Sunday, December 18, 2016

নেতিবাচক ও দল নিরপেক্ষ ভোটেই জয়-পরাজয়

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে দুই ধরনের ভোট হবে জয়-পরাজয়ের প্রধান ফ্যাক্টর। তা হচ্ছে- সরকারবিরোধী অর্থাৎ নেতিবাচক ভোট এবং দল নিরপেক্ষ নিরীহ মানুষের ভোট। প্রধান দুই মেয়র প্রার্থীর যিনি এসব ভোট কব্জা করতে পারবেন, তিনিই হাসবেন বিজয়ের হাসি। সিটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপে এ ধারণা পাওয়া গেছে। তবে ভোটের প্রকৃতি বিবেচনায় অন্তত ছয়টি হিসাব মাথায় রেখে সামনে এগোচ্ছেন প্রার্থীরা। এগুলো হচ্ছে- নতুন বা তরুণ ভোটার, নারী ভোটার, মার্কা বা প্রতীকের নিজস্ব ভোট, আঞ্চলিকতা, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের ভোট এবং ভাড়াটে ভোটার।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধান দুই মেয়র প্রার্থীর ভোট এই ছয়টি পকেটে ভাগ হয়ে যাবে। এর অধিকাংশই সরকারবিরোধী আর দল নিরপেক্ষ- এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। এরাই তাদের পছন্দের নগর প্রধান নির্ধারণ করবেন। নির্ধারণ করবেন তারা নৌকা না ধানের শীষে ভোট দেবেন। এ কারণেই ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, উল্লিখিত পকেট হিসাব নিয়ে ততই বাড়ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জীবনকৃষ্ণ মোদক যুগান্তরকে বলেন, শহরের মোট ভোটারের ৮০ শতাংশ জীবন-জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা। বাইরে থেকে আসা মানুষের মধ্যে এখানে গত দু’শ বছর ধরে বসবাসকারীও আছেন। তারা শহরের সুখ-দুঃখের সাথী। যে কারণে অতীতে এখানে ব্যক্তি ইমেজে ভোট দেয়ার রেকর্ড আছে। এবার প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকের নির্বাচন হচ্ছে। প্রতীকের সঙ্গে দলীয় রাজনীতিও চলে এসেছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হিসেবে কাউন্সিলর পদে হয়তো প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ বড় হয়ে আবির্ভূত হতে পারে। কিন্তু মেয়র পদের ক্ষেত্রে নানা হিসাব কাজ করবে। তিনি বলেন, দল নিরপেক্ষ বা সাধারণ ভোটার কোন দিকে যাবে, তা বুঝতে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। নাসিক নির্বাচনে এবার মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৯২ জন। এর মধ্যে নতুন বা তরুণ ভোটারই ৭০ হাজার জন। মোট ভোটারের মধ্যে ৪৯ শতাংশই নারী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার কাছের শহর হিসেবে জাতীয় রাজনীতির উত্তাপের সঙ্গে পরিচিত অনেকে।
তাছাড়া নারীদের মধ্যে অনেকেই খালেদা জিয়ার ভক্ত আছেন। বিপরীত দিকে আইভী এবার দলীয় প্রতীক গ্রহণ করেছেন। এসব বিবেচনায় নারীদের ভোট এবার একচেটিয়া ধানের শীষের দিকে যেতে পারে। পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের অনেকেই সরকারের গত আট বছরের কর্মকাণ্ড সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দলীয় প্রতীকের কারণে এই ভোট নিয়েও খোদ আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। নগরীর চাষাঢ়া মোড়ে কথা হয় তোলারাম কলেজের ছাত্র রোমান ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, তিনি এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে জাতির উপকার হয় এমন সিদ্ধান্তই তিনি নেবেন। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার ভোটার কহিনুর আক্তার বলেন, গত নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, সেলিনা হায়াৎ আইভী নাকি শামীম ওসমান। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত নৌকা আর ধানের শীষই আলোচনায় আছে। এবার আদর্শের প্রতিফলন ঘটবে, ইমেজের নয়। দেশে সিটি কর্পোরেশনে নারায়ণগঞ্জেই প্রথম মার্কা বা প্রতীকের নির্বাচন হচ্ছে। স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নারায়ণগঞ্জে ৪০ শতাংশের বেশি নিজস্ব ভোট আছে। এর মধ্যে বিএনপির ভোট ব্যাংক এককভাবেই দলীয় প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের দিকে যেতে পারে। কিন্তু দুঃসংবাদ আছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জন্য। গত আট দিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় ৮০ নেতার নেতৃত্বে ঢাকার দু’শতাধিক নেতাকর্মী প্রতিদিন প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা ভোটারদের কাছে বেগম খালেদা জিয়ার সালাম ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দিচ্ছেন। পাশাপাশি সারা দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরছেন ও পরিবর্তনের জন্য ভোট চাইছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় নেতারাও সার্বক্ষণিক ধানের শীষের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। বিপরীতে, ৫ ডিসেম্বর থেকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র একদিন কেন্দ্রীয় নেতাদের আইভীর সঙ্গে প্রচারণায় দেখা গেছে। এখানেই শেষ নয়,
স্থানীয় নেতাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগই তার সঙ্গে প্রচারণায় থাকছেন না। নাম প্রকাশ না করে মহানগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় নেতারা প্রচারণায় থাকুক তা আইভীই আসলে চাচ্ছেন না। যে কারণে তারা চাইলেও দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে নামতে পারছেন না। তবে হাইকমান্ডের নির্দেশনা এবং নৌকা প্রতীককে জয়যুক্ত করতে তারা আলাদা প্রচার চালাচ্ছেন। উভয় দলের সমর্থকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, দুই প্রার্থীর সঙ্গে প্রচারণায় দলীয় নেতাদের উপস্থিতির এই চিত্র শুধু তাদের কাছেই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও ধরা পড়েছে। নারায়ণগঞ্জে আঞ্চলিকতার হিসাবে মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুরের ভোটার বেশি। মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের পূর্বপুরুষের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আইভী ভাড়াটে প্রার্থী হিসেবে সাখাওয়াতকে তুলোধোনো করেছেন। এ বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের বাইরে থেকে আসা অনেক ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হিসেবে এখানে প্রার্থীই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু এবার ভোটারদের কাছে দলীয় প্রতীক মুখে মুখে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ একজনকে ১৩ বছর ধরে দেখে আসছে। আরেকজনকে কেবল আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দেখেছে। কাকে বেছে নেবে তা নিয়ে আসলে এখনও পর্যালোচনা চলছে সবার মধ্যে। নিশ্চয়ই প্রার্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে।

No comments:

Post a Comment