সম্বন্ধী
বেদারুল আহসান বেতার ও স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি বসার রুম থেকে
পশ্চিম দরজা দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার এক মিনিটের মধ্যে ঘাতকেরা এমপি লিটনকে
পরপর পাঁচটি গুলি করে পালিয়ে যাওয়া, এ সময় বাসার সাতজন কাজের লোককে বিভিন্ন
কাজে ব্যস্ত রাখা, স্মৃতির বড় বোন শান্তির ননদের পুত্র, শিলু ঘটনার
ঘণ্টাখানেক আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং একজন মাদরাসা অধ্যক্ষ মাসুদার
রহমান মুকুলের সাথে এমপি পরিবারের ঘনিষ্ঠতার ব্লু-প্রিন্ট গাইবান্ধা
সুন্দরগঞ্জের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের খুনি শনাক্তের কাজে বড় ধরনের
অগ্রগতি এনেছে বলে জানিয়েছে তদন্তরত সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সূত্র। এসব ঘটনাকে
স্ত্রী কাকতালীয় বললেও তা আসলে কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত সে বিষয়টির দ্রুত
নিষ্পত্তি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার সাথে ‘পারিবারিক বলয়ের কেউ জড়িত
থাকা এবং থাকলে কেন’ তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। যদিও তদন্ত
সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বিষয়টির সাথে স্ত্রী এবং স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী
লীগের তরফে সরাসরি জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি ফোকাস করায় তারা তদন্ত
কার্যক্রমে বাড়তি চাপ অনুভব করছে।
তবে তদন্তরতরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের
সাথে জড়িত প্রকৃত খুনিদেরই আইনের কাঠগড়ায় আনতে তৎপর। মামলার তদন্ত
কর্মকর্তা সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) আবু হায়দার মো: আশরাফুজ্জামান
গতকাল বুধবার দুপুরে জানান, এই মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।
শিগগিরই সেটি আপনাদের বলা হবে। তিনি বলেন, উপজেলার দক্ষিণ বেকাটারীর ইয়াকুব
আলীর ছেলে আইয়্বু আলীর বাড়িতে গত মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে গোপন বৈঠক
করার সময় চারজনকে আটক করা হয়েছে। সেখানে বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া গেছে। তাদের
জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় থানায় একটি বিস্ফোরক মামলা হয়েছে।
গাইবান্ধার সহকারী পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বুলবুল জানান, নিহত এমপির
স্ত্রী অসুস্থ। তিনি চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা গেছেন। বাড়িতে
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আশপাশের নিকটাত্মীয়রা আছেন। তিনি জানান,
পারিবারিক, স্থানীয় রাজনীতির বিভেদ, ব্যবসাগত অর্থনৈতিক লেনদেন,
জামায়াত-শিবির ও জঙ্গিসহ সব বিষয় মাথায় রেখে পুলিশ তদন্ত করছে। আমরা আশা
করছি, শিগগিরই খুনি ধরা পড়বে। পারিবারিক বলয়ে তদন্তের ফোকাস : ঘটনার দিন
বিকেলে হঠাৎ করেই বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিকল্পিত কিনা তা খতিয়ে
দেখছে বিভিন্ন সংস্থা। কী কারণে সব কাজের লোককে ব্যস্ত করে রাখা হয়েছিল। তা
খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাসার সাতজন গৃহকর্মী সে সময় কে কী করছিলেন সে তথ্য
নেয়া হয়েছে। সূত্র মতে এ সময় বাসার কাজের লোক সৌমেন্দ্রকে এমপির স্ত্রী
দেশী মুরগি কিনতে পাঠিয়েছিলেন। কাজের লোক সাজেদুল রুম থেকে বাড়ির ভেতরে
গিয়েছিলেন এমপির জন্য পান আনতে। আরেক কাজের লোক ইমাম হোসেন গরু গোয়ালে
ঢোকাচ্ছিলেন।
অন্য কাজের লোক ইউসুফ আলী মুরগি ঘরে ঢোকাতে গিয়েছিলেন। তিন
