Thursday, September 8, 2016

চামড়া পাচারের আশঙ্কা by এমএম মাসুদ

বাংলাদেশ থেকে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা করছেন ট্যানারি ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি কারণে চামড়া পাচারে সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর, লবণের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও কাঁচা চামড়া কিনতে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার অনিশ্চয়তায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হলে কোরবানি পশুর চামড়ার একটা বড় অংশ পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারও এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ বছর ইতিমধ্যে ৩৩ লাখ পশু কোরবানির জন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে। এ বছর কোরবানির জন্য সব মিলিয়ে ১ কোটি চার লাখ পশু তৈরি আছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার। আর চামড়া শিল্পের ৬৫ শংতাশ কাঁচা চামড়া কোরবানি ঈদে সংগৃহীত হয়ে থাকে।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, চামড়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য। চামড়া যাতে পাচার না হয়, সেজন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পাচার সম্পর্কে ট্যানারি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুই বছরের বেশি সময় গরু জবাই বন্ধ থাকায় ভারতের ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়ার সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের বামতলা, কানপুর, চেন্নাই ও পাঞ্জাবে কয়েক হাজার ট্যানারি আছে। ২০১৪ সালের মে মাসে দেশটি বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে ভারতে গরুজবাই নিষিদ্ধ করে। এতে ট্যানারিগুলোয় কাঁচা চামড়ার সংকট তৈরি হতে থাকে। সমপ্রতি সংকট কাটাতে কাঁচা চামড়া আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। আর এ সুযোগে আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চামড়া পাচারকারী চক্র।
জানা গেছে, রাজধানীর বাইরের জেলাগুলো থেকেই আসে বিরাট অংশের কাঁচা চামড়া। পরিবহন খরচ মেটানোর ভয়ে সীমান্ত অঞ্চলের চামড়া স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার জন্য ভারতে চামড়া বিক্রি করা তুলনামূলক সহজ।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এবার চামড়া পাচারের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ এবং তা স্থানীয় পর্যায়ে নিশ্চিত করা না গেলে পার্শ্ববর্তী দেশে চামড়া পাচার হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ভারতে কাঁচা চামড়া সংকটে পাচারকারী সিন্ডিকেট চক্র ভালো দর পাওয়ার আশায় এবার আগেই সক্রিয় হয়েছে।
যেসব কারণে পাচারের আশঙ্কা: নতুন ট্যানারি নির্মাণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, কাঁচা চামড়া কিনতে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার অনিশ্চয়তায় কারণে ভারতে চামড়া পাচারের শঙ্কা করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। গেল বছরের কাঁচা চামড়া কিনতে সরকার ৪০০ কোটি টাকা দেয়। এ ঋণের অর্ধেকও পরিশোধ করতে সক্ষম হয়নি ট্যানারি মালিকরা। গত বছরের ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় নতুন করে ঋণ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। এক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিলের দাবি জানিয়েছে তারা। তা না হলে চামড়া পাচারের আশঙ্কা থাকবেই।
লবণ: কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের অতি জরুরি উপাদান লবণ। গতবার এই সময়ে ৭৪ কেজি লবণের যে বস্তা ৬৫০ টাকায় মিলছিল এবার তার দাম ১৩০০ টাকা। ফলে লবণের দাম বেড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। লবণের দাম না কমলে চামড়ার দাম পড়ার পাশাপাশি অন্য সময়ের চেয়ে এবার বেশি পরিমাণে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এ ছাড়া ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাজারে এখন প্রতি কেজি লবণের দাম ২৫ থেকে ৩৮ টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। এ প্রেক্ষাপটে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য এলসি খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব হেদায়তুল্লাহ আল মামুন।
কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা জানান, একটি গরুর চামড়ায় প্রায় ১০ কেজি লবণ ব্যবহার করতে হয়। সে হিসাবে আগে একটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ বাবদ যেখানে ৮৭ টাকা ব্যয় হত, সেখানে বর্তমান বাজার দরে লাগবে প্রায় ১৭৫ টাকা।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, কাঁচা চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় লবণ সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের লবণ চাষিরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয় বিবেচনায় রেখে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় লবণ আমদানির জন্য অনুমতি দেয়া হয়েছে।
সাভারে স্থানান্তর: হাজারীবাগের ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর জটিলতা নিরসন না হওয়ায় এবারের ঈদে চামড়া সংগ্রহে ভাটা পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। হাজারীবাগে ১৯৪টি ট্যানারি রয়েছে। এসব ট্যানারিতে সারা বছর সংগ্রহকৃত চামড়ার ৬০ শতাংশই ঈদুল আজহায় সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩০টির মতো ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর হয়েছে। হাজারীবাগে চামড়া প্রবেশে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় এ বছর সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।
এ সমস্যা সমাধানে আগামী তিন মাস হাজারীবাগে ট্যানারিগুলোর কার্যক্রম চালানো জন্য দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ।
মুদ্রার দরপতন: ডলারের দরপতন ও মন্দা বাজার বিবেচনায় এ বছর গত বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ দাম কম নির্ধারণ করার প্রস্তাবনা রেখেছে ব্যবসায়ীরা। এতে করে বেশি দাম পাওয়ার আশায় ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা আরও বেশি দেখা দিয়েছে। গেল বছর গত বছর চামড়ার সর্বনিম্ন প্রতি বর্গফুট ছিল চামড়া ভেদে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
বিএফএলএলএফইএ’র চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, গত বছরের ৩৩ শতাংশ চামড়া অবিক্রিত পড়ে আছে। এর আগে আমাদের চামড়া শিল্প এমন দুর্দিনে পড়েনি। তিনি আশা করেন, ব্যাংকগুলো শর্ত ছাড়াই ঋণ দেবেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৭৩২.৯৭ মিলিয়ন ডলার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৮.০৫ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। এ ছাড়া চামড়া রপ্তানিতে উৎসাহ প্রদানের জন্য সরকার নগদ আর্থিক সহায়তা শতকরা ১২.৫ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment