Saturday, January 14, 2017

সরকারি চাকরিতে মেধা বনাম কোটা

কোটা ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের মেধাবীরা নিষ্পেষিত হচ্ছেন। মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ কথা বলে বিভিন্ন মহল থেকে এ ব্যবস্থা বাতিলের দাবি উঠছে। কোটা ব্যবস্থার বিপক্ষে দাবি উঠলেও এ ব্যবস্থার পক্ষে কারও কোনো বক্তব্য শোনা যায় না। তাহলে কি কোটা প্রথা বিলুপ্ত বা সংস্কার এখন যুগের দাবি? বর্তমান কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের বিপক্ষে আমিও কোনো কথা বলতে চাইনি। তবে কোটার কারণে সরকারের প্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে বলে যে বক্তব্য দেয়া হচ্ছে সে বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে আরম্ভ করে গ্রামের চৌকিদার পর্যন্ত সব স্তরের সব কর্মচারী, যারা সরকারের পক্ষে জনগণের সেবায় নিয়োজিত, তাদের নিয়েই সরকারের প্রশাসনযন্ত্র। বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনে সক্ষম যোগ্য কর্মচারী নিয়োগ দেয়া সরকারের দায়িত্ব। সব স্তরের কর্মচারী নিয়োগের বিদ্যমান প্রক্রিয়া বর্ণনা করে লেখার পরিধি বাড়াতে চাই না। কেবল সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে যে নিয়োগ সম্পন্ন হয় তা নিয়ে আলোচনা করলে সরকারের প্রশাসন মেধাশূন্য হয়েছে কিনা বা মেধাহীন কর্মচারী দিয়ে সরকার জনগণের সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছে কিনা, কিছুটা হলেও তার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন ১ম ও ২য় শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে।
সে সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ করে থাকে। আলোচ্য নিবন্ধে ১ম শ্রেণীর ক্যাডার পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই, যেখানে সর্বোচ্চ মেধার সমাবেশ ঘটে থাকে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রার্থীর সংখ্যাধিক্যের কারণে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এ পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্টসংখ্যার প্রার্থী বাছাই করা, যাদের লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০০ নম্বরের এ পরীক্ষা নেয়া হলেও বর্তমানে তা ২০০ নম্বরের নেয়া হচ্ছে। এ পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়- ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হন। অর্থাৎ ৫ বা ১০ শতাংশ পরীক্ষার্থী ২০০ নম্বরের একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১০০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর হিসেবে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন বাধ্যতামূলক। এরপর থাকে ২০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা। সে পরীক্ষার পাস নম্বর ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০০। তিন থেকে চার সদস্যের বোর্ডে শুধু হাজিরা দিয়ে ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন করার কোনো দৃষ্টান্ত আছে কিনা তা জানা নেই। তবে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দুই থেকে তিনবার বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার পরও শুধু কোটার কারণে চাকরি পাননি এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এর কারণ শুধু কোয়ালিফাইং নম্বর পেলেই মুক্তিযোদ্ধা বা যে কোনো কোটায় চাকরি পাওয়া যায় এমন ধারণা সঠিক নয়। তাহলে একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেশ কয়েকটি স্তরে অন্যান্য প্রতিযোগীর সঙ্গে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বা অন্য যে কোনো কোটায় চাকরি লাভের পর সেই মেয়ে বা ছেলেটি কীভাবে মেধাশূন্য হয়ে পড়ে, তা ভাবতেও কষ্ট হয়। তবে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগকৃতদের চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েও অনেকে বঞ্চিত হন এটা সঠিক। আর এটাও সঠিক যে, পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে মেধা ও কোটায় চাকরিপ্রাপ্তদের চেয়েও অনেক মেধাবী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেন না। কারণ এ পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন থাকে তা মেধা যাচাইয়ে কতখানি সহায়ক তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
পরিবর্তনের অঙ্গীকার বর্তমানকালের একটি স্মার্ট পদ্ধতি। একঘেয়েমি কোনো কিছুই কারোর মনঃপূত নয়। তাই কেউ কোনো পরিবর্তনের অঙ্গীকার করলে দল বেঁধে সবাই তার দলে ভিড়ে যান। পরিবর্তনটা আসলে কী তা জানার প্রয়োজনও মনে করেন না অনেকেই। তবে দেশের শিক্ষা বা পরীক্ষা পদ্ধতিতে বেশ ঘনঘন যেসব পরিবর্তন দৃশ্যমান, তা প্রকৃত মেধা যাচাইয়ে কতখানি সহায়ক এ নিয়ে অনেক ভুক্তভোগীই নানা ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যপুস্তক থেকে আরম্ভ করে সব পাঠ্যপুস্তকে যে পাঠক্রম বিদ্যমান সেটা ছেলেমেয়েদের মেধা বিকাশে কতখানি সহায়ক ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে প্রগাঢ় গবেষণার প্রয়োজন। অনস্বীকার্য হলেও এ ধরনের কোনো গবেষণা হচ্ছে কিনা তা আমরা জানি না। