Wednesday, October 5, 2016

লন্ডনের সোনালী ব্যাংক এখন দেশের বোঝা

ব্যবসায় ধারাবাহিক মন্দা, কর্মকর্তাদের অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের জরিমানা আরোপ—সবই ঝুঁকিতে ফেলেছে সোনালী ব্যাংক ইউকের কার্যক্রমকে। এ কারণে একে একে বন্ধ হয়ে চালু থাকছে মাত্র দুটি শাখা। লোকসানে পড়ে ইতিমধ্যে দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকটি। এরপর আবারও নতুন করে ৩৫০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকটিতে থাকা সোনালী ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পড়েছে ঝুঁকির মধ্যে।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা বা সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের (এসএমটি) সভায় বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে একজন মহাব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে। এর আগে আগামী মাসের শুরুতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড পরিদর্শন করবে ব্যাংকটি। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ইউকে সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ অবস্থায় সোনালী ব্যাংক ইউকের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সোনালী ব্যাংকের মূল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে লন্ডনে। এখান থেকে লোকজন গিয়ে সভা করে চলে আসেন, খোঁজ-খবর রাখেন না। যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁরাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। স্থানীয় প্রবাসীরাও ব্যাংকটির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ ছাড়া আইনও তো কড়াকড়ি হয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকটি। এখন সরকারকেই ব্যাংকটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রবাসীদের সেবা ও ঋণপত্রের নিশ্চয়তা দিতে ২০০১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যে যাত্রা শুরু করে সোনালী ব্যাংক। এতে সরকারের শেয়ার ৫১ শতাংশ ও সোনালী ব্যাংকের শেয়ার ৪৯ শতাংশ। এরপর ২০১৩ সালের ২ জুন সোনালী ব্যাংক ইউকের ওল্ডহ্যাম শাখা থেকে সুইফট কোড জালিয়াতির মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার (প্রায় ২ কোটি টাকা) হাতিয়ে নেওয়া হয়। এই অর্থ এখনো আদায় করতে পারেনি ব্যাংকটি। সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যের ওল্ডহ্যাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ইকবাল আহমেদ ব্যাংকের ভল্ট থেকে অর্থ চুরি, গ্রাহকের হিসাব থেকে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলন ও গ্রাহকের অর্থ হাতিয়ে নেন। এভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ স্থানীয় পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। তবে এখন পর্যন্ত অর্থ উদ্ধার এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বন্ধ হয়ে যায় শাখাটি। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে তাঁর যে সম্পত্তি আছে, তা ব্যাংকে সংযুক্ত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ওল্ডহ্যাম শাখা বন্ধের পর গত ৩০ জুন বন্ধ করে দেওয়া হয় লুটন শাখা। এরপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর বন্ধ হয়ে গেছে কেমডেন শাখাও। এ ছাড়া ব্র্যাডফোর্ড শাখা বন্ধ করে দেওয়া হবে আগামী ৩১ ডিসেম্বর। ফলে ২০১৭ সাল থেকে চালু থাকবে প্রধান শাখা ও বার্মিংহাম শাখা। এ ছাড়া গ্রাহকদের থেকে আমানত না নেওয়ার বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ৮ মে পর্যন্ত সোনালী ইউকের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন আতাউর রহমান প্রধান। এ সময়েই ব্যাংকটিতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি-অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এরপরও তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সোনালী ইউকে সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার পর শুরুর দিকে ব্যাংকটির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য প্রবাসী-আয় এলেও ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করে। ২০১২ সালে প্রবাসী-আয় বা রেমিট্যান্স আসে ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০১৩ সালে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং ২০১৪ সালে আসে ৪ কোটি ডলার। তবে ২০১৫ সালে রেমিট্যান্স কমে দাঁড়ায় মাত্র সাড়ে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ কারণে ২০১৫ সালে ব্যাংকটি লোকসানে পড়ে।
জানা গেছে, ২০১১ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করে ৪ লাখ ৩ হাজার পাউন্ড। ২০১২ সালে মুনাফা বেড়ে হয় ৭ লাখ ৬৬ হাজার পাউন্ড। ২০১৩ সালে মুনাফা করে ৩০ লাখ ২৩ হাজার পাউন্ড, ২০১৪ সালে মুনাফা ছিল ২০ লাখ ১৫ হাজার পাউন্ড। তবে ২০১৫ সালে এসে লোকসান করে ১৭ লাখ পাউন্ড (প্রায় ১৭ কোটি টাকা)। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনের কড়াকড়ির কারণে রেমিট্যান্স কমে গেছে। এ ছাড়া আইনকানুন কঠোর হওয়ায় প্রবাসীরাও সবাই অর্থ জমা রাখতে পারছেন না। তাই শাখাগুলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। অনিয়ম, জরিমানার সঙ্গে শাখা বন্ধের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তিনি দাবি করেন। জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও সোনালী ব্যাংক মিলে প্রতিষ্ঠানটিতে আরও ৩৫০ কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা মূলধন হিসেবে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটিতে মূলধন ও বিনিয়োগ বাবদ প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ১ হাজার ৩৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা আছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমটি সভার কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন অনিয়ম সত্ত্বেও সোনালী ইউকের কাছে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকৃত ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার সংরক্ষণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে প্রতিবছর ১০০ কোটি টাকা আয় থেকে সোনালী ব্যাংক বঞ্চিত হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এক সভায় জানিয়েছিলেন ব্যাংকটির সাবেক এমডি প্রদীপ কুমার দত্ত।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলোয় বৈদেশিক মুদ্রা ধারণের সীমা (নেট ওপেন পজিশন) তার সংবিধিবদ্ধ মূলধনের ২০ শতাংশ। কিন্তু সোনালী ব্যাংক ৩০ শতাংশের ওপরে বৈদেশিক মুদ্রা ধারণ করছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছেও জবাবদিহি করতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এ বিষয়ে ব্যাংকটির সাবেক এমডি প্রদীপ কুমার দত্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছিলেন, সোনালী ব্যাংকের রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সোনালী ইউকে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ তহবিল প্রত্যাহার করা হলে সোনালী ইউকের পক্ষে ব্যবসা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হবে না। এদিকে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘনের দায়ে সম্প্রতি সোনালী ব্যাংক ইউকেকে ৫৫ লাখ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা) জরিমানা করেছে যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথোরিটি (এফসিএ) ও প্রুডেনশিয়াল রেগুলেটরি অথোরিটি (পিআরএ)। পাশাপাশি কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে বেশ কিছু শর্তও বেঁধে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, জরিমানা মাত্র আরোপ করা হয়েছে, পরিশোধ করতে বেশ কিছু সময় পাওয়া যাবে। এ রকম জরিমানা সেখানে মাঝেমধ্যেই আরোপ করা হয়। আমরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব, কীভাবে অর্থ পরিশোধ করা যায়। সোনালী ইউকের চেয়ারম্যান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান এখনই এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন। চলতি মাসের শেষের দিকে তিনি বিষয়টি তুলে ধরবেন বলে প্রথম আলোকে জানান।

No comments:

Post a Comment