Tuesday, January 31, 2017

প্রধানমন্ত্রীর কাছে পুলিশের আবদার

২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশ ওয়েলফেয়ার প্যারেডে উপস্থিত থাকার সময় পুলিশের পক্ষ থেকে তার কাছে দাবি করা হয় জেলহাজতে থাকার সময় বন্দিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন রদ করার জন্য (Daily Star, 24.01.2017)। এই দাবিকে প্রকৃতপক্ষে কোনো দাবি বলা চলে না। দুনিয়ার অনেক দেশে পুলিশ হাজতে বন্দি নির্যাতন করা হয়ে থাকে। কিন্তু তারা কোনো সময়েই সেটা স্বীকার করে না। তাছাড়া তারা যে নির্যাতন করে তা আইনসঙ্গত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানোর প্রশ্ন তো ওঠেই না।
উপরন্তু সে কাজ করলে যে কোনো দেশের জনগণ অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ও তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেলহাজতে পুলিশ কর্তৃক বন্দি নির্যাতন এবং একইভাবে সামরিক হেফাজতে বন্দি নির্যাতন খুব পরিচিত ও প্রচারিত ব্যাপার। কিন্তু এসবই তারা করতে চেষ্টা করে গোপনে এবং সেসব আইনসঙ্গত করার জন্য সরকারের কাছে তাদের দাবি জানানোর প্রশ্নই ওঠে না। কাজেই বাংলাদেশের পুলিশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে যে দাবি জানিয়েছে তাকে দাবির থেকে আবদার বলাই সঙ্গত। পুলিশের ধারণা, সরকারের খেদমত তারা যেভাবে ও যত বেপরোয়াভাবে করে যাচ্ছে তাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ধরনের দাবি জানানো যেতেই পারে! কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে দেশের শাসন কাজ চালাতে হয় এবং তিনি যতই গণবিরোধী কাজ করুন এ ব্যাপারে পুলিশের আবদার অনুযায়ী কাজ করা তার পক্ষে অসুবিধাজনক। কাজেই তিনি পুলিশের উপরোক্ত অনুষ্ঠানেই বলেছেন যে, সংসদ পুলিশ হাজতে আটক বন্দিদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে আইন করেছে, তা পরিবর্তন করার বিশেষ অবকাশ নেই (Daily Star, 24.01.2017)। এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি সব থেকে উল্লেখযোগ্য তা হল, বাংলাদেশ পুলিশ তাদের হেফাজতে থাকা বন্দিদের ওপর যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে থাকে তার প্রকাশ্য স্বীকৃতি! আমেরিকা, ভারত, চীন, রাশিয়াসহ দুনিয়ার ‘সভ্য’ দেশগুলোতে পুলিশ ও সামরিক হেফাজতে থাকা বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন ব্যাপকভাবে করা হয়ে থাকে। তবে কোনো সময়েই পুলিশ ও সামরিক বাহিনী তাদের এই অপকর্ম প্রকাশ্যে স্বীকার করে না। কিন্তু পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন রদ করার দাবি জানানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের এই অপকীর্তির কথা খুব স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছে।
এই ব্যতিক্রমের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশ পুলিশকে সরকার দেশের জনগণের ওপর নির্যাতনের জন্য যেভাবে অপ্রকাশ্য ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে, এর কোনো দৃষ্টান্ত অন্য কোনো দেশেই নেই। একমাত্র গুয়ান্তানামোর সামরিক নির্যাতন কেন্দ্র ছাড়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও নেই। বাংলাদেশের পুলিশ জনগণের বিরুদ্ধে বেপরোয়া নির্যাতন জেলের বাইরে প্রকাশ্যে যেভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তাতে জেলহাজতে এ নির্যাতন আরও নিষ্ঠুরভাবে চালিয়ে যাওয়াকে তারা এখন নিজেদের ‘অধিকার’ হিসেবে মনে করছে! দাবির সঙ্গে অধিকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পুলিশ হেফাজতে বিনা বিচারে বন্দিদের ওপর নির্যাতনকে তারা নিজেদের অধিকারভুক্ত ব্যাপার মনে করার কারণেই তারা এখন দাবি করছে নিরীহ ও নিরস্ত্র অবস্থায় জেলহাজতে বন্দিদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের অধিকার!! ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় The Torture and Custodial Death (Prevention) Act জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী সংবিধানের ৩৫(৫) ধারা অনুযায়ী এই বিল সংসদে পেশ করেন। সংবিধানের এই ধারায় বলা হয়, 'No person shall be subjected to torture or cruel, inhuman or degrading punishment or treatment'. পুলিশদের উপরোক্ত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ কর্তৃক বিলটি রদ করার দাবি প্রসঙ্গে বলেন, বিলটি জাতীয় সংসদে এমন একজনের দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছিল, যাকে বিএনপি আমলে জেলহাজতে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার পর তিনি বিলটি পার্লামেন্টে উপস্থিত করেন। তিনি বলেন, পার্লামেন্ট যে বিল পাস করেছিল সেটা খারিজ করা সঙ্গত হবে কিনা এটা তিনি জানেন না (Daily Star, 24.01.2017)। র‌্যাব হল পুলিশেরই সম্প্রসারিত হাত। এই বাহিনীটি তৈরি হয়েছিল বিএনপির শাসন আমলে। পুলিশ ও র‌্যাব যে হাত ধরাধরি করে জনগণের ওপর বেপরোয়া নির্যাতন চালিয়ে এসেছে এবং তাদের দ্বারা আটক অবস্থায় নিরস্ত্র লোকেরা যে তাদের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হয়ে এসেছেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেরই যে মৃত্যু হয়েছে এটা কোনো গোপন বা অজানা বিষয় নেই।
