Saturday, January 28, 2017

সহজ স্বীকারোক্তি

পেশাগত জীবনের গোধূলি বেলায় এসে আজ যে কথা বলতে ইচ্ছে করছে, তা হল আমরা যে বাস্তবতার মধ্যে সুবিচারের জন্য সংগ্রাম করে চলছি তার চরিত্র বহুমাত্রিক। স্বীকার করতেই হচ্ছে, আইন পেশার দাবি মেটাতে যতটা সময় দেয়া ও সমর্পিত চিত্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল, আমার ক্ষেত্রে তার অভাব ছিল। তথাপি সুবিচারের জন্য সর্বদা আমি গভীরতম আকাক্সক্ষা ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা অনুভব করেছি। আইন পেশায় ৫০ বছর পার করার পর একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ এবং সেই সমাজে শান্তিতে বসবাস করার জন্য সুবিচারের প্রতি আমার বিশ্বাস ও অঙ্গীকার আরও সমুন্নত হয়েছে। বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের আঙিনায় ঘুরতে আমার ভালো লেগেছে, আমি উপভোগ করেছি এবং এখনও করছি। এটুকু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, অন্য কোনো পেশা আমাকে এতটা পরিতৃপ্ত করতে পারে না অথবা এতটা মহত্ত্ব ও নিঃস্বার্থপরতা দাবি করেনি, যতটা মানবাধিকারভিত্তিক আইন ব্যবসা পেরেছে।
এটা এক চ্যালেঞ্জ বটে। আমি বরাবর বলেছি, নিরপরাধ শব্দটির যদি কোনো অর্থ থেকে থাকে তবে জামিন পাওয়াটাকে ব্যক্তির অধিকার হিসেবে দেখতে হবে এবং জামিন পাওয়ার প্রশ্নে আমাদের শাসনতন্ত্রের মৌলিক অধিকারগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। যে বিচারপ্রার্থী স্বাধীনভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে না, বিনা বিচারে যাকে জেল খাটতে হয়, তার জন্য কোনো অধিকারই অধিকার নয়। বিচারের নামে অথবা বিচারের আগে কত লোককে চরম শাস্তির শিকার হতে হচ্ছে, তার হিসাব কেউ রাখছেন না। বিচার প্রক্রিয়া যতটা দ্রুত সম্ভব সম্পূর্ণ করার জন্য সবকিছু করতে হবে; কিন্তু এফআইআরকে কারাদণ্ডের নির্দেশ হিসেবে দেখা চলবে না। জামিনের বিষয়টিকে এক ধরনের পুলিশি বিচার হিসেবে দেখতে রাজি নই। সুবিচারের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্রেফতার, জামিন, পুলিশ রিমান্ডকেন্দ্রিক রমরমা বাণিজ্য। কোনো একটি অপরাধের অভিযোগ পেলেই জেলে পুরে রাখার সুযোগ থাকায় মিথ্যা মামলা করার ব্যাপারটি উৎসাহিত হচ্ছে। আমরা ভুলে থাকতে পারি না, পুলিশ স্বাধীন নয়, স্বাধীনভাবে কিছু করার ক্ষমতা নেই তাদের।
আজ আমি যা হয়েছি এবং যে অবস্থানে এসেছি তার পেছনে আমার ভাগ্য ও পরম করুণাময় আল্লাহর অনুগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জনগণের জন্য কিছু করতে হলে চাই ব্যক্তিগত সততা ও সাহস। এ শিক্ষা আমি আমার বাবার জীবন থেকে লাভ করেছি। আইন পেশা যতই ব্যক্তিক হোক না কেন, এটা কিন্তু চূড়ান্তভাবে উন্নতমানের জনসেবা। সততা, সৎ সাহস এবং একাগ্রতা এ পেশার জন্য অপরিহার্য। আমরা একটা মামলা জেতার জন্যই প্রাণপণ লড়ি; কিন্তু কখনও তা ন্যায়বিচারের বিনিময়ে নয়। আমরা তখনই বেশি উৎফুল্ল হই যখন দুর্বল এবং অসহায় মক্কেলকে সুবিচার পেতে সাহায্য করতে সক্ষম হই। আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম এ কারণে, আইনজীবী হিসেবে তৈরি হওয়ার সময়টাতে আমি দুর্লভ সুযোগ লাভ করেছিলাম ড. কামাল হোসেন, হায়দার মুটা এবং সবশেষে সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের মতো বিজ্ঞ আইনজীবীর জুনিয়র হিসেবে কাজ করার। তারা সবাই ছিলেন আইন পেশার উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, বিচারিক প্রক্রিয়ায় যারা সততা ও উৎকর্ষের সেরা স্বাক্ষর রেখেছিলেন। অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে তারা আমাকে আইন পেশার নীতি-নৈতিকতা, সৌন্দর্য ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিলেন। আমার স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় আবেগাপ্লুত এ মুহূর্তে আমি বিনম্র এবং সকৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছি