চলতি
বছরের ৮ জুন বিকালে কমলাপুরগামী একটি ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে কুড়িল বিশ্বরোড
ক্রস করছিল। এ সময় রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে
মারা যান মাইনুল আলম তোহা নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি একটি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। শুধু তোহাই নন, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে
শুধু ঢাকা রেলওয়ে থানা এলাকাতে ক্রসিং পার হতে গিয়ে মারা গেছেন ১৩৩ জন। আর
গত সাত বছরে মারা গেছেন ৯৫০ জন। এ সময়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু
পর্যন্ত রেলওয়ের এক থানাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৫৬ জন। আর চলতি বছরের
প্রথম ৯ মাসে সারা দেশে ২৪টি রেলওয়ে থানা এলাকায় মারা গেছেন ৭৩০ জন। ঢাকা
রেলওয়ে থানা এলাকার সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করে মৃত্যুর পেছনের ছয়টি কারণ
উঠে এসেছে। এগুলো হল : রেললাইন দিয়ে হাঁটা, লাইনের ওপর বসা, লাইন পার
হওয়ার সময় বা লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, ট্রেনের
ছাদে চড়া, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা এবং আলামত নষ্ট করতে খুন করে
রেললাইনে লাশ ফেলে রাখা। ঢাকা রেলওয়ে থানা সূত্রে জানা যায়, রেল দুর্ঘটনায়
সব বয়সী মানুষই মারা যাচ্ছেন। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই
থানা এলাকায় ২২৭ জন শিশু; ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১ হাজার ৪৬২ জনের মৃত্যু
হয়েছে। তবে মারা যাওয়াদের মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ
সময় ঢাকা রেলওয়ে থানা এলাকায় ৪৬৪ জন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু হয়। আর চলতি
বছরে এ এলাকায় মারা গেছেন ৫৯ জন।
গত ১৯ মার্চ রাজধানীর কারওয়ান বাজারে
ট্রেনের ধাক্কায় জহুরুল ইসলাম নামের এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়। ঢাকা রেলওয়ে
থানার পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাত বছরে নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু
পর্যন্ত রেললাইনে ৫৬ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরেই মারা গেছেন
১০ শিক্ষার্থী। গত ১৭ মে দুপুরে রাজধানীর পূর্ব নাখালপাড়া থেকে পশ্চিম
নাখালপাড়া যাওয়ার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী
ওবায়দুল্লাহ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান। তিনি রেললাইন ধরে হাঁটার সময়
মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। পেছন থেকে ট্রেনের হুইসেল এবং আশপাশের লোকজন তাকে
বারবার ডাকাডাকি করলেও তিনি শোনেননি। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর
মগবাজারের ওয়্যারলেস গেটে ট্রেনের ধাক্কায় তানভীর গওহর তপু নামের এক
শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। দুই কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে তিনি
হাঁটছিলেন। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য- ট্রেনে কাটা পড়ে বা ট্রেনের
ধাক্কায় নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশের কানে হেডফোন ছিল অথবা তারা
মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মোরশেদ
আলম যুগান্তরকে বলেন, উন্মুক্ত রেললাইন এবং সচেতনতার অভাবে রেললাইনে অনেক
মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। রেললাইনের দুই দ্বারে বসতি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে
ওঠায় মৃত্যু আরও বাড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ঢাকা
রেলওয়ে থানার ওসি মো. ইয়াছিন ফারুক মজুমদার বলেন, মূলত সচেতনতার অভাবেই
মানুষ রেল দুর্ঘটনায় মারা যান। একটু সচেতন হলেই এ ধরনের মৃত্যু অনেক কমে
যাবে।
রেললাইন ব্যবহার করছে খুনিরা : ২০১৪
সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা রেলওয়ে থানার আওতাধীন গাজীপুরের ধীরাশ্রম
রেলস্টেশনের কাছ থেকে আবু বকর নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে
ধারণা করা হয়েছিল, অসাবধানতার কারণে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে আবু বকরের
মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা করে। পরে জানা যায়,
ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছিল আবু বকর। বিষয়টি জানার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
পরে জানা যায়, মানিব্যাগ না দেয়ার কারণে চার ছিনতাইকারী আবু বকরকে ট্রেনের
ছাদ থেকে ফেল দেয়। এ ঘটনায় মুন্না নামের এক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে
পুলিশ। পরে সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আলামত নষ্ট করতেও হত্যার পর রেললাইনে লাশ
ফেলে রাখে খুনিরা। ট্রেনে কাটাপড়া অধিকাংশ লাশের অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিচ্ছিন্ন ও
চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এ কারণে তাদের চেহারা চেনা যায় না। অনেক সময় লাশ
দেখে বোঝা যায় না ওই ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন কিনা। ঢাকা রেলওয়ে
থানা পুলিশ বলছে,
২০১৪ থেকে ২০১৬
সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থানায় হত্যা মামলা হয়েছে ১৪টি। অধিকাংশ হত্যা
মামলা হয়েছে লাশের ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়ার পর। এ বিষয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানার
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি
চট্টলা ট্রেন থেকে পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায়
পুলিশ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করে। তবে লাশ দেখে সন্দেহ হওয়ায় ভিসেরা
পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরে প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই ব্যক্তিকে
শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর থানায় একটি
হত্যা মামলা করা হয়। মামলা হওয়ার দু’বছর পরও এ ঘটনার কোনো কূলকিনারা করতে
পারেনি পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এ কারণে তিনি কোথায় যাচ্ছিলেন, কার সঙ্গে যাচ্ছিলেন এবং তার সঙ্গে কাদের
বিরোধ ছিল এসব বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। ফলে মৃত্যুর রহস্যও উন্মোচন করা
সম্ভব হয়নি।

No comments:
Post a Comment