেষ করল আর পরিবারকে অতল সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেল। কাজেই সমাজে সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের এ বিষয়গুলো তরুণদের বোঝানোর দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা কোনো ধর্মই সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদের কথা বলে না। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন- তাদের কোনো ধর্ম নেই, সন্ত্রাসই তাদের ধর্ম।
২. একটা বিষয় না বললেই নয়। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও সেদেশের জনগণকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তেমন একটা সচেতন হতে দেখা যায়নি। কিন্তু আবহমান সংস্কৃতিতে লালিত বাংলাদেশের সব মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে সোচ্চার হয়ে উঠেছে, তা আসলেই আমাদের গৌরবের একটি বিষয়। কেননা বাঙালিরা কখনও উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেয়নি, দেবে না। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ দেখে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু হতবাকই হয়নি, তাদের মধ্যে নিরাশা তৈরি হয়েছে। এটাই আমাদের অর্জন।
৩. জঙ্গিবাদীরা বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে হত্যা করেছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনো ধর্ম ছিল না। তবে একটি ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। একজন শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন ফেরেশতার মতো নিষ্পাপ শিশুটির জানার কথা নয় সে কোন ধর্মের পরিবারে জন্মগ্রহণ করবে। সবকিছুই নির্ধারণ করে রেখেছেন সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিকর্তা যা কিছু করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন। সব ধর্মের মানুষ এ কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। ফলে বাপ-দাদার যে ধর্ম সেই ধর্মে লালিত-পালিত হয়ে একটি শিশু একজন মানুষে পরিণত হয়। তাহলে জঙ্গিবাদীরা যখন একটি ধর্মের মিথ্যা লেবাস পরে অন্য ধর্মের মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করে তখন তা সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে যায়। আবার তাদের মধ্যেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব। তাই যে ধর্মের কথা বলে তারা আক্রমণ করেছে, সেই ধর্মে বিশ্বাসী মানুষরাও তাদের থেকে রেহাই পায়নি। এজন্য বঙ্গবন্ধুর একটি কথাকে আমরা ধারণ করতে পারি। তিনি বলেছিলেন- ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। প্রত্যেক মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। অর্থাৎ প্রকৃত ধর্মপরায়ণ হবে। আর ধর্মপরায়ণ মানুষের কাছে সব মানুষই সুরক্ষিত।
ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)

No comments:

Post a Comment