রাখাইন
রাজ্যের মংডু থানার বিভিন্ন গ্রামে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের মুখে
জীবনে বেঁচে যাওয়া দিশেহারা রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্প
ছাড়াও আশপাশের বাড়িঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। সীমান্তে বিজিবির পাহারা যতই কড়াকড়ি
হোক না কেন, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনা না কোনোভাবে তারা এখনও আসছে।
সোমবারও টেকনাফ ও উখিয়ার অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি পরিবার
আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নাফ নদী
পাড়ি দিয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা কোনোমতে জীবন নিয়ে এ পাড়ে এসে উঠছে। যারা
আসছে তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। পুরুষদের হত্যা বা গুম করার পর দিশেহারা
তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসে। ৯ নভেম্বর থেকে সোমবার
পর্যন্ত টেকনাফের অনিবন্ধিত লেদা ক্যাম্পে ১ হাজার ৩৮৮ জন আশ্রয় নিয়েছে বলে
ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে সোমবারই এসেছে ৫০ জন। এ ক্যাম্পে আগে
থেকেই রয়েছে ২০ হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা। অন্যদিকে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে
বর্তমানে ৩৫ হাজার ৫৬৫ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের সঙ্গে সোমবার পর্যন্ত
আশ্রয় পেয়েছে ৫ হাজার ৬৫০ জন রোহিঙ্গা। এ তালিকায় প্রতিদিনই নতুন করে কেউ
না কেউ যুক্ত হচ্ছে। তবে নতুন আসা রোহিঙ্গারা নিবন্ধিত ক্যাম্পে ঢুকতে
পারছে না।
ফলে তারা ক্যাম্পের আশপাশের বাড়িঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। সরেজমিন
অনুসন্ধান করে তার সত্যতাও মিলেছে। এদিকে দুটি ক্যাম্পে ১৮ দিনে আসা প্রায়
সাত হাজার রোহিঙ্গার মানবেতর জীবন সংগ্রাম চলছে। নিবন্ধিত ক্যাম্পের
রোহিঙ্গারা জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন এনজিওর
কাছ থেকে আর্থিক ও শিক্ষা স্বাস্থ্যবিষয়ক সহায়তা পেলেও অনিবন্ধিত ক্যাম্পের
রোহিঙ্গারা কোনো সংস্থার কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পাচ্ছে না। উএনএইচসিআরের বাংলাদেশের মুখপাত্র যোসেফ ত্রিপুরা এ প্রসঙ্গে সোমবার
যুগান্তরকে বলেন, টেকনাফ ও উখিয়ার দুটি নিবন্ধিত শিবিরে আশ্রয় পাওয়া ৩৩
হাজার ১০০ রোহিঙ্গা মাসিক নির্দিষ্ট কিছু ভাতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও
পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু অনিবন্ধিত ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা কোনো
ধরনের সুবিধা পাচ্ছে না। নতুন করে যারা ক্যাম্পে আসছে তাদের সহায়তার জন্য
সরকারের কাছ থেকে কোনোও ধরনের দিক-নির্দেশনা আসেনি বলেও জানান তিনি। তবে
এদের বিষয়ে কি করা যায় তা নিয়ে ভাবছে ইউএনএইচসিআর। উখিয়ার কুতুপালং
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাধারণ সম্পাদক মোহামদ নুর জানান, মিয়ানমারে সুচি
সরকারের সেনা বাহিনীর নিষ্ঠুরতার বলি হাজার হাজার মুসলমান। সেনারা দল বেঁধে
পুরুষদের হত্যা করছে। নারী ও শিশুরাও তাদের ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
যারা তাদের হাত থেকে কোনো মতে বেঁচে জীবন রক্ষা পায় তারা ছুটে আসছে
বাংলাদেশে। আশ্রয় নিচ্ছে অনিবন্ধিত ক্যাম্পে। কিন্তু তাদের থাকা বা খাওয়ার
কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। যারা আগে থেকে ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে তারাই
একেকটি পরিবার ১০-১২ জন করে ছোট খুপরি ঘরে জেলখানার মতো থাকছে। তার ওপর
নতুনদের চাপও সেই পরিবারগুলোকে নিতে হচ্ছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন
দিনমজুরের আয়ে এতগুলো মানুষের পেট চলে না।
রোহিঙ্গাদের দিন কাটছে অনাহারে এক কাপড়ে
শুক্রবার পালিয়ে আসা রাখাইন রাজ্যের মংডু নাইনচং গ্রামের নুর বেগমের ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা জিন্নাত আরাসহ ১১ জন আশ্রয় নেয় লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি ব্লকের ধলাবানুর ঘরে। নুর বেগম ও তার ভাইয়ের পরিবারের ১১ জনসহ ১৫ সদস্য বর্তমানে ধলাবানুর ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে। নুর বেগম জানান, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাল-ডাল চেয়ে নিয়ে কোনোরকমে খাবার জুটাচ্ছেন। ধলাবানুর পরিবারে আর কেউ না থাকায় নুর বেগমদের ঘরে আশ্রয় দিতে পেরেছেন বলে জানান। তিনি নিজেও তাদের খাবার যোগাড় করতে ক্যাম্পের ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করছেন। নুর বেগমের বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যাম্পের আইএমও পরিচালিত হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা করান। মিয়ানমারে