Sunday, January 1, 2017

নতুন বছরের অঙ্গীকার হোক সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা : ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

যুগান্তর : আমরা যদি ২০১৬ সালে আমাদের অর্থনীতির সাফল্য বা ইতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে জানতে চাই- আপনার উত্তর কী হবে?
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : সাফল্য তো অনেক আছে। তবে আমি বলব, বড় সাফল্য হচ্ছে- আমাদের প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নধারার গতিশীলতা আমরা মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। ২০১৬ সালে আমরা নিুমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। সার্বিক অর্থে আমাদের উন্নয়নের যে যাত্রা- এটা সন্তোষজনক। বলা যেতে পারে, এটা মডেল কেস অব ডেভেলপমেন্ট। এটা অবশ্যই একটা দৃষ্টান্ত- বাংলাদেশের মতো একটা দেশে, ছোট্ট একটা ভূখণ্ডে এত মানুষ বসবাস করার পরও তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছে। আরেকটা বড় বিষয়, প্রবৃদ্ধি যে ৬ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সরকার বলছে এটা ৭-এর কাছাকাছি বা বেশি। বিষয়টিকে আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সোপান বলতে চাই।
যুগান্তর : ব্যর্থতাগুলো?
সা. আ. : ব্যর্থতার কথা উঠলে প্রথমেই সুশাসনের অভাবের কথা বলা যেতে পারে। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নেই সত্য, কিন্তু অনিশ্চয়তাটা এখনও রয়ে গেছে। মূলত গত নির্বাচনের পর থেকে যে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে, ২০১৬ সালের শেষদিন পর্যন্ত তা বজায় ছিল। দেশের মানুষ জানে না আসলে কী হবে, না হবে। এটা অবশ্যই এক ধরনের অনিশ্চয়তা। অনিশ্চয়তা থাকলে যা হয়- দেশের সার্বিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। আমাদের এখানেও তা-ই হয়েছে। এ ছাড়া জাজ্বল্যমান ব্যর্থতা হল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যেসব কেলেংকারি হয়েছে- হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্র“প ইত্যাদির ব্যাপারে তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল, সেটা হয়নি। এখানে তদন্তের ব্যর্থতা বা অন্য কোনো কারণ নিহিত রয়েছে কিনা, দ্রুত উদ্ঘাটন করে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
যুগান্তর : এগুলোর সঙ্গে তো বেসিক ব্যাংকও যোগ হয়েছে?
সা. আ. : হ্যাঁ, বেসিক ব্যাংক, তারপর রূপালী ব্যাংক ইত্যাদি যোগ হয়েছে। একটার পর একটা প্রতিষ্ঠানে এসব ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। আগে প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলো মোটামুটি সুশৃংখল ছিল। আমি আমার সময় বলে বলছি না- ২০০৯ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তখনও তো লোকজন একই অবস্থায় ছিল। এখন অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। দিস ইজ নট আ গুড সাইন।
যুগান্তর : খেলাপি ঋণের পরিমাণও তো দিন দিন বেড়েই চলেছে!
সা. আ. : হ্যাঁ। এর মানে হচ্ছে, আপনি স্বীকার করুন আর নাই করুন- আর্থিক খাতে যে বিশৃংখলা বা দুর্নীতি জেঁকে বসেছে, এটা তারই নমুনা। আমাদের মনে রাখা উচিত, আর্থিক খাতে যদি অনিয়ম ও দুর্নীতি বজায় থাকে, তাহলে আমাদের উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবেই।
যুগান্তর : সড়ক-বন্দর-বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো অবকাঠামোগুলোর যে উন্নয়ন প্রত্যাশিত ছিল, গত এক বছরে তার অনেকটাই পূরণ হয়েছে। এটা যথেষ্ট মনে করেন কি?
সা. আ. : হ্যাঁ, কিছু কিছু প্রত্যাশা অবশ্যই পূরণ হয়েছে। তবে আমি মনে করি, আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল। কতগুলো মেগা প্রজেক্ট- পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ইত্যাদির মধ্যে পদ্মা সেতুতে সবচেয়ে ভালো অগ্রগতি হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়া হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে এখনও সমস্যাসংকুল। তারপরও আমি বলব সড়ক অপেক্ষাকৃত ভালো। তবে রেলওয়ের অবস্থা খুব খারাপ।
যুগান্তর : সমুদ্রবন্দর?
