প্রধানমন্ত্রীর
পর এবার রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফিরতি
ফ্লাইট (ঢাকা-সিঙ্গাপুর) নিয়ে বড় ধরনের গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ওই ফ্লাইটটির উড্ডয়নের আগে তরল দাহ্য পদার্থ দিয়ে বিমানের
ইঞ্জিনের ব্লেড ধোয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু এ ফ্লাইটের নিরাপত্তার
দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ
ঘটনায় মাহবুবুল ইসলাম নামে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের একজন জুনিয়র
টেকনিক্যাল অফিসারকে (জেটিও) সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে জানাজানি হওয়ার
ভয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ অতি গোপনে বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে। এভিয়েশন
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাধারণ ভালো পানি দিয়ে ইঞ্জিন ও ইঞ্জিনের ব্লেড
পরিষ্কার অথবা ধোয়ার নিয়ম। এতে কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ ব্যবহার সম্পূর্ণ
নিষেধ। কারণ দাহ্য পদার্থ ইঞ্জিনের গায়ে লাগলে আকাশে উড্ডয়ন অবস্থায় ওই
দাহ্য পদার্থে আগুন ধরে বিমান দুর্ঘটনার আশংকা থাকে। প্রকৌশল শাখার
উপপ্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ হানিফ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায়
মাহবুবুল ইসলাম নামে একজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার কাছে কিছু
মিশ্রণ জাতীয় পানি (ব্যবহৃত হওয়া) পাওয়া গেছে। যা দিয়ে ইঞ্জিনের ব্লেড
পরিষ্কার করা হচ্ছিল। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের
অভিযোগের ভিত্তিতে বিমান ম্যানেজমেন্ট ওই ফ্লাইটের দায়িত্বে থাকা জুনিয়ার
টেকনিক্যাল অফিসার মাহবুবুকে সাময়িক বরখাস্ত করে। বিমানের প্রকৌশল শাখার এক
শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দাহ্য পদার্থ দিয়ে ইঞ্জিনের ব্লেড পরিষ্কারের
চেষ্টা ছাড়াও শেষ মুহূর্তে ওই ফ্লাইটে আরও বড় ধরনের ত্র“টি ধরা পড়েছিল। পরে
তড়িঘড়ি করে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের ডেকে এনে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে
হয়েছে ফ্লাইটটিতে। তিনি বলেন, যে কোনো ফ্লাইট ভিভিআইপি হিসেবে ঘোষণা দেয়ার
পর সাধারণত সেটির সার্বিক ব্যবস্থা বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে চলে যায়।
সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিভাগ ফ্লাইটটির চারদিকে নিরাপত্তা ফিতা দিয়ে বেষ্টনী
তৈরি করে। এ সময় নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স ও নির্দিষ্ট পথ ছাড়া ওই বেষ্টনীতে
প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ। বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ওই বেষ্টনীতে
প্রবেশ করার সুযোগ থাকে না। জানা গেছে, ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ
চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান। তিনি ১১ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন। বিমান
কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতিকে দেশে আনার জন্য বোয়িং কোম্পানির তৈরি বি-৭৩৭ নামের
একটি নতুন এয়ারক্রাফট ভিভিআইপি হিসেবে ঘোষণা দেয়। ১০ ডিসেম্বর ওই ফ্লাইটটির
সব ধরনের চেক ও প্রকৌশলজনিত কাজ শেষে সেটি রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বিভাগের
কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা শাহজালালের হ্যাঙ্গারের একটি
স্থানে ফ্লাইটটি নিরাপত্তা ফিতা দিয়ে প্রস্তুত রাখেন। ১০ ডিসেম্বর বিমানের
প্রকৌশল বিভাগের জুনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার মাহবুবুল ইসলাম ফ্লাইটটির
ইঞ্জিন ধোয়ার জন্য এক কনটেইনার পানি নিয়ে আসেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ,
মাহবুব নিরাপত্তা বেষ্টনীর গেট দিয়ে না ঢুকে ফিতা টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন।
এটি ফ্লাইটের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের চোখে পড়ে। মাহবুব যখন
ইঞ্জিনের ব্লেড ধোয়া শুরু করেন তখন শাহদাৎ হোসেন নামে আরেক এয়ারক্রাফট
