মিরপুর
রূপনগর এলাকার একটি সেলুনে ক্ষৌরকারের (নাপিত) কাজ করেন আলামিন (ছদ্মনাম)।
দিন শেষে তার রোজগার পাঁচশ’ বা তারও বেশি টাকা। কিন্তু যেদিন কোন দলের
ক্রিকেট খেলা থাকে ওই দিন তার ব্যস্ততা যেন একটু বেশি। সেভ বা চুল কাটার
কাজ করার সময় ফোন দিয়ে মাঝে মধ্যেই তিনি কিছু খবর নেয়ার চেষ্টা করেন।
আলামিনের মতো রাজধানী ঢাকাতে এমন হাজার হাজার তরুণ, ছাত্র, ব্যবসায়ীসহ
বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ এসব বাজিতে (জুয়া) জড়িয়ে গেছেন। অনেকে সর্বস্ব
খোয়াচ্ছেন। কিন্তু এনিয়ে তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বরং নানা কায়দায় অর্থ
সংগ্রহ করে নতুন জুয়া খেলায় মেতে উঠেন। কয়েক জন ক্রিকেট জুয়াড়ির সঙ্গে আলাপ
করে জানা গেছে, এজেন্টের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে জুয়াড়িরা খেলা শুরুর আগে কয়
উইকেটে কোন্ দল জিতবে, কোন্ খেলোয়াড়ের কত ওভার মেডেন হবে, কত ওভারে কত
রান হবে, কোন্ খেলোয়াড় হাফ সেঞ্চুরি বা সেঞ্চুরি করবে এসব বিষয়ে বাজি ধরা
হয়। খেলা শেষে এজেন্ট তার সুবিধাজনক স্থান ও সময়ে পরাজিত জুয়াড়ির কাছ থেকে
টাকা নিয়ে জয়ী জুয়াড়ির কাছে হস্তান্তর করে। এজেন্টরা জয়ী জুয়াড়ির কাছ থেকে
টাকা হস্তান্তরের বিনিময়ে কমিশন পান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য এ
কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় তারা বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করেন। অনুসন্ধানে
জানা গেছে, রাজধানীর কিছু অভিজাত হোটেল, রেস্তরাঁ, বাজার, নামী সরকারি
প্রতিষ্ঠান জুয়াড়িদের নিরাপদ আড্ডাস্থল। এছাড়া, রাজধানীতে প্রভাবশালীদের
নিয়ন্ত্রিত কিছু স্পটও এসব জুয়াড়িদের সেফ জোন। অনেক জুয়াড়ি ওই সব স্থানে
বসে বাজি ধরে। এরপর খেলা উপভোগ করে ফলাফল জেনে নিরাপদ জায়গাটি ত্যাগ করে।
অনেক কর্মচারীকে অফিসে বসেই ক্রিকেট জুয়ায় মত্ত থাকতে দেখা যায়। গত
শুক্রবার এক বাজারে গিয়ে দুই তরকারি বিক্রেতার আলাপে ক্রিকেট জুয়ার বিষয়টি
জানা যায়। তারা জানান, ক্রিকেট জুয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আগে তরকারি
বিক্রেতা, নাপিত, হোটেল কর্মচারী, ফল বিক্রেতা, বিভিন্ন পরিবহনের শ্রমিক
(হেলপার ও কন্ডাক্টর) নির্মাণ শ্রমিকসহ বিভিন্ন নিম্ন পেশার লোকেরা ক্রিকেট
জুয়া খেলতো। কিন্তু সম্প্রতি স্কুল ও কলেজগামী কোমলমতি ছেলেরা ক্রিকেট
জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছে। অনেক স্কুল-কলেজের ছাত্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে ক্রিকেট
জুয়ার জালে আটকে গেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনেক ক্রিকেট জুয়াড়ি
জুয়ার টাকা যোগাতে গিয়ে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে
জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া স্কুল ও কলেজের কোমলমতি ছাত্ররা বিপথগামী হচ্ছে। একই
সঙ্গে জুয়ার হারজিৎকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা দিন দিন
বাড়ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল ও
মে মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়াম লীগ (আইপিএল) খেলা চলাকালীন
সময়ে সারা দেশে ‘ক্রিকেট জুয়া’র বিস্তার ঘটে। ওই সময় রাজশাহী মহানগরীতে
জুয়ার আসর সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেশের শীর্ষ এক
গোয়েন্দা সংস্থা বিশেষ প্রতিবেদন পাঠায়। ওই প্রতিবেদনে রাজশাহী মহানগরীর
শালবাগান এলাকার বনবিভাগ অফিসের পূর্ব পার্শ্বে ও রাজপাড়া থানাধীন জিপিও
এলাকাসহ ৭/৮টি স্থানে প্রতিদিন জুয়ার আসর বসে বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে
বনবিভাগ অফিসের পূর্ব পার্শ্বের স্পটে অর্ধ কোটি টাকার জুয়া খেলা চলে। এতে
বলা হয়, ছাত্র ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ওই জুয়াতে অংশ নেয়।
জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হয়ে দুই জন আত্মহত্যা করে। প্রতিবেদনে কয়েক জন
সরকারদলীয় নেতার নাম উল্লেখ করে বলা হয়, রাজশাহী মহানগরীর জিপিও,
লক্ষ্মীপুর, রাজপাড়া এলাকায় জুয়ার আসর পরিচালনা করা হয়। এসব জুয়ার আসরে
৩০/৪০ লাখ টাকার জুয়ার আসর বসে। বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী মহানগরীর
এসব জুয়ার আসর ছাড়াও বাস টার্মিনাল, কাজলা, বিনোদপুর, কাশিয়াডাঙ্গাসহ
কয়েকটি স্থানে প্রতিদিন জুয়ার আসর বসে। এদিকে গত এপ্রিলে আইপিএল চলাকালীন
সময়ে পুলিশ জুয়ার আসর থেকে একজন মোটরযান শ্রমিককে আটক করে। এনিয়ে ওই সময়
হুলুস্থুল কাণ্ড হয়। বাস ধর্মঘটের মতো ঘটনা ঘটে। এছাড়া একই মাসে বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ২০ লাখ টাকা জুয়ায় হেরে কীটনাশক পানে আত্মহত্যা
করে। রাজশাহীর ওই জুয়া মে মাসের শেষ পর্যন্ত চলে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা
গেছে, রাজশাহী আইপিএল শেষ হওয়ার পর জুয়ার এজেন্টরা ঢাকা মহানগরীতে এসে
তাদের আস্তানা তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন স্পটে তারা ভাগ হয়ে বাজি কার্যক্রম
পরিচালনা করছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। ক্রিকেটে
বাজি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার
(মিডিয়া) মুহাম্মদ ইউসুফ আলী মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে
জুয়া খেলা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। এসব বিষয় বিভিন্নভাবে আমরা ম্যাচের আগে পরে
শুনে থাকি। কিন্তু লিখিত অভিযোগ না আসায় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। এ রকম
কিছু পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
>>>মানবজমিন

No comments:
Post a Comment