Wednesday, January 11, 2017

শরীয়তপুরে আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১ আহত ২০

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে হোসেন খাঁ নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। প্রতিপক্ষের ছোড়া বোমার আঘাতে তার মাথার ডান পাশের অংশ উড়ে গেছে। তিনি আওয়ামী লীগ কর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে। সংঘর্ষে উভয় গ্রুপের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের জাজিরায় বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
আশংকাজনক অবস্থায় ২ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের আবদুর ব্যাপারী কান্দিগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতের সমর্থকরা পুলিশের উপস্থিতিতে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৩ জনকে আটক করেছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। বিকালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলার প্রক্রিয়া চলছিল। ঘটনার পর ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গ্রেফতার আতংকে ব্যাপারী কান্দিগ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। জাজিরা থানা, স্থানীয় সূত্র ও নিহতের চাচাতো ভাই নুর হোসেন খাঁ জানান, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বড়কান্দি ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সিরাজ সরদার ও সাবেক চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগ নেতা সফি খলিফার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত ১ বছরে উভয় গ্রুপের সমর্থকরা কমপক্ষে ৩০ বার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব ঘটনায় উভয় গ্রুপের ২ শতাধিক লোক আহত হন। গত রোববার রাত ১০টার দিকে উপজেলার জাজিরা ইউনিয়নের দূর্বাডাঙ্গা বাজারে সফি খলিফা ও সিরাজ সরদার সমর্থকদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় বোমা বিস্ফোরণে উভয় গ্রুপের কমপক্ষে ১৫ জন আহত হন। এদের মধ্যে ৪ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনার জের ধরে মঙ্গলবার সকালে আবদুল ব্যাপারী কান্দিগ্রামে সিরাজ সরদার সমর্থক বাবুল ব্যাপারী, মোক্তার ব্যাপারী, জালাল ব্যাপারী, লতিফ ব্যাপারী, হাচেন ব্যাপারী, হযরত আলী ব্যাপারীসহ ২০-২৫ জন আওয়ামী লীগ নেতা সফি খলিফা সমর্থক হোসেন খাঁর বাড়িতে যান। গিয়ে বলেন, তুই সফি খলিফার সঙ্গে দল করতে পারবি না। আমাদের সঙ্গে দল করতে হবে। না করলে তোকে মেরে ফেলব। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে লাঠিসোটা, ঢাল-সড়কি, রামদা, ছেনদা, ককটেল, টেঁটা নিয়ে উভয় গ্রুপের সমর্থকরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষের সময় উভয় গ্রুপের লোকজন পরস্পরকে লক্ষ্য করে ২ শতাধিক বোমা নিক্ষেপ করে। এ সময় প্রতিপক্ষের ছোড়া বোমার আঘাতে সফি খলিফা সমর্থক হোসেন খার মাথার ডানপাশের অংশ উড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। সংঘর্ষে নুর হোসেন খাঁ, নুরু মিয়া খাঁ, জাহাঙ্গীর মাদবর, সেকান্দর ছৈয়াল, বাবুল ব্যাপারী, দিল মোহাম্মদ ব্যাপারী, আ. রহমানসহ উভয় গ্রুপের কমপক্ষে ২০ জন গুরুতর আহত হন। সেকান্দর ছৈয়াল ও নুর হোসেন খাঁকে জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। নুরু মিয়া ও জাহাঙ্গীর মাদবরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের শরীরে টেঁটাবিদ্ধ হয়। আহত অন্যদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হোসেন খাঁ নিহত হওয়ার পর তার সমর্থকরা প্রতিপক্ষের অন্তত ৫০টি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও ক্ষতি সাধন করে। এ সময় মূল্যবান মালামাল লুট হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই গ্রামে পুলিশ পাহারায় থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলে এলাকাবাসীর অনেকে জানিয়েছেন। জাজিরা থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। নিহত হোসেন খাঁর স্ত্রী মেরিনা বেগম বলেন, সিরাজ সরদারের লোক বাবুল ব্যাপারী,
দিল মোহাম্মদ ব্যাপারী, জালাল ব্যাপারী, মোক্তার ব্যাপারীসহ ২০-২৫ জন মঙ্গলবার সকালে আমাদের বাড়ি এসে আমার স্বামী হোসেন খাঁকে বলে, ‘তুই সফি খলিফার সঙ্গে দল করতে পারবি না। আমাদের সঙ্গে দল করতে হবে। না হলে তোকে ভাগ্নির বিয়ে খেতে দিব না।’ এ কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আমার স্বামীকে বোমা মেরে খুন করে। আমি আমার স্বামী হত্যাকারীদের বিচার চাই। নিহত হোসেন খাঁর মা ইয়ারন বিবি বলেন, আমার ছেলে হোসেন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা থাকে ভাগ্নির বিয়ে খাওয়ার জন্য সোমবার সকালে বাড়ি আসে। বাড়ি আসার পর মারামারির মধ্যে পড়ে জীবন দিল। বাবুল ব্যাপারী ও তাদের লোকজন আমার ছেলেকে খুন করেছে। এদিকে সিরাজ সরদার সমর্থক বাবুল ব্যাপারীর স্ত্রী ফাহিমা বলেন, ‘নিহত হোসেন খাঁর আত্মীয়স্বজন ও দলবলের ২০-২৫ জন আমাদের ঘরবাড়িতে হামলা করে ব্যাপক ভাংচুর করে। এ সময় তারা লুটপাট করে মূল্যবান মালামাল নিয়ে গেছে। আমরা বাধা দিলে আমাদের মারধর করা হয়।’ আবদুল ব্যাপারী কান্দিগ্রামের ইসমাইল মাদবরের স্ত্রী ফাহিমা বেগম বলেন, ‘আমার ঘর থেকে স্টিলের আলমারি, সোনার গহনা ও টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে গেছে। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা করে। পুলিশের কাছে জানানোর পর তারা কিছু বলেনি।’ জাজিরা থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বেশকিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।’

No comments:

Post a Comment