মেকানিক তাকে বাধা দেন। শাহাদাত বলেন, এ পানি থেকে কেরোসিনের গন্ধ বের
হচ্ছে। এটি ব্যবহৃত কেমিক্যাল মিক্সড করা পানি। এ পানি দিয়ে ইঞ্জিন ধোয়া
যাবে না। এনিয়ে দু’জনের মধ্যে কাথাকাটাকাটি হয়। এরই ফাঁকে নিরাপত্তা
সংশ্লিষ্টরা এসে ওই পানি পরীক্ষা করে দেখেন তা ইঞ্জিন ধোয়ার উপযুক্ত নয়।
ঘটনাটি তারা বিমানের শীর্ষ ম্যানেজমেন্টকে জানান। এর পরপরই বিমান কর্তৃপক্ষ
মাহবুবুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
বিমানের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা
গেছে, মাহবুব একজন অষ্টম শ্রেণী পাস। তিনি বিমানে এয়ারক্রাফট ক্লিনার
হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর তিনি বিমানের জাতীয় শ্রমিক দলের নেতা বনে
যান। এরপর সিবিএর প্রভাব খাটিয়ে দুটি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। বিমানে এসএসসি
পাস ছাড়া কোনো কর্মচারীকে পদোন্নতি দেয়ার বিধান না থাকলেও তিনি ক্ষমতার
প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি নেন। জানা গেছে, টেকনিশিয়ান থেকে মেকানিক পদে
পদোন্নতি পাওয়ার পর তিনি মুচলেকা দিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানান, তিনি (মাহবুব)
কর্মরত থাকা অবস্থায় আর কোনো পদোন্নতি অথবা এ সংক্রান্ত কোনো সুবিধা নেবেন
না। আরও জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি শ্রমিক দল ছেড়ে
বিমান শ্রমিক লীগে যোগদান করেন। এরপর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক
মান্তাসারের সহযোগিতায় তিনি জুনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে আবার পদোন্নতি
বাগিয়ে নেন। বর্তমানে মাহবুব প্রকৌশল শাখার বিমান শ্রমিক লীগের অঘোষিত
উপদেষ্টা। আর এ কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করেন না। এর আগে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ফ্লাইটের ইঞ্জিনে নাট ঢিলার সঙ্গে
মাহবুবের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও শ্রমিক লীগের হস্তক্ষেপে তিনি বরখাস্ত হওয়া
থেকে রক্ষা পান বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তারা জানান, টেকনিশিয়ান সিদ্দিকুর
রহমান প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ইঞ্জিনের বি নাটের পাশে একটি
সেন্সর সিস্টেম বদল করেছিলেন। আর জেটিও মাহবুবুল ইসলাম ইঞ্জিনের চারদিকে
থাকা কাউলিং বক্স খুলে দিয়েছিলেন। কাউলিং বক্স খোলা ছাড়া কোনো টেকনিশিয়ানের
পক্ষে ইঞ্জিনে কোনো ধরনের কাজ করার সুযোগ নেই। মোটকথা বিমানের যে কোনো
ইঞ্জিনের কাজ করতে হলে টেকনিক্যাল অফিসারদের সহযোগিতা লাগবেই। এক্ষেত্রে
কাউলিং বক্স বন্ধ করার সময় টেকনিক্যাল অফিসারদের দায়িত্ব হচ্ছে টেকনিশিয়ান
সবকিছু ঠিকমতো লাগিয়েছে কিনা- তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কাউলিং বক্স বন্ধ
করা। কিন্তু মাহবুব সেদিন তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি বলে অভিযোগ
আছে। তারপরও বিমান শ্রমিক লীগ সিবিএ নেতাদের সহযোগিতায় তিনি বরখাস্ত থেকে
বেঁচে যান বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। আরও জানা গেছে, শুধু মাহবুবুল ইসলাম
নয়, বিমানে এক সময়কার বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রভাবশালী নেতা
ছিলেন এমন অন্তত ২০ জন নেতা এখন বিমান শ্রমিক লীগ সিবিএর শীর্ষ পদ দখল করে
আছেন। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে নাট ঢিলার ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন গোয়েন্দা
সংস্থা এসব নেতাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এর মধ্যে সিরাজুল ইসলাম,
বর্তমানে ক্ষমতাসীন শ্রমিক লীগ সমর্থিত সিবিএর ফাইন্যান্স অ্যান্ড অডিট
শাখার সভাপতি, আনোয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, মাজেদুল হক
(পি-৩৬৩০০), মেজবাউল হক (পি-৩৬৬১৯) বর্তমানে স্টোর শাখার জেনারেল
সেক্রেটারি, কামরুজ্জামান, ইঞ্জিনিয়ার শাখা ও যুদ্ধাপরাধ মামলার
সাজাপ্রাপ্ত আসামি মতিউর রহমান নিজামীর ভাজিতা আবদুল মান্নানের ওপর বিশেষ
নজর রাখছেন গোয়েন্দারা। তাদের গতিবিধি ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিবিড়
পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

No comments:
Post a Comment