বিশ্ববাজারে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সস্তা শ্রমের ব্র্যান্ডিং থেকে বের হয়ে কীভাবে এ
খাতের অন্যান্য উপকরণেও সক্ষমতা বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ
নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, সস্তা শ্রমের দিন শেষ। এখন সময়
হয়েছে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে পোশাকের ‘পূর্ণাঙ্গ সমাধানদাতা’ দেশ হিসেবে
পরিচিত করে তোলার। এর জন্য শ্রমিকের কর্মদক্ষতার ওপরই সবচেয়ে বেশি নজর দিতে
হবে। তারা যত প্রশিক্ষিত হবে,
দেশ তত বেশি ফ্যাশনেবল পোশাক উৎপাদন সরবরাহ
দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে। যা পোশাকের দাম বাড়াতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এর পাশাপাশি কারখানা ভবনের আধুনিকায়ন, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরি
নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করা সম্ভব হলেই বাংলাদেশ
তৈরি পোশাকে বিশ্বের কাছে পূর্ণাঙ্গ সমাধানদাতার’ মর্যাদা পেতে পারে। এসব
বিষয়ে নিয়মিত তদারকির জন্য এ শিল্পের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের ওপরও
গুরুত্বারোপ করেন তারা। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘৫০ বিলিয়ন ডলার
রফতানি লক্ষ্য অর্জন এবং বিইসিএআইর ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব
কথা বলেন। তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজেএমইএ এবং সেন্টার
অব এক্সিলেন্স ফর বাংলাদেশ অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রি (সিইবিএআই) যৌথভাবে এ
মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। বক্তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন ক্রেতা এবং
নামি-দামি ব্র্যান্ডগুলোর বাংলাদেশকে পোশাক তৈরির জন্য বেছে নেয়ার নেপথ্য
কারণ হচ্ছে- সস্তা শ্রমের ব্র্যান্ডিং। কিন্তু এর থেকে দ্রুত বের হওয়া না
গেলে ২০২১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের যে
লক্ষ্যমাত্রা ধারা হয়েছে তা অর্জন করা যাবে না। এর থেকে উত্তরণে বিজিএমইএকে
নিজস্বভাবেই গবেষণাধর্মী কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
পোশাকে নতুন নতুন জিাইন,
রং ও সুতার কারুকার্যের সমন্বয়ে ফ্যাশনেবল পোশাক উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে।
আর সেটি শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট সবারই সময়ের চাহিদায়
তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষিত হতে হবে। অনুষ্ঠানে সিইএবিআইয়ের সভাপতি আতিকুল
ইসলাম বলেন, পোশাক খাতে বাংলাদেশ অনেক ভালো কিছু করে দেখিয়েছে। এই উন্নয়ন ও
সংস্কার এখনও অব্যাহতভাবে চলছে। এরপরও এসব উন্নতির কোনো ব্র্যান্ডি হচ্ছে
না। এখনও এ দেশের পোশাক খাতের বাংলাদেশকে রানা প্লাজার প্রতিচ্ছবি হিসেবেই
দেখা হচ্ছে। এ জন্য সবার আগে আমাদের উন্নতির ব্র্যান্ডিং জরুরি। ক্রেতাদের
বোঝাতে হবে, বাংলাদেশ আর সস্তা শ্রমের দেশ নয়। আবির্ভূত হয়েছে পোশাকের
‘পূর্ণাঙ্গ সমাধানদাতা’ দেশ হিসেবে। এ জন্য তিনি সরকারের নীতি সহায়তার
বিষয়টিকে সামনে তুলে ধরে বলেন, দক্ষ জনশক্তি, ন্যায্যমূল্যে জমি,
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি নিশ্চয়তা, বন্দরের সক্ষমতা
বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অবশ্যই থাকতে হবে। এসবের নিশ্চয়তা
সরকারকেই দিতে হবে। মূল প্রবন্ধে সিইবিএআইয়ের পরিচালক রেজাউল হাসনাত ডেভিড
বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের গবেষণা এবং উন্নয়ন এখন পর্যন্ত বিদেশী
গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এসব গবেষণা থেকে পাওয়া
নির্দেশনা এ খাতের উদ্যোক্তাদের ভুল পথেও পরিচালিত করছে। এর প্রধান কারণ
তারা সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে নিজেরাই জানেন না। এমনকি কোন কোন বিষয় জানেন
না, সেটাও বুঝতে পারেন না। আর এ কারণেই এ খাতে নিজস্ব গবেষক এবং গবেষণা
প্রতিষ্ঠান জরুরি।
আইএলও, সিআইডিএ এবং এইচঅ্যান্ডএমের সহায়তায় গঠিত হওয়া
সিইবিএআইয়ের সে কাজটি করে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি
শাহিদুল্লাহ আজিম স্বীকার করে বলেন, এখন সময় শ্রমিক, উদ্যোক্তা থেকে শুরু
করে তৈরি পোশাক খাতের সব পর্যায়ের জনবলকেই প্রশিক্ষিত হওয়ার। একইভাবে
বিশ্বে এখন ফ্যাশনের কদর। তাই দেশের তৈরি পোশাকে বৈচিত্র্য আনার ফ্যাশন
উদ্যোক্তাসংশ্লিষ্টদেরই সৃষ্টি করতে হবে। বিজিএমইএ’র বর্তমান সিনিয়র
সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বাংলাদেশ মূলত টি-শার্ট, সোয়েটার, জ্যাকেট,
শার্ট এবং ট্রাউজার- এই পাঁচ ধরনের পণ্য তৈরির ওপর নির্ভরশীল। যা তৈরি
পোশাক খাতের মোট রফতানির প্রায় ৭৯ শতাংশ। বাংলাদেশকে এখন ক্রীড়া পোশাক,
স্যুট, অন্তর্বাসসহ উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করতে হবে। পণ্যে নানা
বৈচিত্র্যকরণে জোর দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অধ্যয়ন অনুষদের
ডিন অধ্যাপক শিবলী রোবায়েত উল ইসলাম বলেন, ৫০ বিলিয়ন রফতানি লক্ষ্যমাত্রা
অর্জনের উপায় নির্ধারণের জন্য বিজিএমইএকেই গবেষণা করতে হবে। এ ছাড়া এ
শিল্পের জন্য এখন একটি আলাদা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

No comments:
Post a Comment