Tuesday, January 24, 2017

জলবায়ু প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবে : টিআইবি

জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, প্রকল্প প্রণয়ন, প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ও ঠিকাদার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের মতে, এখানে জনগণের সম্পৃক্ততাকে গৌণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সরকার নিজের মতো করে করছে। ফলে দুর্নীতির আশঙ্কা থেকে যায়। টিআইবি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থ ব্যবহারেও রাজনৈতিক ছায়া রয়েছে। নীতিমালার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গতকাল জলবায়ু অর্থায়ন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান : প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন নিয়ে টিআইবির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ধানমন্ডির সংস্থার কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি এই প্রতিবেদনটি তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন টিআইবির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন যৌথভাবে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ এস এম জুয়েল ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাহিদ শারমিন। এই গবেষণায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাস্তবায়িত ছয়টি প্রকল্পের প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী তিন ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান- পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত। গবেষণায় সুশাসনের আটটি সূচক যেমন- প্রকল্প গ্রহণে যৌক্তিকতা, জন-অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, ন্যায্য বণ্টন, সঙ্গতিপূর্ণ বাস্তবায়ন, কার্য-সম্পাদন দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং শুদ্ধাচার আলোকে তথ্য সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। টিআইবি গবেষণায় বলা হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের ছয়টি জলবায়ু প্রকল্পের কোনোটিতেই প্রকল্প প্রণয়নকালে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। প্রকল্প প্রণয়নে সুশাসনের যে চ্যালেঞ্জসমূহ পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ছয়টি প্রকল্পের কোনোটিতেই কমিউনিটি পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রভাব এমনকি চাহিদা নিরূপণ কিংবা বিপদাপন্নতা বিশ্লেষণ করা হয়নি। ছয়টি প্রকল্পের কোনোটিতেই প্রকল্প প্রণয়নকালে জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি, প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরিতে সংশ্লিষ্ট মেয়র/জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও পৌর সচিবের মুখ্য ভূমিকা, পাঁচটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদের অংশগ্রহণ না থাকা, চারটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কমিউনিটি পর্যায়ে চাহিদা নিরূপণ ও বিপদাপন্নতা বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রস্তাবনায় যেসব সমস্যা উল্লেখ করা হয় তার ভিত্তিতে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকল্প কর্মসূচি এবং বাজেট কমানো হয়। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে তথ্যের উন্মুক্ততার ঘাটতি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০ অনুসারে জলবায়ু প্রকল্পের সাথে অন্য প্রকল্পের দ্বৈততা পরিহারের নির্দেশ থাকলেও একটি প্রকল্পের মাধ্যমে অন্য প্রকল্পের অসমাপ্ত প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি প্রকল্পে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সচিব, মেয়র ও প্রকৌশলী কর্তৃক আত্মীয়, বন্ধু এমনকি রাজনৈতিক বিবেচনায় ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছে। একটি প্রকল্পে তহবিল বরাদ্দের পরও নবনির্বাচিত মেয়র ভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত হওয়ায় প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিসিসিটি কর্তৃক গুণগত পরিবীক্ষণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকালে স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক পরিবীক্ষণে ঘাটতি এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ কর্তৃক প্রকল্প মূল্যায়নে ঘাটতি। এ ছাড়া পরিবীক্ষণের সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা হয় না। সুশাসনের ঘাটতির কারণ হিসেবে আইন, নীতিমালা ও নির্দেশিকায় দুর্বলতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি, প্রকল্প পর্যালোচনা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা এবং স্থানীয় জলবায়ু বিপদাপন্নতা এবং বরাদ্দের মধ্যে অসামঞ্জস্য উল্লেখযোগ্য। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তহবিল ব্যবহারে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে, যার কারণে সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ হচ্ছে না। গতানুগতিক অর্থভাণ্ডার হিসেবে এই তহবিল ব্যবহার হচ্ছে। ঠিকাদার নিয়োগে নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না। সুলতানা কামাল বলেন, এই ফান্ড যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণের নাম করে এই ফান্ডের টাকা বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে, এই তহবিল যেন সুষ্ঠুভাবে এবং কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। বিসিসিটি-এর জন্য তহবিল ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

No comments:

Post a Comment