Monday, October 17, 2016

বস্তিবাসী কত দিন পুষ্টিহীন থাকবে?

ক্রিস্টা রাডের
অভূতপূর্ব নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সবার জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করার পূর্বশর্ত হলো বস্তিবাসী মানুষের, বিশেষত নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, নইলে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে চরম মূল্য দিতে হবে। ঢাকা মহানগরের সড়কগুলোতে মধ্যাহ্নের যানজট দেখে যে কেউ সহজেই অনুমান করতে পারে বাংলাদেশের শহরগুলো কতটা দ্রুত ও ব্যাপক হারে বর্ধনশীল। এই হারে নগরায়ণ চলতে থাকলে আগামী ২৫ বছরে শহুরে মানুষের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ আর ২০৪০ সাল নাগাদ গ্রামের চেয়ে শহরের জনসংখ্যা হবে বেশি। নগরায়ণ সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এবং আরও অগণিত মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসবে। এটা নিঃসন্দেহে সুসংবাদ। তবে গ্রাম থেকে শহরমুখী এই জনস্রোত যানজট ছাড়াও নানামুখী সংকট নিয়ে আসবে। এত মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবারের সংস্থান কীভাবে হবে? প্রতি ১০ জন নগরবাসীর মধ্যে ৬ জনেরই বাস বস্তিগুলোতে; এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ঢাকা মহানগরে বস্তিবাসীর হার সর্বোচ্চ। চিন্তার বিষয় হলো, শহরের দরিদ্রতম অংশের প্রকৃত পরিস্থিতি এখনো আমাদের অজানা। এ অবস্থায় নগরমুখী এই জনস্রোত আমাদের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে। জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ২০১৩ সালে ঢাকা, বরিশাল ও সিরাজগঞ্জ শহরের বস্তিগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি–বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। চলতি বছরের শুরুর দিকে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে শহরের বস্তিগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি-সংক্রান্ত অনেক বাস্তবতা নতুন আঙ্গিকে ও বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, শহরের বস্তিগুলোতে শিশুদের পুষ্টির অবস্থা শহরের অন্যান্য এলাকা বা গ্রামের তুলনায় অনেক খারাপ। শহরের বস্তিগুলোতে শিশুদের শতকরা ৪৪ ভাগ বয়সের তুলনায় খর্বকায় এবং প্রায় প্রতি ৫ জনে ১ জন (১৬%) উচ্চতার তুলনায় কৃশকায়। ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে বসবাসকারী প্রতি ৫ জনের মধ্যে ২ জন তীব্র থেকে মাঝারি ধরনের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এটা দেশের অন্যান্য দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এখানে একটা বৈপরীত্য লক্ষণীয়। যদিও বস্তিগুলোতে নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায় এবং দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের মতো বস্তিবাসীরও সেই সব খাবার কেনার মতো ক্রয়ক্ষমতা আছে;
কিন্তু তারপরও তা বস্তিবাসীদের পুষ্টি নিশ্চিত করে না। যা এখনো আমাদের অজানা তা হলো, এই বস্তিবাসীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ, কত মূল্যমানের খাবার খাচ্ছে বা কিনতে পারছে। এই গবেষণাতে শহরের বস্তিতে বসবাসকারী নারীদের স্বতন্ত্র সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বস্তিগুলোর অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের নারীরা সচ্ছল পরিবারগুলোর নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ কৃশকায়। তদুপরি আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ১৪-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের প্রতি ৫ জনে ২ জন (৪১%) উচ্চতার তুলনায় অনেক বেশি কৃশকায়, যেখানে গর্ভধারণে সক্ষম নারীদের (১৪-৫৯ বছর) মাত্র ২০% উচ্চতার তুলনায় কৃশকায়। এই তথ্য-উপাত্তগুলোতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। তবে এ গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করবে। অপুষ্টিজনিত সমস্যা কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের নয়; বরং সামগ্রিকভাবে এটি একটি জাতীয় সমস্যা। অপুষ্টিজনিত সমস্যা জাতীয় স্বাস্থ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে; উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বছরে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী?
প্রথমত, শহরের বস্তিগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী প্রকল্প আছে, কিন্তু সেগুলো শহর কিংবা শহরের বস্তিগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত নয়। বাংলাদেশ সরকার তার প্রধান প্রকল্পগুলোতে নারী ও শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে নারী ও শিশুদের জন্য নগদ অর্থ ও পুষ্টি–বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুরা এ থেকে বহুলাংশে উপকৃত হয়েছে। পরিবারের সবার খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে নারীর ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, সরকার যেহেতু ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের ২ কোটি শিক্ষার্থীকে স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামের আওতায় আনতে চায়, সেহেতু শহরের বস্তিতে বসবাসকারী অপুষ্ট শিশুদের এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। এ কথা সত্য যে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে এসব শিশুর যে ক্ষতি হয়ে গেছে, এক বেলা নাশতা বা খাবার দিয়ে তা পূরণ করা যাবে না, তবে তা ক্ষুধা নিবারণ ও পড়াশোনায় মনোযোগ আনতে তা সহায়ক হবে। এই প্রজন্মের জন্য যদি উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত পুষ্টির সুযোগ তৈরি করবে। তৃতীয়ত, নারীরা যেখানে শহরভিত্তিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেখানে অসম মজুরি আর অপর্যাপ্ত আনুষঙ্গিক সুবিধা তাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ ক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হলে সবাই উপকৃত হবে। এখনই সময় শহরের বস্তিগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার। এর ফলে শুধু আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নই ত্বরান্বিত হবে না, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করার পথও সুগম হবে।
ক্রিস্টা রাডের: বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ প্রতিনিধি।

No comments:

Post a Comment