Saturday, October 8, 2016

কলকাতার পূজায় ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রা

মধ্য কলকাতা থেকে পুরোনো রাস্তা ধরে বিমানবন্দরে যেতে উল্টোডাঙ্গার রাস্তার ধারে এগোতেই পরিচিত গানটা কানে ভেসে এল। ‘আমি বাংলায় গান গাই...’। গানের সুর ধরেই এগিয়ে যাওয়া। কিছুটা এগিয়ে গেলে কণ্ঠটাও পরিষ্কার। বাংলাদেশের শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবুর। শ্রবণযন্ত্রে মুগ্ধতা নিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই চমক, আরে এই তো আমাদের চিরচেনা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা! দুই বাংলার সর্বজনীন উৎসবকে এবার মেলাতে চলেছে উল্টোডাঙ্গার তেলেঙ্গাবাগান সর্বজনীন পূজা কমিটি ৷ ৫১তম বছর পেরিয়ে এ বছর তাদের পূজার থিম ‘ওপারের সাজে এপারের পুজো’৷ আয়োজকেরা বলছেন, কাঁটাতারের বেড়া যে সংস্কৃতিকে আলাদা করতে পারেনি, তা বোঝাতেই এই উদ্যোগ ৷ বছরের পর বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে নববর্ষের সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রায় যা যা দেখা যায়, তার অনেক কিছুই এখানে মিলল। ঢাকার রাজপথ, রঙের কাগজের মুখোশ তো আছেই, আরও আছে বাঙালির গ্রামীণ ঐতিহ্য আর লোকজ সংস্কৃতির গল্পগাথা নিয়ে তৈরি হাতি, ঘোড়া, গরুসহ পানসি নৌকা, রাজা, রানি, উজির-নাজিরের মুখ, টেপা পুতুলের মুখ, প্যাঁচা, খরগোশ ও ছোট পাখি। লোকজ ধারায় বানানো বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল, মাটির সরা, জাতীয় ফুল, পশুপাখি, কাঠের লন্ঠন, নৌকাবাইচ। তরুণ শিল্পীদের আলপনায় সেজে ওঠে ঢাকার রাস্তা। আর থার্মোকল, প্লাই ও কাগজ দিয়ে সেজে উঠছে এদিকের মণ্ডপ। এই আয়োজনের শিল্পনির্দেশক পার্থ ঘোষ ও সিদ্ধার্থ ঘোষ। পার্থ ঘোষ বলেন,
‘বাংলাদেশের বর্ষবরণ উৎসব সাড়ম্বরে উদ্‌যাপিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে তেমনভাবে বাংলার নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয় না৷ অথচ একসময় এপার বাংলাতেও (পশ্চিমবঙ্গে) সাড়ম্বরে উদ্‌যাপন করা হতো নববর্ষ৷ কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে বাংলা নববর্ষের জৌলুশে অনেকটাই ভাগ বসিয়েছে ইংরেজি বর্ষবরণ৷ পয়লা বৈশাখের চেয়ে ফার্স্ট জানুয়ারিকেই সেলিব্রেশনের জন্য এগিয়ে রেখেছে এপারের তরুণ প্রজন্ম৷ গঙ্গাপারের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে এবার পদ্মাপারকে স্মরণ করছি আমরা।’ অপর শিল্পী সিদ্ধার্থ ঘোষ জানান, মূল মণ্ডপ দেখতে ময়ূরের মতো৷ থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলোকসজ্জা হয়েছে৷ প্রতিমা অবশ্য একচালার সাবেকি৷ গত বুধবার থেকেই এই মণ্ডপে উৎসুক মানুষের আসা-যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবারের ভিড় রীতিমতো উপচে পড়া। আসছে নানা বয়েসি মানুষ। সল্টলেক এলাকা থেকে আসা সন্দীপ দাস একজন চিত্রশিল্পী। মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন সবকিছু। তিনি বলেন, ‘সব সময় শুনে আসছি ঢাকার নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা। একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজের একটা বাড়তি আগ্রহও ছিল। এখানে আসে আগ্রহটা আরও বেড়ে গেল, এত বর্ণিল, বিচিত্র হয় ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রা!’ সপ্তর্ষি রায়বর্ধন, শ্যাম বিশ্বাস, নিবেদিতা ও চন্দ্রাণী দল বেঁধে এসেছিলেন বেশ খানিকটা দূর শহরের অন্য প্রান্ত—নাকতলা থেকে। তাঁদের সবার একই ভাষ্য, ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা শুনেই এত দূর থেকে আসা। বিষয়ের বৈচিত্র্য আর জাঁকজমক বর্ণিল হওয়ার কারণে এ আয়োজন শহরের অন্য আয়োজনগুলোর তুলনায় বেশি সাড়া ফেলেছে। ক্যামেরায় পুরো আয়োজন ধরে রাখা কিংবা মুঠোফোনে সেলফি চলছিল অবিরাম। এক পাশে রাখা বিশাল ব্যানার আর প্রচারপত্রে আয়োজকদের বক্তব্য দর্শকদের তথ্য দিচ্ছে। এ ব্যানারের শেষ বাক্যটি হলো ‘আমাদের মণ্ডপে এলে সবার সঙ্গে আপনাদেরও সবাইকে গলা মেলাতে হবে রবিঠাকুরের এই গানের সঙ্গে, “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি...”।’ তেলেঙ্গাবাগানের এ মণ্ডপের মতো কলকাতা শহরের অন্য এলাকায়ও এবার পূজায় থিমের ছড়াছড়ি। যেদিকেই চোখ যায়,
সেদিকেই নিত্যনতুন থিম। গোলপার্ক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পূজায় এবারের থিম ‘হিংসার আগুন’। পঞ্চাননতলা রোডের ১৯ পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির আয়োজনটি পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের ‘হাট’ কবিতা অবলম্বনে সেজে উঠেছে। নদীর তীরে খেয়াঘাট, গাঁয়ের মানুষের কোলাহল—সকালের হাটের সবকিছুই এখানে যেন জীবন্ত। গড়িয়া বৈষ্ণবঘাটার থিম ‘ফিরে পাওয়া’। পাটকাঠি, হোগলা, ঝিনুক, শামুক, বটপাতা, ডাব, নারকেল, সুপারির খোলা ইত্যাদি দিয়ে সেজে উঠেছে এই পূজামণ্ডপ। চালচিত্র তৈরি হয়েছে বিভিন্ন বাতিল জিনিস দিয়ে। ‘বেলঘরিয়ার ৮২তম বর্ষে পড়া এবারের থিম ‘মাটির টানে’। এখানে মণ্ডপজুড়ে একটি গ্রাম্য পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। উত্তর শহরতলির মালিপাড়ার পূজামণ্ডপ এবার সেজে উঠেছে প্রাচীন মহেঞ্জোদারো সভ্যতার আদলে। আড়িয়াদহ বিন্ধ্যবাসিনীতলায় প্রগতি সংঘের এবারের ৭৭তম বর্ষের থিম ‘অতীতের ক্যানভাসে’। এখানে মূল মণ্ডপটি একটি ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়ির আদলে তৈরি। আর একটি বটগাছের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছেন দুর্গা। থিমের পাশাপাশি এবার কলকাতার পূজায় আলোর ছড়াছড়ি বেশ। চন্দননগরের আলোর শিল্পীদের কল্যাণে এবার কলকাতার পূজায় আলো শিল্পের প্রাধান্য পেয়েছে। শহরের ছোট-বড় রাস্তাগুলো সেজেছে আলোর বর্ণমালায়। কত-কী দেখা গেল এখানে—দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেন, চা-বাগান, ভিক্টোরিয়া প্যালেস, জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে হাওড়া ব্রিজ, ফ্লাইওভার, রাইটার্স বিল্ডিং, নিউমার্কেট, বরফঢাকা কাশ্মীর, দিঘার সৈকত, টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা, ক্রিকেট, ডরেমন, পোকেমন, হ্যারিপটারসহ বিচিত্র বিষয়।

No comments:

Post a Comment