গাজীপুর, সফিপুর, কোনাবাড়ীসহ আশপাশের
শিল্পাঞ্চলে ফের গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস না থাকায়
শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে শতাধিক
শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা
পরিশোধ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের অনেকে।
কিন্তু
সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। তিতাস গ্যাসের
সহকারী প্রকৌশলী (সিস্টেম অপারেশন) আখেরুজ্জামান জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল
মহাসড়কে ফোর লেনের কাজ করার সময় শুক্রবার কোনাবাড়ী আলিম ফিলিং স্টেশনের
সামনে ১০ ফুট মাটির গভীরে গ্যাসে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ৫০ পিএসআই প্রেসারের
পাইপ লাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গ্যাস বের হতে থাকে। ফোর লেন রাস্তার কাজের
লোকজন তা মাটি চাপা দিয়ে রাখে। শনিবার খবর পেয়ে তিতাস গ্যাসের লোকজন
ঘটনাস্থলে গিয়ে তা মেরামতের কাজ শুরু করেছে। কোনাবাড়ী এলাকায় গ্যাস লাইন
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গাজীপুর সদর ও কালিয়াকৈর অংশে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখে
মেরামত কাজ করা হচ্ছে। যার ফলে ওইসব এলাকায় বিভিন্ন কলকারখানায় চাহিদা
অনুযায়ী গ্যাস দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর
মসিউর রহমান বলেন, বিদ্যুতের জন্য বেশি গ্যাস দেয়া হচ্ছে। ঢাকার আশপাশের
বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় গ্যাস নিচ্ছে। এ কারণে অন্য খাতে একটু
সমস্যা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। তিনি জানান, সার কারখানাগুলোয়
সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি ভালো করার চেষ্টা চলছে। তিনি আরও বলেন,
শিগগিরই রূপগঞ্জ গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। আগামী ৭
ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী রূপগঞ্জের গ্যাস সঞ্চালন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন
করবেন। এটি চালু হলে এ সংকট আর থাকবে না।
ভুক্তভোগী বিভিন্ন শিল্পমালিক ও
কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, শুধু পাইপ ফেটে যাওয়ার কারণে এ
সংকটের কথা সঠিক নয়। বাস্তবতা হল, দুই মাস ধরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের
কোনাবাড়ী, বাইমাইল, বিসিক, জরুন, কাশিমপুর, কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর,
সিনাবহ, চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট চলছে। ফলে ওই এলাকায়
অবস্থিত বিভিন্ন শিল্পকলকারখানায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শুক্রবার থেকে এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রায় ৩ মাস আগে পুংলি
নদীর তলদেশে একটি গ্যাস লাইন ফেটে গিয়ে দীর্ঘদিন চরম গ্যাস সংকটের মুখে
পড়তে হয় শিল্পমালিকদের। এখন আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে ফের পাইপ ফেটে
নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্পমালিকরা বলছেন, গ্যাস ব্যবহার করতে না পারলেও
বাধ্যতামূলকভাবে গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে তাদের। অন্যথায় গ্যাস সংযোগ
বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় দ্রুত গ্যাসের প্রেসার
বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তারা। প্রয়োজনে সার কারখানাসহ কিছু কিছু বিদ্যুৎ
কেন্দ্র থেকে রেশনিং করে হলেও এসব এলাকায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের দাবি
জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। সূত্র জানায়, গ্যাসের চাপ না থাকায় এক সপ্তাহ ধরে
সকাল ৮টা থেকে দিনের বেশিরভাগ সময় কারখানা বন্ধ থাকছে। স্থানীয়
শিল্পমালিকদের অভিযোগ, রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ পিএসআই
গ্যাসের চাপ থাকে। একটি শিল্পকারখানা চালাতে এ পরিমাণ গ্যাসের চাপ থাকা
দরকার। কিন্তু ভোর ৫টা থেকে হঠাৎ ওই চাপ ২ পিএসআইতে নেমে আসে। শনিবার
সকালেও এমন অবস্থা দেখা যায়। এ কারণে দিনভর ছোটবড় অধিকাংশ মিলকারখানার চাকা
ঘোরেনি। উল্টো জেনারেটর চালিয়ে কোনোমতে লাইট বাল্ব জ্বালাতে হয়েছে
মালিকদের।
টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সহসভাপতি ফজলুল হক
যুগান্তরকে জানান, ভয়াবহ এ পরিস্থিতি থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পেতে তারা
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি বলেন, এর আগে পুংলি নদীতে
গ্যাসের পাইপ লাইন ফেটে যাওয়ায় প্রায় দুই মাস চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন
শিল্পমালিকরা। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কিছু দিন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক
হলেও আবার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় গভীর
অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তার মতে, টেক্সটাইল খাতের বেশিরভাগ
মিলই গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গড়ে উঠেছে। কিন্তু দিনের পর দিন গ্যাস
সংকটের কারণে বড় পুঁজির এ কারখানাগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিকল্প উপায়ে
উৎপাদন চালিয়ে নেয়ার পথও নেই। কারণ এ শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল হচ্ছে গ্যাস।
পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান
যুগান্তরক বলেন, শীতের সময় এমনিতে প্রতি বছর গ্যাসের চাপ কমে যায়।
কিন্তু
তাই বলে শিপমেন্ট বাতিল করা সম্ভব নয়। বিদেশীদের সরবরাহ দিতে একদিন দেরি
হলেই তারা শিপমেন্ট বাতিল করে দেয়। তার মতে, সবচেয়ে বেশি গ্যাস খরচ হয়
বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর সার কারখানায়। কাজেই সরকারের উচিত এলএনজি না আসা
পর্যন্ত সার কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া। দরকার হলে এ সময়ে
সার আমদানি করবে সরকার। এছাড়া পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয়ও এ সময় গ্যাস
সরবরাহ বন্ধ রাখা উচিত। এসব গ্যাস শিল্পকারখানায় দিলে দেশের অর্থনীতি সচল
থাকবে। শনিবার কোনাবাড়ী এলাকার কয়েকটি কারখানা পরিদর্শন করে দেখা যায়,
গ্যাসের সংকটের কারণে দিনে কয়েকবার তাদের উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। একটি
গার্মেন্ট কারখানায় গ্যাসের প্রেসার সংক্রান্ত রিডিংয়ে দেখা যায়, শনিবার
সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রেসার ছিল শূন্য পিএসআই। ১০টা থেকে বেলা ১২টা
পর্যন্ত প্রেসার ছিল ২ দশমিক শূন্য পিএসআই আর বেলা ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত
প্রেসার ছিল ২ দশমিক ৫ পিএসআই। অথচ ওই কারখানাটির পুরোদমে উৎপাদন করতে
প্রয়োজন হয় ৮ থেকে ১০ পিএসআই প্রেসার। তিন দিন ধরে গ্যাসের একই অবস্থা
চলছে। কারখানার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের প্রেসার দিনের মধ্যে ৮-১০ বার
উঠানামা করে। এ সময় তাদের উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়। স্থানীয় কারখানা
কর্তৃপক্ষ জানান, তাদের যখন ৪-৫ পিএসআই গ্যাসের প্রেসার থাকে তখন অর্ধেক
কারখানা বন্ধ রেখে বাকি অর্ধেক দিয়ে কোনোমতো উৎপাদন চালিয়ে নেয়া যায়।
এতে
বিভিন্ন বায়ারের অর্ডার সরবরাহ করতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে
ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা
চালু রেখেছেন তারাও খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকের উৎপাদন
মজুরিও কমে গেছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে। গ্যাস সংকটের
কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কমে গেছে। গাজীপুরের
কোনাবাড়ী এলাকায় তুষুকা গার্মেন্টের উৎপাদক কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন জানান,
শনিবার সকালে গ্যাসের সরবরাহ অনেক কম ছিল। ১১টার পর কিছুটা উন্নতি হলেও
দুপুরের পর গ্যাসের প্রেসার অনেক কমে যায়। ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় কয়েকশ’ শিল্পকারখানা রয়েছে। কিছুদিন আগে তীব্র
গ্যাস সংকট ছিল। বর্তমানে গ্যাস সংকট কিছুটা কমলেও চাহিদা মতো পেতে সমস্যা
হচ্ছে। বারবার প্রেসার উঠানামা করছে। প্রায় দেড় শতাধিক স্পিনিং কারখানার
মালিকরা চাহিদা মতো তিতাস গ্যাসের প্রেসার না পেয়ে মাঝে মাঝে তাদের উৎপাদন
ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার চন্দ্রা এলাকার ইকোটেক্স লিমিটেড কারখানার ফ্যাক্টরি
ম্যানেজার তাসকিনুল আলম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইল,
ডাইং ও
ফিনিশিং সেকশনে ৪০ শতাংশ চললে ৬০ শতাংশ বন্ধ রাখতে হতো। চন্দ্রা টুপিক্যাল
কারখানার অ্যাডমিন ম্যানেজার মোবারক হোসেন বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায়
বয়লার মেশিন বেশিরভাগ বন্ধ থাকে। শ্রমিকের বেতন ও শিপমেন্টেও সমস্যা হয়।
চান্দরা এলাকার সাত্তার টেক্সটাইল কারখানার জিএম সারোয়ার আলম বলেন, গ্যাস
সংকটে মাত্র ২৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। শিল্পকারখানার মালিকদের সূত্রে জানা
গেছে, হাইপ্রেসারের পাইপ লাইনে ১৫০ পিএসআইজি প্রেসার থাকার কথা থাকলেও
সেখানে প্রেসার থাকছে মাত্র ২ থেকে ৪ পিএসআইজি। পাইপ লাইনে গ্যাসের প্রেসার
না থাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় বন্ধের পথে। বাধ্য হয়ে কিছু কিছু
প্রতিষ্ঠান বিকল্প ব্যবস্থায় অধিক অর্থ ব্যয়ে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে।
শনিবার সকালে আশুলিয়ার নাহিদ অ্যাপারেলস পোশাক কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে,
কর্মীরা প্রস্তুত থাকলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় কাজ শুরু করতে পারছেন না।
দুপুর ১২টায় পাইপ লাইনে গ্যাস এলেও ১টার মধ্যে চাপ কমে যায়। ফলে আবার কাজ
বন্ধ হয়ে যায়।

No comments:
Post a Comment