তার স্বামী জমির হোসেন ও ভাই নুর মোহাম্মদকে ধরে নিয়ে যায়, তার তিন মামাতো ভাবীকে ধর্ষণ করে সেদেশের সেনারা। পরে বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিলে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জীবন বাঁচাতে এখানে পালিয়ে এসে আশ্রয় পেলেও এখন দেখা দিয়েছে অভাব-অনটন। ঠিকমতো খাবার জোটে না। পরনের কাপড় নেই। নেই শীতবস্ত্র। সামনের দিনগুলো কেমন করে কাটবে জানে না নুর বেগম। এ ক্যাম্পের বি-ব্লকের রশিদ উল্লাহর বাড়িতে আশ্রয় নেয়া আরেকটি হচ্ছে একরামদের পরিবার। একরাম তার স্ত্রী-সন্তান, শাশুড়িসহ ৯ সদস্য নিয়ে আশ্রয় নেন মামাতো ভাই রশিদ উল্লাহর বাড়িতে। এখানে শনিবার জন্ম নেয় তার আরও এক সন্তান। সন্তানের নাম দেন আবদুল্লাহ। রশিদ উল্লাহর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী-সন্তানসহ ৫ জন সদস্য। তিনি দিনমজুরি করে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন।
রোহিঙ্গাদের দিন কাটছে অনাহারে এক কাপড়ে
শুক্রবার পালিয়ে আসা রাখাইন রাজ্যের মংডু নাইনচং গ্রামের নুর বেগমের ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা জিন্নাত আরাসহ ১১ জন আশ্রয় নেয় লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি ব্লকের ধলাবানুর ঘরে। নুর বেগম ও তার ভাইয়ের পরিবারের ১১ জনসহ ১৫ সদস্য বর্তমানে ধলাবানুর ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে। নুর বেগম জানান, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাল-ডাল চেয়ে নিয়ে কোনোরকমে খাবার জুটাচ্ছেন। ধলাবানুর পরিবারে আর কেউ না থাকায় নুর বেগমদের ঘরে আশ্রয় দিতে পেরেছেন বলে জানান। তিনি নিজেও তাদের খাবার যোগাড় করতে ক্যাম্পের ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করছেন। নুর বেগমের বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যাম্পের আইএমও পরিচালিত হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা করান। মিয়ানমারে তার স্বামী জমির হোসেন ও ভাই নুর মোহাম্মদকে ধরে নিয়ে যায়, তার তিন মামাতো ভাবীকে ধর্ষণ করে সেদেশের সেনারা। পরে বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিলে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জীবন বাঁচাতে এখানে পালিয়ে এসে আশ্রয় পেলেও এখন দেখা দিয়েছে অভাব-অনটন। ঠিকমতো খাবার জোটে না। পরনের কাপড় নেই। নেই শীতবস্ত্র। সামনের দিনগুলো কেমন করে কাটবে জানে না নুর বেগম। এ ক্যাম্পের বি-ব্লকের রশিদ উল্লাহর বাড়িতে আশ্রয় নেয়া আরেকটি হচ্ছে একরামদের পরিবার। একরাম তার স্ত্রী-সন্তান, শাশুড়িসহ ৯ সদস্য নিয়ে আশ্রয় নেন মামাতো ভাই রশিদ উল্লাহর বাড়িতে। এখানে শনিবার জন্ম নেয় তার আরও এক সন্তান। সন্তানের নাম দেন আবদুল্লাহ। রশিদ উল্লাহর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী-সন্তানসহ ৫ জন সদস্য। তিনি দিনমজুরি করে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন।
এখন আশ্রয় নেয়া মামাতো ভাই
একরামদের ৯ সদস্যের খাবার যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একরাম মংডু গৌজিবিলে
দোকান করে সংসার চালাতেন। এখন কিভাবে সংসার চলবে তা নিয়ে চিন্তার শেষ নেই।
ক্যাম্পের বি-ব্লকে ৫ সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মংডু বড় গৌজিবিলের নুর
ফাতেমা। এখানে তার কেউ নেই। আশ্রয় নিয়েছেন নুর কায়েদার ঘরে। তারা আত্মীয়
নন। তারপরও মানবতার খাতিরে আশ্রয় দিয়েছেন। স্বামী নুর মোহাম্মদকে ধরে নিয়ে
হত্যা করেছে সেনারা। ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া জানান, আশ্রয় নেয়া
রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বস্ত্র ও ওষুধ-চিকিৎসা সহায়তা না দিলে ভয়াবহ মানবিক
বিপর্যয় ঘটতে পারে। সোমবার সকালে ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নেয়া ছোট গৌজিবিল
এলাকার মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তার বড় ছেলে মো. হোসেন ও
ছোট ছেলে মো. সফরকে নিয়ে পালিয়ে আসলেও পরিবারের আরও ১০ সদস্য রাখাইন
রাজ্যের মংডু আকবরপাড়া এলাকায় আটকা পড়ে আছেন। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা
তিনি জানেন না। হোসেনের ভাই ফয়েজের পরিবারের ৮ সদস্যকে বাড়ির ভিতর আটকে
রেখে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় বলে জানান তিনি। ওই এলাকার আরও ৩০০
লোককে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এদিকে সীমান্তে বিজিরি টহল আগের
চেয়ে আরও জোরদার করা হয়েছে। তারা সোমবার রোহিঙ্গাদের বহনকারী ৮টি নৌকা
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নাফ নদী থেকে মিয়ানমারের দিকে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে
তাদের কঠোর নজরদারির মধ্যেও আসছে বিপদে পড়া রোহিঙ্গারা।

No comments:
Post a Comment