সা. আ. : বন্দরের যে খুব উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। বন্দরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা এসেছে। হরতাল বা অন্য কোনো উপদ্রব নেই। কিন্তু বন্দরের কারিগরি উন্নতি যতটা প্রসার লাভ করা উচিত ছিল, তা হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরে যদিওবা কিছুটা হয়েছে, মংলা বন্দর এখনও অবহেলিত।
যুগান্তর : বিদ্যুৎ ও গ্যাস?
সা. আ. : বিদ্যুৎ খাত সন্তোষজনক। তবে বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। প্রায়ই এ ক্ষেত্রে ঝামেলা হচ্ছে। আর গ্যাসের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে- গ্যাস এখন আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলতে গেলে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতিই হয়নি। এটা শুধু ২০১৬ সালের চিত্র নয়। অনেক আগে থেকেই এ সমস্যা বিরাজ করছে। গ্যাস শুধু আমরা কনজিউম করছি। এর এক্সিস্টিং কূপগুলো সার্ভিসিং করার ব্যাপারটায় কোনো মনোযোগ দেয়া হয়নি। আমরা আমাদের গাড়ি মাঝে মধ্যে সার্ভিসিং করি, বাড়িতেও চুনকামের প্রয়োজন পড়ে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, গ্যাস খাতে সার্ভিসিংয়ের কোনো বালাই নেই। তাছাড়া নতুন গ্যাসফিল্ড আবিষ্কারের বিষয় রয়েছে, যেখানে প্রাপ্তির ঘর প্রায় শূন্য। আমরা সমুদ্রসীমার বিশাল একটা অংশ পেয়েছি, কিন্তু সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম মোটেই সন্তোষজনক নয়। অন্যদিকে আপনি মিয়ানমারের দিকে তাকান। মিয়ানমারের মতো দেশও এ ক্ষেত্রে ভালো করেছে। ভারতও ভালো করছে। শুধু আমরাই পিছিয়ে আছি।
যুগান্তর : অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন এবং আর্থিক খাতে শৃংখলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। ২০১৬ সালে এসব শর্তের কতটা পূরণ হয়েছে?
সা. আ. : আমি বলব, এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেকগুলো নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। মাঝখানে আবার যোগ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্রে কে দোষী, কে নির্দোষ, এর সঙ্গে কারা জড়িত; এসবের চাইতেও বড় বিষয় হল- বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিদেশীরা এখন ভাববে, এই হচ্ছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থা! সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হল- ফলোআপ যা হয়েছে, তা মোটেও যথেষ্ট নয়। আর্থিক খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা একটি বড় বিষয়। এগুলো না থাকলে যে কোনো প্রজেক্ট, যে কোনো কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না, যেনতেনভাবে অনেকটা দায়সারাভাবে শেষ করা হয়। দ্বিতীয় হল, সময় ও খরচ বেড়ে যায়। তৃতীয়, কোয়ালিটি রক্ষা করা যায় না। আপনি রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখুন; নির্মাণের কিছুদিন পরই সেগুলো ভেঙে যাচ্ছে। চতুর্থ, দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। মাঝখান থেকে কিছু লোক শুধু অর্থ উপার্জন করে। এতে দিন দিন সমাজে বৈষম্য বেড়েই চলেছে।
যুগান্তর : এডিপি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যে ধীরগতি বিদ্যমান, ২০১৬ সালেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন আনতে হলে কী করতে হবে?
