Sunday, January 8, 2017

২০ ‘গৃহত্যাগী’র খোঁজে মাঠে গোয়েন্দারা

নিউ জেএমবির ‘গৃহত্যাগী’ ২০ দুর্ধর্ষ জঙ্গির খোঁজে নেমেছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটি)। এরা বৃহস্পতিবার রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত নূরুল ইসলাম মারজানেরও ঘনিষ্ঠ। জঙ্গি হামলা, বোমা, বিস্ফোরক মজুদসহ দেশব্যাপী নাশকতার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জঙ্গিবাদে দীক্ষা নিয়ে অনেক আগেই ঘর ছেড়েছে। আত্মগোপনে থেকে নিউ জেএমবিকে নতুন করে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। রিমান্ডে থাকা দুই নারী জঙ্গির কাছ থেকেও দুর্ধর্ষ এসব জঙ্গির সম্ভাব্য কিছু আস্তানার খোঁজ মিলেছে। তবে ওইসব আস্তানায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে পাওয়া যায়নি। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মারজান ও সাদ্দাম হোসেনের লাশের ময়নাতদন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সম্পন্ন হয়েছে।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন গুলিতেই তাদের দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার রাতের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছে সিটি। ‘গৃহত্যাগী’ জঙ্গিদের বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি একেএম শহীদুল হক শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পুলিশের জোরালো অভিযান অব্যাহত আছে। ভবিষ্যতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। যেখানে যার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যাবে সেখানেই অভিযান চালানো হবে। তিনি আরও জানান, তাদের কেউ অনুতপ্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে ফিরে আসতে চাইলে পুলিশের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা হবে। জঙ্গি কার্যক্রম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। সিটির একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে জানান, নিউ জেএমবির অনুসারী সংখ্যা অনেক। তাদেরকে অভিযানে দুর্বল করা গেলেও নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে ‘গৃহত্যাগী’ যেসব দুর্ধর্ষ জঙ্গি আছে তাদের সংখ্যা কমপক্ষে ২০ জন। এদের প্রায় সবাই আহলে হাদিসের অনুসারী। এরা আত্মগোপনে থেকে নিউ জেএমবিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে আছে- রাজশাহীর বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেট, রাজশাহীর বাগমারার মইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসা, নিহত মারজানের খালু সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ,
মারজানের ভগ্নিপতি জয়পুরহাটের হাদিসুর রহমান সাগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট মিজান, বড় মিজান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার নজিবুল্লাহ আনসারী, গাইবান্ধার সাঘাটা থানার জাহাঙ্গীর আলম ওরফে সুভাষ ওরফে রাজিব গান্ধী, গাইবান্ধার হৃদয়, রংপুরের শেখ ইফতিসাম আহম্মেদ সামি, ঢাকার কলাবাগানের কাজী মো. মইনউদ্দিন শরিফ, ধানমণ্ডির জোবায়েদুর রহিম, আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পর পলাতক ফিরোজ ও সেলিম। এসব নামের অনেকগুলোই সাংগঠনিক নাম বলে জানান সিটি কর্মকর্তারা। এক প্রশ্নের জবাবে এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি বনানী থেকে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রসহ ৫ যুবক স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছে। তারা হল : সাঈদ আনোয়ার খান, জায়েদ হোসেন পাভেল, মো. সাফায়েত হোসেন, মো. সুজন ও মো. মেহেদী হাসান। তারা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়ে গৃহত্যাগের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে দু’জনের সম্ভাব্য অবস্থানও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শিগগির তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন তিনি। সিটির এক কর্মকর্তা জানান, স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগী তরুণদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আগেই পাওয়া গেছে। এরা কেউ মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে এসেছে কিনা- জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা জানান, তারা কেউ এখন পর্যন্ত দেশে ফিরে আসেনি। ফিরে এলেই তাদের গ্রেফতারসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিটি সূত্র জানায়, নূরুল ইসলাম মারজান গুলশান হামলার অপারেশনাল কমান্ডার ও অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল। তার ভগ্নিপতি হাদিসুর রহমান সাগর নিউ জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক ভারত থেকে দেশে নিয়ে আসে। সে গ্রেনেড তৈরিতে পারদর্শী। গুলশান হামলার আগে সেও তার স্ত্রী খাদিজাকে নিয়ে গৃহত্যাগ করে। তার বাড়ি জয়পুরহাট সদরে। মারজান তার মাধ্যমেই জঙ্গিবাদে দীক্ষা নেয়। ছোট মিজান,
