Sunday, January 15, 2017

আরেক পরিকল্পনাকারী রাজীব গান্ধী গ্রেফতার

নিউ জেএমবি’র আরেক মাস্টারমাইন্ড জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা এলাকা থেকে শুক্রবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়া হামলাসহ উত্তরাঞ্চলে সবক’টি হামলায় নেতৃত্ব দেয় গ্রেফতারকৃত এই রাজীব গান্ধী। একসময় জঙ্গি নেতাদের পাঁচক হিসেবে সংগঠনে নাম লেখালেও ধীরে ধীরে শীর্ষ জঙ্গি নেতায় পরিণত হয় রাজীব। প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ তাকে খুঁজছিল। এদিকে শনিবার বিকালে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করে রাজীব গান্ধীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর হুমায়ুন কবির। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম মাহমুদুল হাসান জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে মো. মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকের বলেন, এর আগে গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন। এবারই প্রথম কাউকে এই ঘটনায় জীবিত গ্রেফতার করা সম্ভব হলো। তিনি বলেন, অত্যন্ত ধূর্ত জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী নিজেকে কখনও সুভাষ ওরফে শান্ত, কখনও টাইগার ওরফে আদিল, ওরফে জাহিদ বলে ছদ্মনামে পরিচয় দিত।
তার কাছে থেকে আরও অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞসাবাদে ওই হামলার সঙ্গে জড়িত আরও দু’জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের ধরতে ইতিমধ্যেই সিটিটিসি অভিযান চালাচ্ছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, রংপুরে জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা, টাঙ্গাইলের দর্জি নিখিল হত্যা, পাবনার পুরোহিত নিত্যরঞ্জন পান্ডে হত্যা, রংপুরের মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা, কুষ্টিয়ায় হোমিও চিকিৎসক সানাউর হত্যা, পঞ্চগড়ে পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর হত্যা, দিনাজপুরের হোমিও চিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ হত্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাসহ ২২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী। এরই মধ্যে কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী হত্যা মামলায় রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন. গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে বিদেশীদের হত্যা করতে মো. খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধন ও মো. শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশকে নির্বাচিত করে জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধীই ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া গুলশান হামলার পর পুলিশের মনে ভয় সৃষ্টি করতে হামলা চালানোর নির্দেশনা দিয়েছিল রাজীব গান্ধী। কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় তার একটা ছবি পাওয়ার পর এবং তার নাম প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা ছেড়েছিল রাজীব গান্ধী। তিনি বলেন,
নিউ জেএমবির শীষ নেতা তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী সংগঠনটির উত্তরবঙ্গের সামরিক শাখার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল। এ ছাড়া তামিম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম মারজানের সঙ্গে গুলশান হামলার পরিকল্পনায় সে সরাসরি যুক্ত ছিল বলে পুলিশের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে মনিরুল ইসলাম জানান, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে চালানো জেএমবির বোমা হামলার অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল আওয়ালের বগুড়ার আস্তানায় রান্না-বান্নার কাজ করত রাজীব। সেখান থেকেই বড় নেতাদের ইশারায় সেও ধীরে ধীরে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়ে ও অভিযানে অংশ নিয়ে এই রাজীবও শীর্ষ জঙ্গিনেতাতে পরিণত হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০১১ সালে জেএমবি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। ওই সময় রিপন-মানিকের সঙ্গে রাজীব কাজ করত। ২০১৪ সালের পর নব্য জেএমবি গঠন হলে তামিম চৌধুরীর সঙ্গে যোগ দেয় রাজীব। নব্য জেএমবিতে তার অবস্থান ছিল তামিমের পরের সারিতে। এ ছাড়া সে ছিল উত্তরবঙ্গের নব্য জেএমবির সামরিক কমান্ডার এবং উত্তরবঙ্গে জেএমবি যেসব হামলা চালাত তা তার পরিকল্পনাতেই হতো। পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম আরো জানান, গুলশানের হলি আর্টিজান হামলায় জড়িত শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ ও খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধনকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে রাজীবই সম্পৃক্ত করে এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। এই দু’জনই পুলিশি অভিযানে নিহত হয়। এ ছাড়া শোলাকিয়ার হামলায় গ্রেফতার হওয়া শফিউলকেও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সে সম্পৃক্ত করে। পরে বন্দুকযুদ্ধে শফিউলও নিহত হয়। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা চালায় কয়েকজন বিপথগামী যুবক। ওই ঘটনায় দেশী-বিদেশী ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হন উচ্চপদস্থ দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে অবসান ঘটে রাতব্যাপী জিম্মি ঘটনার। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন। প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়,
গুলশান হামলার পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব। গুলশানে হামলা চালানোর আগে জঙ্গিরা ভাটারার আবাসিক এলাকার একটি বাসায় বসে হামলার পরিকল্পনার সময় সেখানে স্ত্রী-সন্তানসহ উপস্থিত ছিল রাজীব। হামলাকারীদের হলি আর্টিজানের উদ্দেশে পাঠিয়ে রাজীব স্ত্রী-সন্তানসহ মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় গিয়ে অবস্থান নেয়। গত বছর আজিমপুর থেকে গ্রেফতারকৃত তানভীর কাদেরির ছেলে তাহরিম কাদেরি তার জবানবন্দিতে রাজীবের নাম উল্লেখ করেছিল। এর আগে গুলশান হামলার ঘটনায় কল্যাণপুর থেকে রাকিবুল হাসান রিগ্যান ও হাসনাত করিমকে আটক করা হয়। রিগ্যান ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। রাজীবের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের পশ্চিম রাঘরপুর এলাকার ভূতমারী ঘাট এলাকায়। তার বাবার নাম মাওলানা ওসমান গণি মণ্ডল ও মা রাহেলা বেগম। শুভ নামে তার একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে সে এসএসসি পাস করেছে। শনিবার বিকালে রাজীব গান্ধীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আট দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

No comments:

Post a Comment