Wednesday, January 11, 2017

চব্বিশ ঘণ্টা পর ফের চালু জুয়ার আস্তানা

চব্বিশ ঘণ্টা পার না হতেই ফের রাজধানীর অভিজাত এলাকায় জুয়ার আসর খুলে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে যুগান্তরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে সব জুয়ার বোর্ড বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু মহলবিশেষের হস্তক্ষেপের কারণে তা বেশিক্ষণ কার্যকর থাকেনি। এ নিয়ে ভুক্তভোগী মহলসহ অনেকে ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। কেউ আবার বলছেন, জুয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তবে দায় যারই হোক না কেন, সবাই চান সুস্থ সমাজ বিকাশের স্বার্থে অবিলম্বে এ জুয়া খেলা বন্ধ হওয়া জরুরি। আর শেষ পর্যন্ত অভিজাত এলাকার এসব কোটি কোটি টাকার জুয়ার আসর বন্ধ না হলে সাধারণ জনগণের কাছে সরকার ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে ভিন্ন বার্তা যাবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি উচ্চ আদালত অভিজাত ক্লাবগুলোয় জুয়া বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এরপরও কেন সরকার এটা বন্ধ করতে পারছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’ জুয়া সমাজে নৈতিক অবক্ষয় তৈরি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা সৎভাবে অর্থ উপার্জন করেন তাদের পক্ষে জুয়ার বোর্ডে অর্থ ব্যয় করা খুবই কঠিন। যাদের আয় বিধিসম্মত হয় না, তারাই জুয়ার বোর্ডে এভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে পারেন। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিদেশেও একই অবস্থা দেখা যায়।’ জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিদেশী স্টাইলের জুয়ার বোর্ড চালু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি টাকার খেলা হয়।
যারা জুয়া খেলতে আসেন তারা এর প্রায় ৮০ ভাগ টাকা খুইয়ে বাড়ি ফেরেন। এ তথ্য শুনতে অনেকের কাছে অবাক মনে হলেও এটিই চরম বাস্তবতা। আর এভাবে বিভিন্ন ক্লাবে রাজসিক জুয়ার বোর্ড চালু থাকলে শুধু ক্লাবের হর্তাকর্তা নয়, লাভবান হন সমাজের অনেক প্রভাবশালী। এখান থেকে প্রতি রাতেই কোটি কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা হয়। সূত্র বলছে, মোটা অংকের এসব টাকার ভাগ চলে যায় একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাসহ আরও অনেকের পকেটে। আর কোনো কারণে একদিন জুয়া বন্ধ থাকলে ভাগাভাগিও বন্ধ থাকে। যে কারণে যুগান্তরে রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোয় সোমবার দুপুর থেকে জুয়ার কোর্ট বন্ধ করা হলেও তা ফের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই মঙ্গলবার দুপুরে চালু হয়ে যায়। নির্ভরযোগ্য সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এসব জুয়ার বোর্ড বন্ধ রাখতে চাইলেও তারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারেননি। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি মহলের চাপের মুখে তারা সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। অগত্যা আগের মতোই জম্পেশ জুয়ার আড্ডা চলছে গুলশান,
বনানী, বারিধারা ছাড়াও রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুলসহ আরও বেশ কয়েকটি এলাকায়। এদিকে জুয়ার বোর্ডগুলোর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকা যুবলীগ নেতা সম্রাট ও খালেদের বিষয়ে সরকারের শীর্ষপর্যায়কে অবহিত করেছে সরকারের বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। এ খবর জানার পর গুরু-শিষ্য হিসেবে পরিচিত এ দুই যুবলীগ নেতা ওপরমহলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার বাসায় মোটা অংকের উপঢৌকন নিয়ে হাজির হন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবলীগ নেতা জানান, যুগান্তরে এ দুই নেতার অপকর্ম প্রকাশিত হওয়ার পর দু’জনই ঘটনা ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। প্রভাবশালী মহলে তারা নানা দেনদরবার অব্যাহত রেখেছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর জুয়ার বোর্ড বন্ধ রাখার পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। শিগগির জুয়া বন্ধের জন্য বড় ধরনের অপারেশন চালানো হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের কোনো নেতার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে দ্বিধা করবে না পুলিশ। সূত্র জানায়, যুবলীগ নেতা সম্রাট ও খালেদ, সাইদ ওরফে সাইদ কমিশনার, সেন্টু, আলী ওরফে চাচা আলী, আজম ওরফে ডা. আজমসহ আরও বেশ কয়েকজন জুয়া গডফাদারের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকাটি ইতিমধ্যে র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবিসহ আরও কয়েকটি সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে পুলিশের এসব সংস্থা। এদিকে রাজধানীতে প্রকাশ্যেই রমরমা জুয়া বাণিজ্য চলতে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলছেন, দেশের আইন অনুযায়ী জুয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এই সর্বগ্রাসী জুয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে যুবসমাজের ওপর। বিশেষ করে অনেক ধনী পরিবারের সন্তানরাও বিপথগামী হচ্ছে। এতে সমাজের প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ অবস্থায় অবিলম্বে সব জুয়ার আস্তানা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটা সরকার নয়, আমি মনে করি- আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা। অনেক ক্ষেত্রে এসব জুয়ার কমিশনের একটি অংশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকের কাছে যায় বলেও অভিযোগ আছে। আমি মনে করি, জুয়া খেলা বন্ধের ব্যর্থতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। তারা তৎপর হলে এটা অবশ্যই বন্ধ করা সম্ভব। আদালত যেখানে খেলা বন্ধের পক্ষে রায় দিয়েছেন সেখানে আমরা কেন সমাজকে জুয়ামুক্ত রাখতে পারব না?’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান যুগান্তরকে বলেন, রাজনীতিবিদ,
সরকারি অসাধু আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ এক শ্রেণীর মানুষের কাছে প্রচুর কালো টাকা আছে। তারা এসব কালো টাকা খরচ করার জন্য জুয়া খেলে। কিন্তু তাদের পাশাপাশি সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর কিছু লোকও জুয়া খেলে। নিম্ন আয়ের এসব মানুষ স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে, ব্যবসা কিংবা বেতনের টাকা দিয়েও জুয়া খেলে। জুয়ায় লোকসান দিয়ে তারা চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, সম্প্রতি উচ্চ আদালত সাতটি ক্লাবে জুয়া-হাউজি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, শুধু পাড়া-মহল্লায় জুয়ার বোর্ড বন্ধ করলে হবে না, অভিজাত ক্লাবগুলোতে জুয়া খেলা আগে বন্ধ করতে হবে। ওপরের দিকে বন্ধ হলে নিচের দিকে এমনিতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তার মতে, জুয়া সামাজিক অবক্ষয় তৈরি করে। এটি অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। বিভিন্ন ক্লাবে জুয়া-হাউজি খেলা চলার দায় সরকার এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেন এই অপরাধ বিজ্ঞানী।

No comments:

Post a Comment