![]() |
| প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং |
চীন
ভৌগোলিকভাবে আমাদের নিকট প্রতিবেশী। অর্থনৈতিকভাবে আরও নিকটতর এক দেশ। এর
পরিপ্রেক্ষিত থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফর নানা
কারণেই উল্লেখযোগ্য বলে চিহ্নিত হবে। কূটনীতির ভাষায় আমরা যাকে বলি
পারস্পরিকতা, এই সফরের পটভূমিতে সেটি ছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১০
সালে একবার এবং ২০১৪ সালে আরেকবার চীন সফর করেন। তারপর থেকেই আমরা আশা করে
আসছি যাতে চীনের দিক থেকে উচ্চপর্যায়ের ফিরতি সফর হয়। সেই প্রত্যাশাই এই
দফায় বাস্তবায়িত হলো। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার
ক্ষেত্রে একে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই দেখতে হবে। চমৎকার একটা বিষয়ও আমরা
দেখলাম। চীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় আসার আগেই বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাঁর
বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন গণমাধ্যম মারফত। এর মাধ্যমে তিনি
চীনের জনকূটনীতি চমৎকারভাবে তুলে ধরলেন। এতে তিনি চীনের প্রত্যাশা ও
আগ্রহের সারাংশ তুলে ধরেছেন। এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাশার সাযুজ্যও আমরা
দেখতে পেয়েছি। সি বলেছেন, তিনি রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে যথেষ্ট
গুরুত্ব দেন। আমাদের দিক থেকেও আমরা এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছি।
দুই
দেশের সম্পর্কের গতি, গভীরতা, ব্যাপ্তি—সবকিছুর ক্ষেত্রে উঁচু রাজনৈতিক
পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা সহায়ক। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এবার দেশটির
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সরকারি ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বও ছিলেন। এর মাধ্যমে দুই
দেশের সকল পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ
মিলল, উঁচু পর্যায়ের আলাপ ও বোঝাপড়ার পরিসর তৈরি হলো। সুতরাং কূটনৈতিক ও
রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে এই সফর যেকোনো বিচারেই খুবই সার্থক। চীনের বর্তমান
প্রেসিডেন্ট নিজ সরকার ও দলের মধ্যে খুবই প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। চার
বছর ধরে তিনি দুটি কাজ করেছেন, যা চীনের সঙ্গে বাইরের দুনিয়ার সম্পর্ক
পুনর্নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। চীনের আগের নেতৃত্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ছিল
মোটা দাগে অন্তর্মুখী। সি চিন পিং একদিকে নিজেদের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে
টেকসই করায় সক্রিয় আছেন। অন্যদিকে বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলিষ্ঠ করায়ও নিরন্তর কাজ করছেন। গত বছর তিনি ‘এক অঞ্চল,
এক পথ’ নীতির কথা পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করলেন। এর মাধ্যমে চীন তার
উন্নয়নের সঙ্গে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের উন্নয়নের
যোগসূত্র রচনা করতে চাইছে। ৭০টি দেশ এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। এ ছাড়া চীন ৪
হাজার কোটি ডলারের সিল্ক রোড তহবিল গঠন করেছে। এশীয় বিনিয়োগ ব্যাংক
প্রতিষ্ঠা করেছে।
এটা সি চিন পিংয়ের
বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক দর্শনেরই পরিচায়ক। অর্থনীতির যে বলিষ্ঠতা তারা প্রদর্শন
করেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে চীন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে বাণিজ্য শক্তিশালী করতে
চায়। দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চায়। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে
হয়তো তারা তাদের প্রভাবও বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক
সহযোগিতার বলয় সৃষ্টি করা জরুরি। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম)
অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণেও চীন আগ্রহী। বাংলাদেশও আগ্রহী। বাংলাদেশ আশা
করে, ভারত ও মিয়ানমারও ইতস্তত ভাব কাটিয়ে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কাজ করবে।
এতে সবারই লাভ। কেননা, এটি কেবল এ অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নকেই বেগবান করবে
না, নিরাপত্তা প্রশ্নেও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। আমরা
ইতিমধ্যে নিম্নমধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি, আমরা উন্নত দেশে পরিণত হতে
চাইছি। আমাদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আরও সংশ্লিষ্ট হওয়া দরকার। আমরা
বাণিজ্য, প্রযুক্তি আমদানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগিতায়
অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন করতে চাই। আমাদের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো
সমুদ্রসীমা। সামুদ্রিক অর্থনীতি তথা ব্লু ইকোনমিকে সজীব করার মধ্য দিয়ে সে
লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারি। এর জন্য অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের
আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। চীন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ
অর্থনীতির দেশ। চীনের বিশাল বাজারে আমাদের জন্য সুযোগ রয়েছে। আমাদের বড়
আকারের বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
কৃষি,
জ্বালানি, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, কাঠামো ও পরিকাঠামো, সমুদ্র, আঞ্চলিক
সংযোগ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণসহ বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে আমাদের যোগাযোগ
বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের এসব আকাঙ্ক্ষা যে চীন মনোযোগের
সঙ্গে দেখতে আগ্রহী, চীনের প্রেসিডেন্টের সফরের মাধ্যমে তা প্রদর্শিত হলো।
