Wednesday, December 21, 2016

দুই দলের মর্যাদার লড়াই

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে ভোট গ্রহণ আগামীকাল বৃহস্পতিবার। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ১৭৪টি কেন্দ্রের ১ হাজার ৩০৪টি ভোটকক্ষে টানা ভোট গ্রহণ চলবে। সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতেও সৃষ্টি হয়েছে উত্তাপ। বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচনকে দেখছে মর্যাদার লড়াই হিসেবে। দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে দলীয় সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছেন দল দুটির নেতারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী জাতীয় ইস্যু। এ নির্বাচনে মেয়র পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী (নৌকা) এবং বিএনপি মনোনীত অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের (ধানের শীষ) মধ্যে। এ ছাড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট মনোনীত প্রার্থীও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইতিমধ্যে বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী।
নারায়ণগঞ্জবাসী অপেক্ষা করছেন ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেয়ার মাধ্যমে মেয়র, ৯ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর এবং ২৭ কাউন্সিলর নির্বাচনের। ২৭ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৩৮ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও ১৫৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন। ৫ ডিসেম্বর দলীয় প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পর থেকে আনুষ্ঠানিক গণসংযোগে নামে দুই দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং মাঠের প্রধান বিরোধী দলের নেতারা প্রচার চালিয়েছেন। তবে গণসংযোগে অনেকটা এগিয়ে ধানের শীষ। বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় দুই শতাধিক নেতা পুরো এলাকা চষে বেড়ান। কোন্দল ও ভেদাভেদ ভুলে স্থানীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামেন। পক্ষান্তরে নৌকার পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতাদের মাঠে তেমন দেখা যায়নি। আইভীর সঙ্গে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বও নিরসন হয়নি। ফলে নৌকার পক্ষে প্রচারে স্থানীয় নেতাদেরও মাঠে দেখা যায়নি। এদিকে তফসিল ঘোষণা থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। গণসংযোগ ছিল অনেকটা উৎসবমুখর। তবে নির্বাচনের পরিবেশ ভালো থাকলেও সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ নিয়ে শংকায় রয়েছেন প্রার্থীরা। কোথাও কোথাও গোপনে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারপরও সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নাসিক নির্বাচন নিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যুগান্তরকে বলেন, ‘নাসিক নির্বাচনকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। এ নির্বাচনের জয়-পরাজয় ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, ধানের শীষের জোয়ার উঠেছে। ভোটাররা অবাধে ভোট দিতে পারলে ধানের শীষের প্রার্থীর বিপুল জয় হবে। নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে গয়েশ্বর বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মোটামুটি সন্তুষ্ট। ভোটের দিন এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যে দলই জয়ী হবে আমরা তা মেনে নেব। তবে কারচুপি করা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।’ তবে জাতীয় রাজনীতিতে এ নির্বাচন নিয়ে বিএনপিকে ইস্যু করার কোনো সুযোগ দেয়া হবে না বলে জানান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম। তিনি বলেন, ‘নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
নির্বাচনে বিএনপি হারলে বলবে ভোট সুষ্ঠু হয়নি, আর জিতলে চুপ থাকবে। তাদের এ কৌশল আমরা জানি।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নারায়ণগঞ্জ নৌকার ঘাঁটি। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় দল। প্রার্থী হিসেবে ডা. আইভীও জনপ্রিয়। এসব কারণেই এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। নির্বাচনে সব মিলিয়ে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় দশ হাজার সদস্য থাকছেন। ভোটের দিন বৃহস্পতিবার নির্বাচনী এলাকায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ জন ও মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১৭৪টি। এর মধ্যে ৪টি অস্থায়ী কেন্দ্র। বুথের সংখ্যা ১ হাজার ৩০৪টি। নিয়োগ দেয়া হয়েছে চার হাজারের বেশি নির্বাচন কর্মকর্তা। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় আছে। আমরা আশা করছি, ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা থাকবে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কেউ আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এদিকে মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর পুলিশ লাইনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাসিক নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র দখল বা বিশৃংখলার চেষ্টা করা হলে পুলিশ সদস্যদের গুলি চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, নির্বাচনে কেউ ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘœ করার চেষ্টা করলে আইনশৃংখলা বাহিনী গুলি ছুড়বে। যদি কোনো পুলিশ সদস্য গুলি না ছোড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ শহর, বন্দর এবং সিদ্ধিরগঞ্জের সড়কগুলোতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিকে টহল দিতে দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় দেখা গেছে। ভোট নিয়ে নির্বাচনী এলাকার পথঘাট, হাটবাজার ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে চলছে একটাই আলোচনা- কে হবেন নগর পিতা।
একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে বিপাকে আ’লীগ : এ নির্বাচনে বেশিরভাগ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্তত ২০টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। বিষয়টিকে ঘরের শত্রু বিভীষণ বলছেন দলটির নেতারা। আরও জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার কারণে কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা যায়নি। কাউন্সিলর পদে একাধিক প্রার্থী নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরাও বিভ্রান্ত হতে পারেন বলে মনে করছেন তারা। এদিকে একাধিক প্রার্থীর কারণে ভোট কেন্দ্রে গোলযোগের আশংকা করছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।

