Tuesday, October 4, 2016

যারও পর নির্ভর করে জাতির ভবিষ্যৎ

কয়েক সপ্তাহ যাবৎ মনে হচ্ছে, শিগগিরই একখণ্ড কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে বাংলার আকাশে। মেঘটি কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে ভালোয়-ভালোয় কেটেও যেতে পারে, অথবা সেই মেঘ থেকে একটি ঘূর্ণিঝড় উঠবে, যা সাময়িকভাবে এই জনপদকে অশান্ত করতেও পারে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে একটি নতুন নির্বাচন কমিশনের। এই পৃথিবী নির্বাচন কমিশন ছাড়া অচল নয়। অশোক, আকবর অথবা আলিবর্দীর সময় বাংলায় শুধু নয়, কোনো দেশেই নির্বাচন কমিশন ছিল না। তাতেও এ দেশের মানুষের দিন চলে গেছে। বড় বড় মন্দির-মসজিদ নির্মিত হয়েছে। অসাধারণ সেসব স্থাপত্যশিল্প। সুতরাং কোনো দেশে গণতন্ত্র থাকতেই হবে এবং সে জন্য একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনও থাকতে হবে, এমন কথা কেউ দিব্যি দিয়ে বলতে পারে না। তবে যেহেতু এ দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বিপুল রক্তের বিনিময়ে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তাই গণতন্ত্রকামী মানুষ জীবনের আশা ছাড়তে পারে—গণতন্ত্রের আশাটা ছাড়তে চায় না। কিন্তু সব জাতির সব আশা পূরণ হবে, তেমন কথা নেই।
কোনো দেশে গণতন্ত্র থাকলে একটি ‘স্বাধীন’ নির্বাচন কমিশন থাকতেই হবে, এমনও কথা নেই। এখনো অনেক গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নেই। তবে সেসব দেশে অবধারিতভাবে নির্বাচন হয় এবং সে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। আমাদের দেশেও পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে কোনো নির্বাচন কমিশন ছিল না। ১৯৫৪ সালের সবচেয়ে কারচুপিমুক্ত নির্বাচন, যে নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন এক অপরিচিত তরুণের কাছে পরাজিত হন, সেই নির্বাচনটি কোনো নির্বাচন কমিশনের অধীনে হয়নি। জেলা ও মহকুমা প্রশাসকেরাই পরিচালনা করেছেন। পরাজিত হয়ে নুরুল আমীন ওই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সাবডিভিশনাল অফিসারের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। কারণ, তাঁরা নির্দোষ। তাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। মুখ্যমন্ত্রী যত মানসিক যন্ত্রণাতেই ভোগেন না কেন, পরাজয় মেনে নিয়েছেন।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কাকে বলে তার একটি দৃষ্টান্ত চুয়ান্নর সাধারণ নির্বাচন। আমরা লেখালেখি করতে গিয়ে অনুসন্ধান করে দেখেছি, তখন বাংলাদেশের ১৭ জেলায় যে ১৭ জন জেলা প্রশাসক ও ১৭ জন পুলিশ সুপার ছিলেন, তাঁদের একজনেরও ঘুষ খাওয়ার অভ্যাস ছিল না, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ করার মনোবৃত্তিও ছিল না। ওই পদে তাঁরা চাকরি করছেন তাতেই তাঁরা সম্মানিত বোধ করতেন। তাঁরা জানতেন, দুর্নীতি করলে তাঁদের পদমর্যাদার হানি ঘটবে। একজন ডেপুটি কমিশনারের চেয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার বহু উঁচুতে। যেকোনো সাংবিধানিক পদ অনেক বড় জিনিস। অন্য সরকারি কর্মকর্তার মতো নয়। তাঁকে শপথ নিতে হয়। দায়িত্ব গ্রহণের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনারকে শপথ নিতে হয়। সে শপথ মনে মনে নয়, একেবারে উচ্চারণ করে বলতে হয়: আমি অমুক ‘সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে আমি আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত আমার পদের কর্তব্য পালন করিব; ...আমি আমার সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দিব না।’
শপথ বড় সাংঘাতিক জিনিস। তা যে শুধু দেশের সব মানুষের উদ্দেশ্যে করা হয় তা নয়, বস্তুত তা করা হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে। যে শপথ ভঙ্গ বা বরখেলাপ করা ঘোরতর পাপ। একবার শপথ নেওয়ার পর যতক্ষণ তিনি পদে থাকেন, কোনো কিছুতেই প্রভাবিত হতে পারেন না। তাঁর পুত্রও যদি কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হন, তাঁর পিতাও যদি, এমনকি তাঁর শ্বশুরও যদি হন, তাঁদের স্বার্থে কোনো কিছু করার নৈতিক অধিকার তাঁর নেই। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির নির্দেশও তিনি মানতে বাধ্য নন—সরকারি দলের মোটরসাইকেল আরোহী ক্যাডারদের আবদার তো দূরের কথা। সে ক্যাডারের কোমরে যতই পিস্তল বা হাতে শটগান থাকুক। তাঁর জীবন যেতে পারে, নৈতিক অবস্থানে নড়চড় হবেন না।
কিন্তু আজ একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের চার মাস আগেই কেন শান্তিকামী মানুষের হৃৎকম্প শুরু হয়েছে। মিডিয়া কেন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে ছুটছে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আমরা কী ভাবছি তা জানতে, প্রধানমন্ত্রীকেও সংবাদ সম্মেলনে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। ওদিকে বিএনপি একটি বড় ও পাকা গণতান্ত্রিক দল—তারাও হাহাকার করছে। তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষায় তাদের পাশে গিয়ে না দাঁড়িয়ে সরকারকে হুকুম জারি করছে তাদের মনের মতো একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের ধারণা, সরকারই তার মনের মতো নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। কমিশন নিয়োগের ক্ষমতা যেহেতু সরকারের হাতে, তাই তাদের মনোভাব: তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার মনের মতো কমিশন চাই।