যে ২৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, আশা করা যায় তার ভিত্তিতে আগামী
পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগ আসবে। অর্থাৎ
বছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার করে আসার সম্ভাবনা। একে কাজে লাগাতে হলে আমাদের
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতাকে ঢেলে সাজাতে হবে। অভ্যন্তরীণ
সামর্থ্যের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে আমাদের হতাশ হতে হয়। এসব ঘাটতি বিশ্লেষণ
করলে আমরা বুঝতে পারব কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। সেটা
মানবসম্পদে যেমন তেমনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতায় আমাদের গভীরভাবে
এগোতে হবে। বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতিতে চীনের সহযোগিতার সম্ভাবনা আছে।
এসব লক্ষ্য যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়ায় খুবই দক্ষ ও পেশাদারি কূটনীতি এবং জাতীয়
ঐকমত্য দরকার হবে। চীনের প্রশ্নে ইতিমধ্যে যে ঐকমত্য আছে, তা আগামী দিনে
জোরালো কূটনীতি পরিচালনায় পথ দেখাতে পারে। এই সফর তার জন্য উত্তম সুযোগ
তৈরি করে দিয়েছে।
আমাদের যা প্রয়োজন
তা মেটানোর সামর্থ্য চীনের আছে। এটা উভয় দেশের অর্থনৈতিক সাযুজ্যের
কারণেই। তবে বড় অঙ্গীকার পেলাম বলে খুশি হওয়ার কিছু নেই। অঙ্গীকার
বাস্তবায়নে যা করণীয় তা করতে বিফল হলে বিনিয়োগ থমকে যেতে পারে। তাই
সম্ভাবনাকে নিজেদের পক্ষে টেনে বাস্তবায়নে নিয়ে যাওয়া হলো বড় কাজ। সেখানে
খানিকটা চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে। দেশীয় সামর্থ্যের কথা বলেছি। পাশাপাশি কী
ধরনের শর্তে এই সহযোগিতা, তা দেখতে হবে। তার জন্য দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর
বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগের ধরন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কী শর্তে
বিনিয়োগ নেব, তার নীতিগত কাঠামো আমাদের থাকা উচিত। সেই কাঠামোর ভেতরেই
সহযোগিতা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই সে পথে
এগোনো সম্ভব। প্রশ্ন হলো ভূরাজনৈতিক সমীকরণের বেলায় চীনের এই উপস্থিতি কী
প্রভাব ফেলতে পারে? এটি গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ
হলেও চীনের জন্য এটা বড় ঘটনা নয়। চীন ইতিমধ্যে ভারতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
২০১৪ সালে সি চিন পিং যখন ভারত সফর করেছিলেন, তখন ২ হাজার কোটি ডলারের
বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছিলেন। পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগের
অঙ্গীকার ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের। শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও এমন। কাজেই
বাংলাদেশে বিনিয়োগ দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। এতে অতি উচ্ছ্বসিত
হওয়ার ব্যাপার নেই। কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও
চীনের সম্পর্ক কৌশলগত মৈত্রীর পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্টও
অনুরূপ কথা বলেছেন। বাংলাদেশ বিষয়ে আগ্রহী আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর একে
নেতিবাচকভাবে দেখা অযৌক্তিক। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নত হলে, বাংলাদেশের
মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়লে, সেই সুবিধা ভারতও পাবে। ভারতের এক
অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের যোগাযোগ সুগম করায়ও ভূমিকা রাখবে এ দেশের
অবকাঠামোর উন্নয়ন। এটা সবার জন্যই সমান সুযোগ বয়ে আনবে। চীনের সঙ্গে এই
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নত করায় উপযোগী বা অনুকূল
হবে। ভারত-বাংলাদেশ-চীন প্রাকৃতিক দুর্যোগ,
সন্ত্রাসবাদসহ
‘নন ট্র্যাডিশনাল থ্রেট’ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। দক্ষিণ
এশিয়ায় শান্তির পক্ষের বাতাবরণ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-চীন জোরদার সম্পর্ক কারও জন্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে না। সি
চিন পিং বলেছেন, চীন পরস্পরের সুবিধাজনক ক্ষেত্রগুলোতে একসঙ্গে কাজ করায়
আগ্রহী। চীনারা সূক্ষ্ম কূটনীতির পথে চলে। মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে গ্যাস
পাইপলাইন চীনের ইউনানে নিয়ে যাওয়া নিয়ে জটিলতা হয়েছিল। ভারত যখন এ ব্যাপারে
নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করল তখন চীন কিন্তু তাদের অংশীদার করে নিল।
শ্রীলঙ্কায় চীনের বড় বিনিয়োগ নিয়েও ভারতের উদ্বেগ ছিল। সেই সূত্র ধরেই
রাজাপক্ষে গত নির্বাচনে হেরে গেলেন। এখন চীন সেই প্রকল্পে ভারতকে জড়িত করে
নিয়ে বিরোধিতার প্রশমন ঘটাল। চীনারা যে সূক্ষ্ম কূটনীতি করে, তাতে আমার
মনে হয় না ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সংঘাতের দিকে যাবে। চীন বরং ভারতকে
সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশে কাজ করতে চাইবে। এখানে বাংলাদেশের উচিত দক্ষ কূটনীতি
ও জাতীয় স্বার্থের বিবেচনা নিয়ে বহুপক্ষীয় ভারসাম্য বজায় রাখায় কাজ করা।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছে, চীনের সঙ্গেও রাখছে। আওয়ামী লীগের
সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও অনুরূপ কথা গতকাল
বলেছেন। আগামী দিনেও এই বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও বাড়ার ইঙ্গিতই আমরা পাচ্ছি।
বাংলাদেশ এভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগিতার সম্পর্কের যোগসূত্র হিসেবে
ভূমিকা রাখবে।
এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত। ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট।
এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত। ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট।

No comments:
Post a Comment