৭৯ শতাংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ: নির্বাচনে মোট ভোট কেন্দ্র ১৭৪টি। এর মধ্যে ১৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ, যা মোট কেন্দ্রের ৭৯ ভাগ। সিদ্ধিরগঞ্জের সব কটি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। বাকিগুলো বন্দর ও শহর এলাকায় অবস্থিত। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তায় অন্তত ১২ জন অস্ত্রধারীসহ মোট ২৪ জন নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন। আর সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ১০ জন অস্ত্রধারীসহ ২২ জন নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বলতে আমাদের কাছে কিছু নেই। আমরা ১৩৭টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেন্দ্রের বাইরেও অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হবে।
ইসির অধীনে শেষ বড় নির্বাচন : বর্তমান কমিশনের অধীনে নাসিকই শেষ বড় নির্বাচন। ৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কমিশনারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও শেষ এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে কমিশন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমাদের সব অভিজ্ঞতা উজাড় করে এ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। ভোটের দিন সবকিছু মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
মাঠে থাকবেন ইসির ৯ গোপন পর্যবেক্ষক : নাসিক এলাকায় নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ৯ জন কর্মকর্তা গোপন পর্যবেক্ষক হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তারা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে তথ্য সংগ্রহ করে সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে জানাবেন। তাদের কর্মপরিধি হচ্ছে- ব্যালট ছিনতাই, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা, জাল ভোট, অবৈধ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নজরে এলে তাৎক্ষণিক ইসি সচিব বা অতিরিক্ত সচিবকে জানাবেন। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে কমিশন।
২ বিদেশীসহ ৩২০ পর্যবেক্ষক : এ নির্বাচনে থাকবেন ৩২০ জন পর্যবেক্ষক। এর মধ্যে ৯টি স্থানীয় সংস্থার ৩১৮ জন ও একটি বিদেশী সংস্থার দু’জন। ৯টি সংস্থার ১৮৫ জন স্থানীয়ভাবে ও এর মধ্যে ৭টি সংস্থার ১৩৩ জন কেন্দ্রীয়ভাবে ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের আওতায় ২ জন বিদেশী পর্যবেক্ষক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। ইসির জনসংযোগ পরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান জানান, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর প্রতি দলের সর্বোচ্চ ৫ জন করে ভ্রাম্যমাণ হিসেবে ভোট পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। কোনো কেন্দ্রে বা বুথে স্থায়ীভাবে কোনো পর্যবেক্ষক অবস্থান করতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতিসাপেক্ষে স্বল্প সময়ের জন্য ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন।

No comments:

Post a Comment