Tuesday, January 10, 2017

উজিরপুরে ডাক্তার-কর্মচারীর অপচিকিৎসায় প্রসূতির মরণ দশা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক আর তৃতীয় শ্রেণীর মহিলা কর্মচারী ও সেবিকার বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা করে সোনিয়া বেগম (৩০) নামে এক প্রসূতিকে প্রসবের ২৪ ঘন্টা পর মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর অসুস্থ্য প্রসূতি সোনিয়া বেগম উপজেলার সাকরাল এলাকার শহিদুল ইসলামের মেয়ে ও একই এলাকার মালয়েশিয়া প্রবাসী বিপ্লব রাঢ়ীর স্ত্রী। সোনিয়াকে মুমূর্ষু অবস্থায় উন্নত ও সু-চিকিৎসার জন্য বর্তমানে বরিশাল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা রয়েছে। প্রসূতির মা তানজিলা বেগম বলেন, গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি ও তার স্বামী সন্তানসম্ভবা মেয়েকে উজিরপুর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
সেখানে কোনো স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকা সত্ত্বেও জরুরি বিভাগে থাকা তৃতীয় শ্রেণীর মহিলা কর্মচারী দেবী রানী তার মেয়ে সোনিয়াকে ভর্তি করার পরামর্শ দেয়। তার পরামর্শে ডা. সৈব্যসাচী সানির মাধ্যমে মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করলে জরুরী বিভাগে থাকাবস্থায়ই মেয়ে প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করে। এ সময় হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় তাদের সাথে দেবী রানী ৫ হাজার টাকা চুক্তি করে নগদ ৩ হাজার ২শ’ টাকা নিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের কথা বলে সোনিয়াকে সন্তান প্রসব কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে কর্মচারী দেবী রানী তার সাথে বুলবুল রায় নামে একজন সেবিকাকে নিয়ে হাতুড়ে চিকিৎসার অস্ত্রোপচার করে। এতে একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেও প্রসূতির অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরের দিন ৭ জানুয়ারি অবস্থা আরও বেগতিক দেখে দেবী রানী প্রসূতির পিতা-মাতার কাছে চুক্তির বাকি টাকা চেয়ে না পাওয়ায় হাসপাতালের আরএমও ডা. সৈব্যসাচী সানির মাধ্যমে রাত সাড়ে ১০টার দিকে রোগীকে হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেয়। ওই রাতে কোনো উপায়ান্ত না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। পরে সংঙ্কটাপন্ন অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রসূতি মেয়েকে বরিশাল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। বরিশাল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে সোনিয়াকে চিকিৎসা দানকারী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তানিয়া আফরোজ জানান, অপচিকিৎসার ফলে প্রসূতি সোনিয়ার প্রস্রাবের থলি ছিড়ে যাওয়ার তার অবস্থা আশংকাজনক। প্রসূতি সোনিয়ার পিতা শহিদুল ইসলাম আরও অভিযোগ করে জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে কোন চিকিৎসক তার মেয়ের পর্যবেক্ষণ করেনি। এদিকে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অবেদনবিদ ছাড়াই হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রসূতিদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়। এ ঘটনার অনুসন্ধানে গতকাল সোমবার এই প্রতিবেদক হাসপাতালের অভিযুক্ত ওই তৃতীয় শ্রেণীর মহিলা কর্মচারী দেবী রানীর কাছে জানতে চাইলে তিনি পুরো বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি ওই রোগীর ডেলিভারির ব্যাপারে কিছুই জানি না।
পরে বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য হাসপাতালের ডেলীভারী রেজিস্ট্রার খুঁজে দেখা যায় ওই রোগীর ডেলিভারি সম্পাদনকারী হিসেবে ডা. সৈব্যসাচী সানি, অভিযুক্ত মহিলা কর্মচারী দেবী রানী ও সেবিকা বুলবুল রায়ের স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের সেবিকা ইনচার্জ হাওয়া বেগম জানান, দেবী রানী প্রায়ই নিয়ম বর্হিভূতভাবে এ ধরনের কাজ করে থাকেন। এদিকে ওই রোগীর পর্যবেক্ষণে থাকা হাসপাতালের আরএমও ডা. সৈব্যসাচী সানির ব্যবহৃত ০১৭১৭২১৩৮১৮ নাম্বারের মোবাইল ফোনটিতে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে রাজধানীতে অবস্থানরত উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্মকর্তা ডা. একেএম সামসুদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনা হাসপাতালে ঘটলে তার জন্য ডেলিভারি রেজিস্ট্রারে ওই রোগীর ডেলিভারি সম্পাদনকারীরাই দায়ী। তবে দেবী রানীর এ ধরনের কাজ করার কোনো বৈধতা নেই। সর্বশেষ এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রোগীর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে, প্রসূতি সোনিয়ার অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় বরিশাল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল থেকে তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment