Friday, September 2, 2016

ফুটপাথে প্রতিরাতে চলে ইজ্জতরক্ষার লড়াই

নিশুতি রাতে নিঃশব্দে গাড়িটা কখন এসে দাঁড়িয়েছিল, তা টের পাননি ওঁরা৷ মুনিরার চিত্কারে ঘুম ভাঙে কয়েক হাত দূরে শুয়ে থাকা রশিদা বানুর৷ দেখেন, দু'জন মিলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মুনিরাকে৷ চিত্কার করে একাই এগিয়ে গিয়েছিলেন রশিদা৷ কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও সেই রাতের স্মৃতি এখনও ভোলেননি কলকাতার গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নীচের বাসিন্দা রশিদা বানু৷ ওই ফ্লাইওভারের নীচের আর এক বাসিন্দা বাপি পালের মুখ থেকে শোনা যায় বাকি ঘটনা৷ মুনিরাকে বাঁচাতে এগিয়ে যেতেই দুষ্কৃতীরা রশিদার উপর ক্ষুর চালিয়ে পালায়৷ হাতে আজও সেই ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি৷ গড়িয়াহাট মোড়ের কাছেই একটি ইলেকট্রনিক্স বিপণির কাচের জানালায় দাঁড়িয়ে টিভির পর্দায় ব্রেবোর্ন রোডের কিশোরীর ঘটনা জেনেছেন এই অঞ্চলের ফ্লাইওভারের নীচে বসবাসকারীরা৷
কিন্ত্ত এমন ঘটনা অবাক করেনি তাঁদের৷ রশিদা মণ্ডল, বাপি পাল, ছোটু ঘোষ, রশিদা বানোরা জানালেন, রাস্তার গাড়ির সংখ্যা কমতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে শুরু করে তাঁদের হূদস্পন্দন৷ কখনও মদ্যপানের চিত্কার, কখনও পার্টি-ফেরত যুবকদের কটুক্তি, কখনও নিশাচর নেকড়েদের লোলুপ দৃষ্টি --- প্রতিদিন, প্রতিরাতেই সহ্য করতে হয় তাঁদের৷ গভীর রাতে মাঝেমাঝেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে 'ভদ্রলোকেরা ' গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে তাঁদের৷ সতর্কতা আর একতাই সম্বল রাস্তায় সংসার পেতে বসা এই মানুষগুলোর৷ তাই সবাই চেষ্টা করেন কাছাকাছি থাকতে৷ গভীর রাতে অপরিচিত কাউকে সন্দেহজনক ভাবে আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখলেই সবাই মিলে তেড়ে যান৷ আইনরক্ষক? নাঃ , আইন তাঁদের রক্ষা করার জন্য নয় বলে জানালেন এখানকার ফুটপাতে জন্মানো ছোটু ঘোষ৷ বললেন, 'পুলিশ সতর্ক হলে আমরা নিরাপদে থাকতে পারি৷ এর বেশি কিছু বলব না৷
আমাদের এখানেই তো থাকতে হবে, ওঁদের দয়ায়৷ ' শহরের অন্য প্রান্তে মৌলালিতে যাঁদের রাত কাটে ফুটপাথে শুয়ে, তাঁদের অভিজ্ঞতাও আলাদা কিছু নয়৷ এখানকার শাহজাহান মণ্ডল, আমিনা বিবি, রোশনরা জানালেন, মাঝরাতের শিকারিদের থাবা থেকে ছোটদের রক্ষা করাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ৷ বেশির ভাগ দিনই রাতের দিকে পুলিশি টহলদারি দেখা যায় না৷ আমিনা জানালেন, 'দিনের বেলাতেই অনেক সময়ই দেখি কিছু লোক খুব খারাপ নজরে দেখছে আমাদের মেয়েদের দিকে৷' রাতের দিকে ওই মুখগুলোকে মাঝেমাঝেই ফিরতে দেখেন তাঁরা৷ বোঝেন, মুহূর্তের অসতর্কতায় সব শেষ হতে পারে৷ তাই রাত গভীর হতেই সতর্কতার মাত্রা বাড়ে ফুটপাথবাসী নারীদের৷ শুধুই পার্টি-ফেরতদের লালসাময় হাত নয়, অন্ধকারের সুযোগ নিতে ছাড়ে না ট্যাক্সিচালকদের একাংশও৷ মাঝেমাঝে তাই ফুটপাথবাসীদের দঙ্গলের কাছে নিঃসাড়ে থামে ট্যাক্সির চাকা৷ কঠিন পরিস্থিতি ওঁদের প্রতিদিন শিখিয়েছে কাউকে না বিশ্বাস করতে৷ খিদে জয় করার চেয়েও তাই ইজ্জতরক্ষার লড়াইকেই গুরুত্ব দেন কলকাতার পথবাসীরা৷
>>>এইসময় @কালের কণ্ঠ অনলাইন

No comments:

Post a Comment