এ নিয়ে অনেক লেখালেখি এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দ্বারা তদন্ত হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়েছে। শুধু মানবাধিকার সংস্থাগুলোই নয়, বিভিন্ন সময় সংবাদপত্র রিপোর্টাররাও এ বিষয়ে তাদের রিপোর্ট দিয়েছেন, যা তাদের পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। দৈনিক যুগান্তর কর্তৃক প্রকাশিত এ ধরনের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের তৎকালীন হেডকোয়ার্টারটি রীতিমতো কসাইখানায় পরিণত হয়। সরকারের এক প্রভাবশালী নেতার জামাতা হওয়ায় ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ কাউকে পরোয়া করতেন না। তার ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে অন্যতম দুই সহযোগী মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব্যাহতিগ্রস্ত) এমএম রানাও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তাদের কাছে মানুষ খুন করা ছিল অনেকটা পাখি শিকারের মতো। তাই আলোচিত এ সাত খুন নয়, এর আগেও তারা কমপক্ষে ১১ ব্যক্তিকে প্রথমে গুম, পরে নৃশংসভাবে প্রায় একই কায়দায় খুন করে লাশ গায়েব করে দেয়। এমন লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে খোদ র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে’ (১৮.০১.২০১৭)। রিপোর্টটিতে আরও বলা হয়, এ সময় র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন এলাকা নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা জেলা এবং ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলাতেও একই ধরনের গুম-খুনের ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের সম্পৃক্ততার কথা। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা প্রসঙ্গে আরও বলা হয়, ‘র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তারেক সাঈদের নেতৃত্বে এ ব্যাটালিয়নে কর্মরত র‌্যাবের বেশিরভাগ কর্মকর্তা অস্ত্র, যানবাহন ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করতেন। ব্যক্তিস্বার্থে তারা অনেক সময় নিরপরাধ লোকজনকে ধরে আনতেন। তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন ছাড়াও গুম-খুনের মতো পথ বেছে নিতেন। কাউকে দিনের পর দিন ব্যাটালিয়নের গোপন কক্ষে বন্দি রাখা হতো।
সাধারণ মানুষের কাছে ওই ব্যাটালিয়ন ছিল একটি টর্চার সেল। অনেক সময় ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থ আদায় করা হতো। শুধু সরকারবিরোধী লোকজন নয়, তাদের হাত থেকে বাদ যাননি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারাও। মেজর আরিফ ও এমএম রানা যে দুটি ক্রাইম প্রিভেনশন ক্যাম্পের (সিপিসি) অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, সেখানেও গোপন টর্চার সেল তৈরি করা হয়’ (যুগান্তর, ১৮.০১.২০১৭)। এই পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে র‌্যাবের অধিনায়ক সম্মেলনে সদস্যদের উদ্দেশে কড়া সর্তকবার্তা দিয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। কাউকে ছাড় দেয়ারও প্রশ্ন আসে না।’ ‘কাউকে ছাড় দেয়ার প্রশ্ন আসে না’ এ কথা তিনি বললেও তারা যে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠা থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাবের উপরোক্ত অপরাধকে ছাড় দিয়ে এসেছেন এতে সন্দেহ নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতেই রাজারবাগে পুলিশের অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্তৃক তাদের হেফাজতে থাকা বন্দিদের ওপর পুলিশের অবাধ নির্যাতনের ‘অধিকার’ দাবি করা হয়েছে। এর থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় বাংলাদেশে পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থা নিজেরাই কীভাবে আইনশৃংখলার ঊর্ধ্বে থেকে নিরীহ জনগণের ওপর তাদের নিষ্ঠুর নির্যাতন, ক্রসফায়ার থেকে শুরু করে জেলহাজতে নির্যাতন ও হত্যা চালিয়ে দেশে তাদের রাজত্ব কায়েম করেছে।
৩০.০১.২০১৭
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

No comments:

Post a Comment