সেসব প্রবাদপ্রতিম প্রধান বিচারপতিকে যাদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি এসএম মুর্শেদ, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, বিচারপতি মুস্তাফা কামাল, বিচারপতি এটিম আফজাল, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী এবং বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী। আমরা আমাদের সময়ে তাদের পেয়েছিলাম, এটা আমাদের বিরাট সৌভাগ্যই বলতে হবে। তারা সবাই আমাদের স্মৃতিতে তাদের পাণ্ডিত্য, ধৈর্য, প্রশান্ত চিত্ততা, সাহস এবং সুরুচির জন্য চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংকটকালে কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তাদের সুবিচার নিশ্চিত করতে হয়েছিল।
সাহসী কাজের মাধ্যমেই তারা আমাদের জন্য শক্তিশালী বিচারব্যবস্থার এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। এটা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার ছিল, তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তথাপি আমাদের মধ্যকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক পেশাগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনও সমস্যা সৃষ্টি করেনি। পরিস্থিতি এখন আর সেরকম নেই, বিচারপতি এবং আইনজীবীদের মধ্যকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা এবং আবেদন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমার বিশ্বাস, আদালতের কক্ষে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করার সময় আমরা আইন ও বিচার সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করি, তার চেয়ে বেশি শেখার সুযোগ রয়েছে বিচারপতি-আইনজীবীর মধ্যে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে। এটা বলা হয় এবং কথাটা সত্য- জ্ঞান, অনুশীলন ও দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে আইনজীবীরা হলেন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশ। মামলায় জেতার জন্য আমরা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করি; কিন্তু হার-জিত যাই হোক, কেউ কারও বিরুদ্ধে তিক্ত শত্রুতা পোষণ করি না। আমাদের মধ্যকার সৌভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক অটুট থাকে। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা প্রশাসনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, গণতন্ত্রকে সংযত করার জন্য শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। তিনি নরায়াণগঞ্জের নৃশংস সাত খুনের মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সুপ্রিমকোর্ট এ ভূমিকা রেখেছে যাতে বিচারিক প্রক্রিয়া কোনোভাবে বিপথগামী না হতে পারে। এটা গণতন্ত্রের জন্য যথেষ্ট উজ্জীবক; বিশেষ করে যেখানে গণতন্ত্রের অনুশীলনে অনেক ঘাটতি রয়েছে। জনসেবার লক্ষ্য থেকে রাজনীতি যখন বিচ্যুত হয়, তখন রাজনীতি গণতন্ত্র থেকেও বিচ্যুত হয়।
কিন্তু সুশৃংখল আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা যে এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর গুটিকয়েক সদস্যকে ভাড়াটে অপরাধীর ভূমিকায় চরম নৃশংসতার জন্য দণ্ডদান করে প্রদত্ত একটি রায়ে তেমন কিছু আসবে-যাবে না। অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার চেয়ে নিরীহ লোকজনকে রক্ষা করতে পারলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। এ সত্য অস্বীকার করা যায় না, মাত্রাতিরিক্ত পুলিশি ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশে নির্দোষ মানুষের মধ্যে মিথ্যা মামলার ভীতি ও অসহায়ত্ব বেড়েই চলেছে। গ্রেফতার হলেই হল। জেল-জুলুম, পুলিশ রিমান্ডের নির্যাতন সবই চলতে পারে। অপরদিকে প্রকৃত অপরাধীদের রয়েছে টাকার জোর এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা। অনায়াসে জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ নিয়ে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার চরম অপব্যবহার চলছে। আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনেকেই বিদেশী টাকায় কথা বলে। তাই ধরি মাছ না ছুঁই পানি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা কাজ করে। এজন্যই নির্দোষ লোকদের ওপর মিথ্যা মামলার অবিচার অনেক বেশি চলছে। জামিন না পেলে বিনা বিচারে আটকদের মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর জেল খাটতে হচ্ছে। তারা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগও তো পাচ্ছে না। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়ে একাকী জিজ্ঞাসাবাদের বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার। এ সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, পুলিশ রিমান্ডে নির্যাতন করার প্রশ্নে কোর্টের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার জন্য আইন পাসের। জনগণের এ ধরনের দাবি পুলিশের জন্য লজ্জাজনক না হয়ে পারে না। তাই মনঃকষ্টে ভাবি আমাদের কী হল। নির্যাতন চালানো সম্পূর্ণভাবে শাসনতন্ত্রের পরিপন্থী চিন্তাভাবনা। তাহলে কি আমাদের সুশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তারা শাসনতন্ত্র লংঘনের অধিকার চাইছেন? শাসনতন্ত্রের ৩৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না, কিংবা তার সঙ্গে নিষ্ঠুর অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর ব্যবহার করা যাবে না।
পুলিশ হেফাজতে নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর অত্যাচার করা হবে বা অমানুষিক ব্যবহার করা হবে- এটা পেশাগত পুলিশের আচরণ হতে পারে না। আইনজীবীরা নেতৃত্বদানকারী অবস্থান অস্বীকার করায় দেশ আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেখানেই আমরা থাকি না কেন, আমরা আমাদের পেশার মাহাত্ম্য এবং শিক্ষার প্রতি অবিশ্বস্ত হতে পারি না। অগণতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতি আইনজীবীদের শোভা পায় না। আমাদের অবশ্যই ভুলে যাওয়া উচিত নয়, আইনজীবী হিসেবে আমরা একে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো কিংবদন্তিতুল্য আইনজীবীদের পরবর্তী প্রজন্ম এবং উত্তরসূরি। তারা আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত; কারণ তারা আমাদের নেতৃত্ব ও মর্যাদার পথ দেখিয়েছেন। তারা সহজ জীবন বেছে নেননি। আমি আমাদের উজ্জ্বল ও উঠতি তরুণ আইনজীবীদের এ কথাও মনে করিয়ে দেব, আপনাদের দায়বদ্ধতা শুধু আইনের প্রতি নয়, বরং তার চেয়ে অনেক ব্যাপক। সবার প্রতি সমভাবে ন্যায়বিচার করার স্বার্থে আইনের শাসনের অস্তিত্বের রক্ষাকবচের দিকে দৃষ্টি রাখা আমাদের দায়িত্ব। যেটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তা হল, শাসনতন্ত্র ও আইনভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের দুর্বল ভূমিকা থাকায় প্রশাসনের সুবিধাভোগী বিশেষ শ্রেণীগুলো সংঘবদ্ধ হয়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। অগণতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতির সঙ্গে রাজনীতি করতে গিয়ে আমরা আইনজীবী হিসেবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ বলিষ্ঠ ভূমিকা রক্ষা করতে না পারায় জনগণের ওপর শাসনতন্ত্রপরিপন্থী শাসন চাপিয়ে দিতে অসুবিধা হচ্ছে না। শাসনতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা না থাকায় বিচার বিভাগও শক্তি পাচ্ছে না। তবে এ ধরনের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার উচ্ছৃংখল আচরণে দেশে নৈরাজ্যই সৃষ্টি হয়। সুশাসন নিশ্চিত হয় না।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন: আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
barmainulhosein@gmail.com

No comments:

Post a Comment