নারী গৃহকর্মী বিলকিস, রোকসানা ও জাবেদা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। আর
গাড়িচালক ফোরকান আকন দাঁড়িয়ে ছিলেন রান্নাঘরের পাশেই। এসব কাজের লোককে কেন
এবং কে ব্যস্ত রাখল তা আইনশৃঙ্খলাবাহিনী খতিয়ে দেখছে। হত্যাকাণ্ডে তদন্তরত
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র্যাবের গোয়েন্দা শাখা, জেলা
গোয়েন্দা পুলিশ এবং থানা পুলিশ মঙ্গলবার দিনভর এমপি লিটনের স্ত্রী স্মৃতি,
সম্বন্ধী বেদারুল আহসান বেতার, লিটনের ছেলে সাকিব সাদমান রাতিন, রাতিনের
বডিগার্ড মাজেদুল ইসলাম, এমপির গাড়িচালক ফোরকান আকন, বাড়ির তিন কাজের লোক
ইসমাইল, ইউসুফ ও সৌমিত্র, এমপির ভাগ্নি মারুফা সুলতানা শিমু, এমপির চাচী
শামীম আরা আইনি, সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একান্ত সহকারী সচিবসহ ১৩ জনকে
জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তদন্ত সংস্থাগুলোর সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদে এমপির
স্ত্রী ও সম্বন্ধী বেতারের কাছ থেকে তেমন সহযোগিতা পায়নি তদন্ত
সংশ্লিষ্টরা। তারা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। অনেক
প্রশ্নের উত্তর দেয়া থেকে বিরত থাকছেন। শ্যালক বেতারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে
অনেক প্রশ্ন জাগছে তদন্ত সংস্থার। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর
জিজ্ঞাসাবাদ, মিডিয়ার জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার পর থেকে সম্বন্ধী বেতারের
অপ্রকৃতিস্থভাব এবং কান্নার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী স্বাভাবিকভাবে দেখছে
না। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা বেতার এ ঘটনায় বড় ধরনের সাসপেক্ট তাদের কাছে।
এ ঘটনার অনেক কিছুই জানা আছে তার। জিজ্ঞাসাবাদে তার কথাবার্তা বিভিন্ন সময়
বিভিন্ন রকম হচ্ছে। সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদে লিটনের স্ত্রী তদন্তরত
সংস্থাগুলোর কাছে জানিয়েছেন হঠাৎ করে ওই দিন বাড়ি খালি হয়ে যাওয়া, কাজের
লোককে দোকানে পাঠানো নিরাপত্তারীকে বাড়ির ভেতর যেতে বলা এসব কিছুই
কাকতালীয়। তার সম্বন্ধী বেতার জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, খুনিদের তিনি দেখেছেন।
তবে তিনি তাদের চেনেন না। তারা গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছে। এমপি
উদার হওয়ায় অপরিচিত লোকদের ঢুকতে দিয়েছিলেন। এমপি যেখানে কথা বলছেন, সেখানে
থাকলে তিনি কী মনে করেন ভেবে বাইরে গেছেন। এদিকে এমপির গাড়িচালক ফোরকান
জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, তার মাথা ঠিক ছিল না। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছিলেন
না। এ কারণে তিনি খুনিদের পেছনে ধাওয়া করেছিলেন। এমপির ছেলের বডিগার্ড
মাজেদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি পান আনতে গিয়েছিলেন। তিনি কিছু
জানেন না। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, লিটনের সম্বন্ধী
বেদারুল আহসান বেতার এ ঘটনা সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। তবে এখনই তারা
নিশ্চিত করে কোনো কিছু বলতে চান না। তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে
বলছেন,
এমপি লিটন বাড়ির ভেতরে কখন, কী করছেন, কী অবস্থায় ছিলেন, বাড়ির
ভেতর থেকেই এ-সংক্রান্ত তথ্য খুনিদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল কে সেটি খতিয়ে
দেখা হচ্ছে। এমপির বোনদের বক্তব্য : মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌঁছেন
লিটনের স্ত্রী-পুত্রসহ বোনরা। এ সময় তারা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। বোনরা
শুধু জামায়াতকে নয়, বেশ কিছু বিষয় খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান
আইনশৃঙ্খলবাহিনীকে। তার বড় বোন আফরোজা বুলবুল। তিনি বলেন, লিটনকে কোলেপিঠে
করে মানুষ করেছি। এখন তার সাথে অনেক দূর। আমরা এখানে তেমন একটা আসতাম না।
এমনকি ঢাকার বাড়িতেও যাতায়াত ছিল কম। লিটনের স্ত্রীর আত্মীয়স্বজনেরাই সব
সময় আশপাশে থাকতেন। তিনি বলেন, আমরাও তো জানতাম সে সব সময় দলেবলে চলে।
বাসায় আসার পরে গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা ওকে দেখলা না। গ্রামবাসী
বলল, ওই বাড়ির ধারে কাছেও ভিড়তে দেয়া হয় না। তিনি বলেন বেদারুলের সাথে তো
কথাই বলা যাচ্ছে না। খালি কাঁদে। আমি ধমক দিলাম, এই তুমি কাঁদো কেন? ও বলে,
আপা দুটো লোক আসলো। আমি এমপিকে বললাম। এমপি আসতে দিতে বলল। ওরা ভেতরে
ঢুকছে। বেদারুল আরেকবার বলে, জানালা দিয়ে অন্য লোক গুলি করেছে। ওর কথার
কোনো ঠিক নেই। কিন্তু এটি সত্য যে, খুনিরা এক দরজা দিয়ে ঢুকেছে, আরেক দরজা
দিয়ে পাশের ঘরে গেছে বেদারুল ও স্মৃতি।
আফরোজা আরো বলেন, ঘটনার সূত্র বের
করতে হলে তো সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। সন্দেহ করা তো স্বাভাবিক।
‘জামায়াত’, ‘জামায়াত’ করলে তো হবে না। যদি জামায়াত হয় তাহলে তাই, আওয়ামী
লীগ হলে তা-ও খুঁজে বের করতে হবে। এ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে কি না, তা-ও
খুঁজে দেখতে হবে। যদি আমি হই, আমি। এনি বডি। আমরা তার পানিশমেন্ট চাই।
আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই। তিনি বলেন, প্রথমে স্মৃতির বড় ভাইকে মামলার
বাদি করার কথা বলা হয়েছিল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা বোনেরা বাদি
হবো না, হলে স্মৃতি হবে। কিন্তু পরে কাকলী হলো। একেবারে বাড়ি এসে মেরে
যাওয়া। এটি সহ্যও করতে পাচ্ছি না। আবার কিছুটা ভয়ও পাচ্ছি। আবার ও (কাকলী)
বাদি হয়েছে। ওকে আবার টার্গট করবে কি না? এমপির বোন ও মামলার বাদি ফাহমিদা
কাকলী বলেন, আমার ভাইয়ের হত্যাকারী কে, কারা করল- সেটি আমি জানতে চাই এবং
তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এভাবে গ্রামের মধ্যে এসে হত্যা করে যাওয়া
এবং সেই সুযোগটা পাওয়া সব মিলিয়ে সব অ্যাঙ্গেল থেকে পুলিশ তদন্ত করে দেখুক।
প্রত্যেকটা অ্যাঙ্গেলে তারা সার্চ করুক। আসলে কী ঘটনাটা। লিটন আমার ভাই।
হত্যাকারীর বিচার তো আমি চাইতেই পারি। যত দিন বেঁচে আছি। যত দিন বিচার না
হয়, তত দিন বিচার চাইব। স্ত্রী না হয়ে কেন আপনি বাদি হলেন এমন প্রশ্নের
উত্তরে কাকলী জানান, আমার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের দাবিতেই আমি
বাদি হয়েছি। তবে স্ত্রী না হয়ে স্ত্রীর ভাইরা কেন বাদি হবে, বিষয়টি আলোচনায়
কেন এলো, স্ত্রী কেন বাদি হলো না, কেন বোন বাদি হলো বিষয়টিও খতিয়ে দেখা
হচ্ছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষ থেকে। বোন বাদি হওয়ার পেছনে কোনো ইঙ্গিত আছে
কিনা সেটিও খতিয়ে দেখছে তারা।
এমপির স্ত্রীর বক্তব্য : লিটনের স্ত্রী
স্মৃতি মঙ্গলবার ঢাকা যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার সময় কাজের
লোকেরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার বিষয়টি কাকতালীয়। তিন দিন থেকে
ছাত্রলীগের ছেলেরা একটা মামলার কারণে ধাওয়ার মধ্যে ছিল। ওরা আসত না। দিনে
যত লোকই আসুক, সন্ধ্যা বেলাটা আমরা বামনডাঙ্গায় অফিসে যাই। এ কারণে
সন্ধ্যায় লোক কম থাকত। স্মৃৃতি জানান, লিটন জামায়াতের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ
করে তাদের কোণঠাসা করেছেন। হেফজ নামে এক শিবির নেতা লিটনকে যেখানে পাবে