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন দৃশ্যমান। এসব পরিবর্তন কোনো গবেষণার ফল, না খেয়ালখুশি সিদ্ধান্ত তা স্পষ্ট নয়। কারণ কোনো কোনো স্তরের পরীক্ষা বাতিল নিয়ে যখন কোনো দাবি উত্থাপিত হয়, তখন সে দাবি খণ্ডনে কোনো বিবৃতি দেখা যায় না। সিভিল সার্ভিসের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন সবার জানা। স্বাধীনতা-উত্তর প্রশাসনে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটে। পরবর্তীকালে একেক ব্যাচ একেক পদ্ধতিতে নিয়োগলাভ করে। সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্নতর পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন ব্যাচের মধ্যে একেক রকম কমপ্লেক্সিটি তৈরি হয়। এর ফলে প্রশাসনে মেধার মান বিচারে কনিষ্ঠ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পরোক্ষভাবে হলেও অবজ্ঞা করা শুরু করেন। কোন ব্যাচ কত নম্বরের পরীক্ষা দিয়ে সিভিল সার্ভিসে এসেছে তা প্রকাশ্যেই উচ্চারিত হয়। এর ফলে প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড অনেকটাই বিঘিœত হয়। এসব বিতর্কের সঙ্গে নতুন মাত্রা হিসেবে আবির্ভূত হয় শ’য়ে শ’য়ে কর্মকর্তা নিয়োগ। কোনো একসময় পরপর তিনটি ব্যাচে নিয়োগ করা হয় প্রায় সতেরোশ’ কর্মকর্তা, যা প্রশাসনের সর্বমোট কর্মকর্তার কয়েকগুণ বেশি। এ বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগের ফলে পরীক্ষার নম্বর বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের সুযোগ লাভ করেন। পরীক্ষার নম্বরকে মেধা যাচাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি বিবেচনা করলে সমালোচকদের দাবির যৌক্তিকতা পাওয়া যাবে। তবে বিভিন্ন ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নম্বরের বিস্তর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাচের শুধু মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে কখনও কোনো কথা শোনা যায়নি। বরং ব্যাচের মেধা তালিকার অনেক নিচে অবস্থানকারী বেশকিছু কর্মকর্তা সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনে যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে সমর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে তালিকার শীর্ষে অবস্থানকারী কর্মকর্তাকে নানা অপবাদ মাথায় নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। তাই হয়তো অনেককে বলতে শোনা যায়- ‘ভালো ছাত্র ভালো কর্মকর্তা হবেন এমনটি সর্বক্ষেত্রে সঠিক নয়।’ আলোচনার মূল বিষয় হল মেধাশূন্য প্রশাসন আর মেধা পাচার। এ বিতর্কের মুখোমুখিতে প্রথমে যা জানা প্রয়োজন তা হল সরকারের প্রশাসনে কী ধরনের মেধার প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা। নিয়োগবিধির শর্ত অনুযায়ী যে কোনো বিষয়ে স্নাতকধারী এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্য। এখানে এমবিবিএস পাস করে ম্যাজিস্ট্রেট হতে কোনো বাধা নেই। প্রকৌশলে ডিগ্রি লাভ করে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগের সুযোগ অবারিত। বাংলায় ডিগ্রি নিয়ে অডিট ক্যাডারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হতে কোনো অসুবিধা পরিলক্ষিত হয় না। কৃষিবিদ হতে পারেন কাস্টমস ক্যাডারের ডাকসাইটে কর্মকর্তা। এই যখন অবস্থা তখন মেধা মেধা করে কোটা ব্যবস্থার সমালোচনা কি শুধুই কথার কথা, তা নিয়ে কি সত্যি সত্যি ভাবার সময় হয়নি? আমি তো মনে করি, শূন্য মেধা নিয়ে কোনো মানব জন্মগ্রহণ করেন না। একজন মৃৎশিল্পী তার নিপুণ হাতে কাদামাটি দিয়ে মূর্তি বানিয়ে স্বর্গের দেবীকে মর্তে নামিয়ে আনতে সক্ষম। তাহলেও তিনি কিন্তু দেবীকে তুষ্ট করতে ছন্দের তালে তালে ঢাক পেটাতে পারেন না।
এমনিভাবে মানবকুলের সবাই বিশেষ বিশেষ মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মেধার পরিচর্যার মাধ্যমে তা পরিপূর্ণ রূপলাভ করে। আর পরিপূর্ণ মেধাই প্রকৃত সেবাদানে সক্ষম হয়ে থাকে। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমলে নিয়ে মেধার শ্রেণীবিন্যাস ঘটিয়ে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মেধাকে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে দেশ ও জাতির প্রয়োজনীয় দক্ষ সেবক তৈরি করা সম্ভব। তাহলেই কোনো ক্ষেত্রই মেধাশূন্য থাকবে না। নিজ নিজ পেশার সমমর্যাদায় মর্যাদাবান হয়ে তখন একজন মেধাবী প্রকৌশলী পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার আগ্রহ দেখাবেন না। অন্যদিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের আইনশৃংখলা রক্ষার চ্যালেঞ্জিং কাজে আত্মনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট বিষয়ে লেখাপড়া করে অন্য পেশায় আকৃষ্ট হবেন না। তবে এ ক্ষেত্রে সব সার্ভিসের আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কোনোরূপ বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। একজন ভালো কর্মকর্তা হওয়ার জন্য মেধা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাহলেও দেশপ্রেমের ঘাটতিজনিত কারণে অনুরূপ মেধাবী দেশের জন্য মঙ্গলের পরিবর্তে অমঙ্গল ডেকে আনতে পারেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অনেক মেধাবী কর্মকর্তা দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়নে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। কাজেই সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুর তোলা বা সুর মেলানোর আগে বিষয়বস্তুর ভেতরে গিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে বক্তব্য রাখতে হবে। এ বক্তব্য যেমন ব্যক্তিবিশেষের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে, তেমনিভাবে সমাজের মধ্যে বিদ্যমান বহুবিধ সমস্যা নিয়ে তাদের ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণের আশায় জাতি প্রতীক্ষায় থাকবে।
মো. আনছার আলী খান : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

No comments:

Post a Comment