বিদায়ী
বছরে বিশ্ববাসী দেখেছে তুরস্কে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান। তুরস্কে এবং
বিশ্বের অনেক দেশে বিভিন্ন সময় সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। তবে ২০১৬ সালের ১৬
জুলাই রাতে তুরস্কে সংঘটিত অভ্যুত্থানটি ছিল নজিরবিহীন। প্রথমত, একটি
জনপ্রিয় সরকারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বড় কারণ ছাড়াই অভ্যুত্থানের চেষ্টা
চালায় সামরিক বাহিনীর একাংশ। সাধারণত সেনা অভ্যুত্থান তখনই হয় যখন কোনো
একটি সরকার জনধিকৃত হয়ে পড়ে। তুরস্কে ব্যাপারটি তেমন ছিল না।
দ্বিতীয়ত,
একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে, যেখানে বিমান হামলাও চালিয়েছে অভ্যুত্থানকারী
সেনারা, রুখে দিয়েছে নিরস্ত্র জনতা। এটাও সমসাময়িক বিশ্বে বিরল ঘটনা। ফলে
অভ্যুত্থান প্রয়াসটি ব্যর্থ হলেও তা ঐতিহাসিক মর্যাদা পাবে। দৃশ্যত
বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা সরকারের পক্ষে থাকায় পুরো সেনাবাহিনীর
সমর্থন পেতে অভ্যুত্থানকারীরা ব্যর্থ হয়। অভ্যুত্থানের শুরুতেই সেনাপ্রধান
জেনারেল হুলিসিয়াকে বন্দি করা হয়। ইস্তাম্বুল সেনানিবাসের সৈনিক ও
কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান সমর্থন করেনি। নৌবাহিনী প্রধান এবং বিশেষ বাহিনীর
অধিনায়ক অভ্যুত্থান প্রয়াসের বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন শহর ও সেনানিবাসে
অভ্যুত্থানকারীরা সরকারের অনুগত সহকর্মী ও জনতার প্রতিরোধের মুখে একের পর
এক আত্মসমর্পণ করতে থাকে। এতদসত্ত্বেও এরদোগান জনগণকে রাস্তায় থাকতে বলেন।
চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত জনগণ রাস্তায় অবস্থান করে। অভ্যুত্থান
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কঠিন ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। তুর্কি শান্তি
পরিষদ নামের বিদ্রোহী সেনাদের সংগঠনের এই অভ্যুত্থানে অন্তত ৩০০ জন নিহত
এবং ২১০০ জনের বেশি আহত হন। আঙ্কারায় তুরস্কের পার্লামেন্ট ভবন ও
প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। গুলির শব্দ আঙ্কারা এবং
ইস্তাম্বুুলের প্রধান বিমানবন্দর থেকেও শোনা যায়। অভ্যুত্থানের পরে
গণগ্রেফতার শুরু করে সরকার। আটক করা হয় ৪০ হাজার মানুষকে। এর মধ্যে ১০
হাজার সেনা। ২ হাজার ৭৪৫ জন বিচারককেও আটক করা হয়। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
থেকে ১৫ হাজার স্টাফকে বরখাস্ত করা হয়। ২১ হাজার শিক্ষকের লাইসেন্স বাতিল
করে সরকার। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তুর্কি
সরকার। তুরস্কের অভ্যুত্থানকারী সেনারা চেয়েছিল প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ
এরদোগান সরকারকে উৎখাত করতে। তাদের ভাষ্য মতে, এর কারণ ছিল এরদোগানের শাসনে
দেশটিতে ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিনাশ,
মানবাধিকারের অসম্মান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের বিশ্বাসযোগ্যতা
নষ্ট। তবে সেনাবাহিনীর একাংশের এসব দাবির সঙ্গে একমত হয়নি তাদেরই
সংখ্যাগরিষ্ঠ সহকর্মী। তারাও অভ্যুত্থান ঠেকাতে অস্ত্র তুলে নেয়।
দেশের
জনগণের বড় একটি অংশই অভ্যুত্থানকারীদের দাবির সঙ্গে যে একমত ছিল না তা বোঝা
যায় অভ্যুত্থান ঘোষণার পর থেকেই পরবর্তী কয়েকদিনে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে।
এ সময় আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলসহ দেশটির বড় বড় শহরগুলো রাতভর সমাবেশ করেছে
লাখ লাখ মানুষ। অভ্যুত্থানের পরপরই সারা দুনিয়া একবাক্যে এরদোগান সরকারের
সমর্থনে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়ায়। দেশে এবং বিদেশে এরদোগানের জনপ্রিয়তা আরও
বেড়ে যায়। তবে অভ্যুত্থানের পর থেকে তুর্কি সরকার যেভাবে ভিন্নমতের
গণমাধ্যম দলন করেছে এবং গণগ্রেফতার চালিয়েছে তাতে পশ্চিমা বিশ্ব তার
সমালোচনায় মুখর হয়েছে। দৃশ্যত, ব্যর্থ অভ্যুত্থান এরদোগানকে তার একটি সুপ্ত
বাসনা পূরণের পথ খুলে দিয়েছে। আর সেটি হচ্ছে, আর এক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট
থাকবেন তিনি এবং তুরস্ক হবে প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশ। এরদোগানের এ আকাক্সক্ষা
পূরণে এখন দৃশ্যত আর কোনো বাধা নেই। ধারণা করা হচ্ছে কামাল আতাতুর্কের পর
এরদোগানই হচ্ছেন তুরস্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট।

No comments:
Post a Comment