সেখানেই খুন করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে ২০১৬ সালে আর কোনো হুমকি আসেনি। তিনিও
একটু গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি ওর সাথে থাকলে তো অপরিচিত লোক ঘরে ঢুকতেই
দিতাম না। আর পুলিশের নিরাপত্তা শুধু রাতে নেয়া হতো। এ মাসে বাসা আর
কোল্ডস্টোরেজে সিসি ক্যামেরা লাগানোর কথা ছিল। লিটনের স্ত্রী বলেন, ঘটনার
দিন সারা দিন একসাথে ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে মোবাইলে চার্জ দিতে পাশের ঘরে
যাবো, এ সময় বড় ভাই বেদারুল আসেন। ভাইকে নিয়ে আমি পাশের ঘরে যাওয়ার পরপরই
গুলির শব্দ শুনি। দৌড়ে বের হয়ে উঠানে গিয়ে দেখি এমপি বুকে হাত দিয়ে চিৎকার
করে বলছেন, ‘ওরা আমাকে গুলি করছে,
ধর ধর।’ কথা শুনে আমি ও আমার ভাই দৌড়ে
বাইরের দিকে আসি। এসে দেখি গাবগাছের নিচে একটি মোটরসাইকেলে তিনজন উঠছে। খুব
ভালো করে খেয়াল করতে পারিনি। এ সময় একজন তাদের দিকে গুলিও চালায়, এতে আমি
উল্টে পড়ি। তিনি বলেন, বাড়ির সামনে গাড়িচালক এমপির চিৎকার শুনে এবং
দুর্বৃত্তদের ছুটতে দেখে গাড়ি নিয়েই তাদের ধাওয়া করেন। আহত লিটনকে সাথে
নিয়ে আমি, ইসমাইল ও বেতার গাবগাছতলায় বেরিয়ে আসি। সে সময় আহত লিটন দাঁড়িয়েও
থাকতে পারছিলেন না। গাড়ি না থাকায় একটি মোটরসাইকেলের মাঝখানে বসিয়ে আহত
লিটনের কথামতো তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এ সময় চালক এসে পড়লে
ওই গাড়িতেই প্রতিবেশী নয়ন ও রেজাউল এবং বেতারসহ এমপি লিটনকে নিয়ে রংপুর
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই
ঘটনাগুলো ঘটে যায়। সম্বন্ধী বেতারের বক্তব্য : এদিকে এমপি লিটনের সম্বন্ধী
বেদারুল আহসান বেতার জানান, বোন একটা কাজ দিচ্ছিল। সন্ধ্যায় বোনের বাড়ি
যাওয়ার পরেই বোন বলল ওরা বের হবে, অফিসে যাবে, হাতে সময় নেই। এমপি পাড়ার
ছেলেদের বল দিয়ে বিদায় দিলো। বোনের ফোনে চার্জ নেই। বোন বলল পাশের রুমে যাই
চার্জ দিতে, কাগজগুলো তাড়াতাড়ি দে। বোন অলরেডি ঘরে ঢুকছে। আর আমি পশ্চিম
দরজায় যখন কাত হয়ে ঘুরব।
তখন তিনটা ছেলে এসে লিটনকে বলল, ভাই আপনার সাথে
কথা বলব। এমপি বসতে বললেন, আমি পাশের রুমে বোনকে কাগজ বুঝে দিচ্ছি, এর
মধ্যেই গুলির শব্দ। ভগ্নিপতির চিৎকার পাই। তিনি বলেন, আমি হামলাকারীদের
চিনতে পারিনি। আমরা তো সব সময় যাতায়াত করি না। ছোট বোন, ছোট ভগ্নিপতি,
আমাদের সে রকম দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়। আর উনি বিভিন্ন লোকজনের সাথে
কথাবার্তা বলেন, তিনি উদার মনের মানুষ। তবে হামলাকারীদের মাফলার পরা ছিল,
তবে মুখ ঢাকা ছিল না। তবে তদন্তরত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এক
কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, বেদারুলের বর্ণনা ও আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে
তাদের সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যেহেতু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে
জামায়াতকে দায়ী করা হচ্ছে, তাই তারা তদন্তে বাড়তি চাপ বোধ করছেন। হুট করে
বেদারুলকে বা লিটনের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান না তারা। আলোচনায়
মাদরাসা অধ্যক্ষ : তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সুন্দরগঞ্জের ইমামগঞ্জ
মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাসুদার রহমান মুকুল মার্চ মাসে আওয়ামী লীগে
যোগ দেন। যোগ দিয়েই তিনি প্রথমে এমপির ঘনিষ্ঠ হন। লিটনের শ্বশুরবাড়ির
লোকজনের সাথে তার ছিল অতিশয় দহরম মহরম। তিনি শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথে এক
হয়ে ঘটনায় কতটুকু সম্পৃক্ত তাও খতিয়ে দেখছে তদন্তসংস্থাগুলো। এদিকে গতকাল