সংগত কারণেই সরকারের প্রতি যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, তখন তার যেকোনো কাজকেই মানুষ সন্দেহের চোখে দেখে। এমনকি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন যে সবচেয়ে সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকেও যদি সরকার নিয়োগ দেয়, তাঁকেও বিরোধী দল সমালোচনা করবে। সবাই যদি চায় তার মনের মতো জিনিস, তাহলে যেকোনো যোগ্য ব্যক্তির পক্ষেও কাজ করা কঠিন। নির্বাচন কমিশনের বাইরের প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা যদি বিশেষ বিশেষ চেতনায় আপ্লুত থাকেন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা যদি ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করেন, তাহলে কয়েকজন নির্বাচন কমিশনার কেন্দ্রে বসে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারেন না। যেখানে দশচক্রে ভগবান পর্যন্ত ভূত হন, সেখানে নির্বাচন কমিশনাররা তো মানুষ। মানুষকে দিয়েই তাঁরা কাজ করাবেন, দৈবশক্তিবলে নয়। সব মানুষ যদি দশচক্র নয় তিন শ চক্রের মধ্যে পড়ে, তাহলে পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন একটি অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশমতো রাষ্ট্রপতি গঠন করেছেন। এই কমিশন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তা যদি না পারে তাহলে সে দোষ শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের ওপর চাপালে হবে না, যে সার্চ কমিটি তাঁদের মনোনয়ন দিয়েছিল, তাদের তার দায় নিতে হবে। সুতরাং এ ধরনের সার্চ কমিটির ওপরও জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বিধাতা নিজে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করে দিতে পারেন না, সরকারকেই করতে হবে। কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কয়েকজন সার্চ কমিটির সম্মানিত সদস্যরা আছেন, থাকুন, তার বাইরে সরকার শিক্ষাজগৎ, মিডিয়া, শিল্প-বাণিজ্য ও পেশাজীবীদের মধ্যে অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁদের মতামতও নিতে পারে। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তাঁদের মতামত ও বিচার-বিবেচনার মূল্য সামান্য নয়। সাংবিধানিক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাপারেই হোক বা যেকোনো ব্যাপারেই হোক, সরকারের সব সিদ্ধান্তই স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া কাম্য।
কোনো দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা কোনো হাতি-ঘোড়া ব্যাপার নয়। কর্মকর্তাদের সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকলে তাঁরাই তা পারেন। কর্মকর্তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচনে কারচুপি হতেই পারে না। কর্মকর্তাদের ওপর নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ কতটা তার ওপরই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সাফল্য নির্ভর করে। সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আমার একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল নেপালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনের সময়। বাংলাদেশ থেকে দুই নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম সাখাওয়াত হোসেন, ছহুল হোসাইনসহ আমি ওই নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক কমিটির সদস্য হিসেবে গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে একই বিমানে আমাদের সঙ্গে যান মালদ্বীপের প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্টারসহ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের পর্যবেক্ষকেরাও এসেছিলেন। ছোট্ট প্লেনে বিভিন্ন গ্রুপে আমরা সারা দেশ ঘুরেছি। নেপালের কর্মকর্তাদের দক্ষতা আমাদের অফিসারদের চেয়ে বেশি বলে মনে হয়নি। তাঁরা দলবাজি না করে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ওই নির্বাচনেই প্রচণ্ড-ভট্ট রায়ের কট্টর মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো হালনাগাদ নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। নির্বাচনটা হয়ে গেলেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একজন সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদে অযোগ্য হলেন কি না, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন–সংক্রান্ত কোনো বিরোধ শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে থাকেন আইন দ্বারা গঠিত নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল। সে দায়িত্বও নির্বাচন কমিশনের। এই কাজটি কিঞ্চিৎ কঠিন। সে জন্য দরকার অবিচল নীতিবোধ ও শক্ত মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের ভালো ও সৎ মানুষ আছেন অনেক, কিন্তু সাহসী ও তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের বড়ই অভাব। সরকার অথবা ক্ষমতাসীন দলের অন্যায্য আবদার অগ্রাহ্য করতে পারেন এমন নৈতিক বলসম্পন্ন মানুষ দুর্লভ।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কী রকম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করে ফেব্রুয়ারিতে কী রকম নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় তার ওপর। বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচন কমিশন যদি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দ্বারা প্রভাবিত হতো, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অনেক দিন পিছিয়ে যেত। সে জন্যই ফলাফল ঘোষণার পরদিন বঙ্গবন্ধু বিচারপতি সাত্তারকে ধন্যবাদ জানান। সঠিক দায়িত্ব পালনের জন্য মাওলানা ভাসানীও তাঁর প্রশংসা করেন। নির্দিষ্ট অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পেলেও একটি নির্বাচন কমিশনের ওপর একটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তবে তা ‘স্বাধীন’ বলে সব দায়িত্ব তার ঘাড়ে চাপালে চলবে না। তাকে সহযোগিতা দিতে হবে সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের। একটি নির্বাচন কমিশনের ভুল অথবা দায়িত্বহীনতার খেসারত দিতে হতে পারে একটি জাতিকে বহুকাল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাই ব্যক্তি ও
দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিবেচনা করবেন, এই প্রত্যাশা করি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

No comments:

Post a Comment