বড় মিজান এবং সোহেল মাহফুজও নিউ জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। গুলশান হামলার গ্রেনেড সরবরাহ করেছিল সোহেল মাহফুজ। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র বাসারুজ্জামান একসময় ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় থাকত। তার বাড়ি রাজশাহীর তানোরে। অত্যন্ত চৌকস ও মেধাবী এই তরুণ নিউ জেএমবি সংগঠিত করে হাল ধরতে পারে- এমন ধারণা সিটি কর্মকর্তাদের। তাদের দেয়া তথ্যমতে, ‘গৃহত্যাগী’ রংপুরের শেখ ইফতিসাম আহম্মেদ সামি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অনার্স তৃতীয় বর্ষের এবং ঢাকার কলাবাগানের কাজী মো. মইনউদ্দিন শরিফ স্কলাস্টিকা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র ছিল। এ ছাড়া মালয়েশিয়ান মেরিন একাডেমির ক্যাডেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার চকনাধারা গ্রামের মোহাম্মদ রফিকুল্লাহ আনসারির ছেলে নজিবুল্লাহ আনসারিও নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। গুলিতেই মারজান ও সাদ্দামের মৃত্যু : মারজান ও সাদ্দামের ময়নাতদন্ত শেষে ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, দু’জনের শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর সাদ্দামের শরীর থেকে তিনটি গুলি বের করা হয়েছে। দুই লাশের ভিসরা নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য দুই জঙ্গির লাশ থেকে ঊরুর মাংসপেশি রাখা হয়েছে। তারা শক্তিবর্ধক কোনো ওষুধ সেবন করত কিনা তা পরীক্ষার জন্য রক্ত ও প্রসাবের নমুনা রাখা হয়েছে। এগুলো মহাখালীতে রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা : বন্দুকযুদ্ধে মারজান ও সাদ্দাম নিহত হওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলাটির বাদী সিটির এসআই মো. আজগর আলী। এজাহারে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে মোটরসাইকেলে করে চালকসহ তিন আরোহী চেকপোস্টের কাছে আসে। থামতে বললে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে হ্যান্ড গ্রেনেড ও গুলি ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে মোটরসাইকেল আরোহী এক জঙ্গি পালিয়ে যায়। দুই ‘জঙ্গি’ মারজান ও সাদ্দাম নিহত হয়। জঙ্গিদের মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় হামলার পরিকল্পনা ছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
স্বীকারোক্তি দিতে রাজি দুই নারী জঙ্গি : ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন রিপল টোয়েন্টিফোর’ অভিযানের সময় আত্মসমর্পণ করা দুই নারী জঙ্গি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছে।
তারা হল : গত সেপ্টেম্বরে রূপনগরে নিহত মেজর (অব.) জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা ও জঙ্গি মইনুল ইসলাম মুসার স্ত্রী তৃষা মনি ওরফে আয়েশা। সিটির এক কর্মকর্তা জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তারা আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু আদালতে নেয়ার পর বোঝা যাবে তারা জবানবন্দি দিবে কিনা। কারণ তারা যে কোনো সময় মত পরিবর্তন করতে পারে। সিটির ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তৃষা মনি অনুতপ্ত, তবে শিলা নয়। প্রথম দফায় সাত দিনের রিমান্ড শেষে ৩ জানুয়ারি তাদের দ্বিতীয় দফায় ৬ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। ১০ জানুয়ারি জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য তাদের আদালতে হাজির করা হতে পারে।
সাদ্দামের লাশ আনতে যাবেন না বাবা : যুগান্তরের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আহসান হাবীব নীলু জানান, শনিবার বিকালে রাজারহাট উপজেলার চরবিদ্যানন্দ গ্রামে সাদ্দামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে মানুষের ভিড়। তারা যাকে ভালো ছেলে হিসেবে জানতেন তার এ পরিণতি হতবাক করেছে স্থানীয়দের। বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়াটা কৃতকর্মের ফল বলে মনে করেন তারা। সাদ্দামের বাবা তাজুল আলম ওরফে আলম জোলা সন্তানের কৃতকর্মের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে অপকর্মের সাজা পেয়েছে। আমরা তার লাশ আনতে যাব না। তবে লাশ নিষ্পাপ।
সরকার নিজস্ব উদ্যোগে পাঠালে আমরা দাফনের ব্যবস্থা করব।’ সাদ্দামের মা সুফিয়া বেগম ওরফে ছোবেদা বেগম বলেন, ‘ছেলে কী করেছে জানি না। তার মুখটা দেখতে ইচ্ছা করছে। সরকারের কাছে অনুরোধ লাশটা যেন পাঠিয়ে দেয়। এখানে কবর দেব।’ কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মেহেদুল করিম জানিয়েছেন, সাদ্দামের লাশের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

No comments:

Post a Comment