গাইবান্ধায় এক ভিডিও কনফারেন্সে পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর
এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, তারা লিটন হত্যা রহস্য উদঘাটনের তৎপরতা শুরু
করেছে। পুলিশ আশাবাদী প্রকৃত তথ্য শিগগিরই জানা যাবে। দোষী ব্যক্তিদের
আইনের আওতায় আনা হবে। এর আগে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এমপি লিটন হত্যার
ঘটনায় আমরা অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে তথ্য মিলবে
তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে। এ েেত্র কারো দলীয় বা অন্য কোনো পরিচয় দেখা
হবে না। আসামিকে আসামি হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। র্যাব-১৩ অধিনায়ক এ টি এম
আতিকুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, এমপি লিটন খুনের ঘটনা সর্বাধিক গুরুত্ব
দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনা উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য
করা ঠিক হবে না। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার ফারুক আহমেদ সাংবাদিকদের
জানান, তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছে। কী ধরনের অগ্রগতি এ বিষয়ে তিনি জানান,
তদন্তাধীন আছে। এখন কিছু বলা যাবে না। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি জানান,
পুলিশের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ হচ্ছে। লিটন হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি
হচ্ছে। শিগগিরই খুনিরা ধরা পড়বে। এদিকে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপারকে
প্রধান করে একটি তদন্ত সহায়ক টিম করা হয়েছে। এই টিম তদন্ত তদারকি এবং
বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সহায়তা করবে। পারিবারিক,
জামায়াত-শিবির, উগ্রবাদী, দলীয় রাজনৈতিক প্রতিপ, আর্থিক বিরোধ সর্বশেষ জেলা
পরিষদ নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম চালানো
হচ্ছে। তদন্তরত সূত্রগুলো জানায়, ১৪ ডিসেম্বর নিজ গাড়িতে করে এমপি নিজ
বাড়িতে আসেন।
ঘটনার দিন পর্যন্ত ১৭ দিন খুনিরা তাকে অনুসরণ করেছে। তিনি
কখন, কোথায় কী করছেন, নিজ বাড়িতে তিনি কখন কী করেন, দুপুরের পর থেকেই
লিটনের বাড়ি ঘিরে নজরদারি করছিল পাঁচ খুনি। এই পাঁচজন দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির
আশপাশে অবস্থান করার পরও কেউ তাদের সন্দেহ করেনি। এমনকি বিনা বাধায় লিটনের
বৈঠকখানায় তাদের ঢুকে স্ত্রী ও শ্যালককে বের করে দিয়ে কথা বলার বিষয়টি
কোনোভাবেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তার বাড়িতে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই,
লিটনের কাছে কোনো পিস্তল নেই এসব বিষয়েও তথ্য ছিল খুনিদের কাছে। এই
বিষয়টিকে ফোকাস করে তদন্ত সংস্থাগুলো মনে করছে বাড়ির ভেতরেরই কেউ
হত্যাকাণ্ডে সমন্বয় করেছে। যেকোনো মুহূর্তে তারা সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতার
করে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি অপেক্ষায় আছেন। শুধু ওপর থেকে সিগনালের
অপেক্ষা। গত ৩১ ডিসেম্বর এমপি লিটন খুন হন। ১ জানুয়ারি তার ঢাকায় ফেরার কথা
ছিল, ব্যাগও গোছানো হয়েছিল। কিন্তু আগের দিন ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গায় নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়
এমপি লিটনকে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান
তিনি। রংপুর, ঢাকা, সুন্দরগঞ্জে নামাজে জানাজা শেষে গত সোমবার বিকেলে তাকে
পিতামাতার পাশে দাফন করা হয়।

No comments:
Post a Comment