ভারতের
বৃহৎ কোম্পানি আদানি পাওয়ার সুবিধামতো দাম ও শর্তে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য
বাংলাদেশের বিদ্যমান ক্রয়চুক্তি পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে
তারা বেশ কিছু শর্তসহ সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। শর্ত মেনে নেয়া হলে
বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রয়চুক্তি পরিবর্তন করে আদানির
কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে দেশ।
আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ডে ১৬শ’ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ
করবে। এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের কাছে ২০ বছর মেয়াদে
বিক্রি করবে প্রতিষ্ঠানটি। আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হলে পিডিবিকে
কিছু শর্ত মানতে হবে। সংস্থাটির শর্ত মেনে ওই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনলে
প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ৮ টাকা ৫০ পয়সার বেশি। অথচ বর্তমানে ভারত থেকে গড়ে ৪
টাকা ৯১ পয়সা হারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এ হিসাবে প্রতি
ইউনিট বিদ্যুতের দামে সাড়ে তিন টাকা বেশি দিতে হবে। ফলে বাংলাদেশের খুচরা
বাজারে বিদ্যুতের দাম প্রতি বছরই বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। পিডিবির
পরিচালক সাইফুল হাসান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আদানির কাছ থেকে পাওয়া
প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। প্রতিদিনই নানা বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাদের
কোনো প্রস্তাব ভালো মনে হলে সেটা পিডিবি গ্রহণ করছে। আবার পিডিবির কোনো
প্রস্তাব যদি তাদের পছন্দ হয় সেটা তারা গ্রহণ করছে। মোট কথা দেশের স্বার্থ
রক্ষা করে আদানির সঙ্গে সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে। যাতে দু’পক্ষের সুবিধা হয়।
জানা গেছে, বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)
কাছে আদানি পাওয়ার দাবি করেছে, ঝাড়খণ্ডের ১৬শ’ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে
বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিতে (পিপিএ-পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট) বেশ কিছু শর্ত
থাকতে হবে।
এর মধ্যে আছে, ভারতের আইন অনুযায়ী ভবিষ্যতে যেসব অতিরিক্ত
শুল্ক, কর বিদ্যুৎ খাতে আরোপ করবে তা পিডিবিকে দিতে হবে। এছাড়া ওই কেন্দ্র
থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ভারতের সরকারি বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা
এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভ্যাপার নিগম লিমিটেডকে সঞ্চালন মাশুল দিতে হবে। আদানি
যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তৈরি করবে সেটি ২২ বছর মেয়াদি একটি প্লান্ট। নিয়ম
অনুযায়ী এক্ষেত্রে আদানিকে ২২ বছরের অপারেশনাল সিকিউরিটি বন্ড জমা দিতে
হবে। কিন্তু আদানি প্রস্তাব করেছে তারা ৫ বছরের অপারেশনাল বন্ড দেবে। এছাড়া
আদানি কেন্দ্র পরিচালনার জামানতের (অপারেশন সিকিউরিট ডিপোজিট-ওএসডি) অর্থ
কেন্দ্রের এক মাসের যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা ভাড়া তার সমতুল্য হতে হবে। আর
এ অর্থ ৫ বছরের মধ্যে আদানি তুলে নিয়ে যেতে পারবে। অথচ বাংলাদেশে অন্যান্য
যেসব বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ জামানতের পরিমাণ
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুই মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার সমান অর্থ বা দুই
মাসের ক্যাপাসিটি চার্জ জামানত হিসেবে রাখা হয়। আর এ জামানতের অর্থ বিদ্যুৎ
কেন্দ্রটির সঙ্গে পিডিবির যতদিন পিপিএ চুক্তি থাকে ততদিন পিডিবির কাছে তা
গচ্ছিত থাকে। আদানি পাওয়ার বাংলাদেশের কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা ৮৫
পয়সা হারে বিক্রিতে সম্মত হয়েছিল বলে জানা গেছে। পিডিবি যদি পিপিএর কিছু
শর্ত মেনে নেয় তাহলে এ কেন্দ্রের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ৮ টাকা
৫০ পয়সার বেশি। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৪
টাকা ৯১ পয়সা হারে আমদানি করছে। আদানির শর্ত মেনে যদি বাংলাদেশ ভারত থেকে
বিদ্যুৎ আমদানি করে তাহলে ইউনিটপ্রতি সাড়ে তিন টাকা বাড়তি দিতে হবে।
এছাড়া
আদানি পাওয়ার তাদের ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ১৪৪০ ঘণ্টা
আউটেজ সুবিধা পাবে। যদি আদানি পাওয়ার ১৪৪০ ঘণ্টার কম আউটেজ খরচ করে তাহলে
পিডিবিকে এর জন্য বাড়তি অর্থ দিতে হবে। আউটেজ হল, কোনো একটি বিদ্যুৎ
কেন্দ্র বছরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখতে পারবে। আদানির
১৬০০ মেগাওয়াটের জন্য এ সীমা বছরে ১৪৪০ ঘণ্টা বা ৬০ দিন। যদি এর চেয়ে বেশি
সময় কেন্দ্রটি বন্ধ রাখা হয় তাহলে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে লিকুইড ড্যামেজ
(এলডি) বাবদ পিডিবিকে জরিমানা দিতে হয়। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই এমন
বিধান প্রযোজ্য। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের নির্ধারিত আউটেজের কম
খরচ করে তবে ওই কেন্দ্রটির কম খরচ করার ফলে প্রাপ্ত আউটেজ পরবর্তী বছরের
হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়। কম ব্যবহার করলে তার জন্য বাড়তি অর্থ দেয়ার নজির
নেই বাংলাদেশে। তবে এ ক্ষেত্রে আদানি পাওয়ারের দাবি যদি তারা কম আউটেজ
ব্যবহার করে তাহলে তাদের বাড়তি অর্থ দিতে হবে। পিডিবি ও আদানি পাওয়ার
প্রস্তাবিত পিপিএ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

No comments:
Post a Comment