সা. আ. : আপনি ঠিকই বলেছেন- ২০১৬ সালে এডিপি বাস্তবায়নের হার খুবই নগণ্য। পদ্মা সেতু বাদ দিলে অন্যগুলোর চিত্র খুবই হতাশাজনক। এডিপি ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমত প্রজেক্ট প্রণয়নের সময় খেয়াল রাখতে হবে কোন কোন প্রকল্প অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। কেবল সেগুলোই গ্রহণ করা উচিত। একেবারে যত্রতত্র, ছোটখাটো প্রকল্প নিয়ে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে কিন্তু বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না- এভাবে বোঝা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। কাজেই প্রকল্পের সংখ্যা কমানো উচিত। এতে সুবিধা হবে, ভালো প্রজেক্ট ডিরেক্টর পাওয়া যাবে এবং ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এখন এই যে ঢালাওভাবে প্রজেক্ট নেয়া হচ্ছে- এত প্রজেক্ট ডিরেক্টর আপনি কোথায় পাবেন? তাই প্রকল্পের সংখ্যা অবশ্যই কমানো উচিত। এতে সুবিধা হবে, আপনি ভালো প্রজেক্ট ডিরেক্টর পাবেন এবং ভালোভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন। আগে থেকে যারা বিভিন্ন প্রজেক্ট করছে, তাদের মোবিলাইজেশন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া অর্থাৎ প্রাথমিক কাজগুলো আগেই করা উচিত। এখন কী হচ্ছে? প্রজেক্ট অ্যাপ্রুভালের পর প্রজেক্ট ডিরেক্টর খোঁজা হয়, পরিকল্পনাসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রতি নজর দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রজেক্ট মনিটরিং। এখন আইএমওডি মনিটরিং করে। কিন্তু আইএমওডির তেমন লোকবল নেই। তারা মূলত ফিন্যান্সিয়াল দিকটা দেখে, অর্থাৎ টাকাটা খরচ হয়েছে কিনা? কিন্তু টাকা খরচই তো একমাত্র বিষয় নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হল কোয়ালিটি। টাকা খরচের পাশাপাশি কাজের মান বজায় থাকছে কিনা, সেটা দেখাও জরুরি।
যুগান্তর : ২০১৬ সাল রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল থাকার পরও বিনিয়োগের বন্ধ দরজা খোলেনি। ২০১৭ সালে এ দ্বার উন্মোচিত হওয়ার ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?
সা. আ. : কিছু কিছু কাজ করলে ডেফিনেটলি বিনিয়োগ বাড়বে। এখন বিনিয়োগ একেবারে স্থবির। ২০১৫ সালেও একই চিত্র ছিল। আসলে বিনিয়োগের জন্য একটা ক্লাইমেট দরকার। একটা আবহ দরকার। এর একটা হল রাজনৈতিক- সেটা তো আছেই। এটা ছাড়াও রেগুলেটরি বডি ও সংস্থা যেগুলো আছে, তাদের ভেতর যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা- এ কারণে ব্যবসায়ীদের প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয় এবং কাজগুলো সহজে হয় না। শুধু তাই নয়, এ জন্য তাদের আরও অনেক কিছু করতে হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই খরচ বেড়ে যায়। পাশাপাশি সময়ও বেশি লাগে। ব্যবসায়ীরা এসব পছন্দ করেন না। এরপর আছে পলিসির ধারাবাহিকতা রক্ষার সমস্যা। বিদ্যমান পলিসির আলোকে একজন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা যেসব পদক্ষেপ নেবেন, তা কতদিন বজায় থাকবে- এটা নিয়ে তাদের মনে সংশয় কাজ করে। সরকারের এক মন্ত্রী আজ হয়তো এক রকম কথা বলছেন, পরদিন অন্য একজন মন্ত্রী ভিন্ন কথা বলছেন! কারও মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। একজন একটা বললে অন্যজন তা শোনেন না। কোনো সরকার ক্ষমতাসীন থাকতেই যদি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এ ধরনের অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে হয়, সরকারের পরিবর্তন ঘটলে তো আরও বিপদ! মানুষ তখন আরও ভয় পাবে, নতুন সরকার যদি এসব পলিসির মধ্যে পরিবর্তন আনে, তাহলে তো সব গেল! কাজেই পলিসির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা বা তা অক্ষুণ্ণ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দেখুন, দিন দিন কেমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বলতে আমি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন- ব্যাংক, বীমা, বাজার ব্যবস্থা ইত্যাদি বোঝাচ্ছি। এগুলোর মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।
যুগান্তর : গত ছয় বছর ধরে পিপিপিতে টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু খরচ হচ্ছে না; যা ২০১৬ সালেও অব্যাহত ছিল। ২০১৭ সালে আমরা যদি এ চিত্র প্রত্যক্ষ করতে না চাই, তাহলে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে?
সা. আ. : প্রথম কাজ হচ্ছে, প্রাইভেট সেক্টরকে কনভিন্সড করতে হবে। এ জন্য সরকার ও প্রাইভেট সেক্টরের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। দেখা গেল, সরকার হঠাৎ পলিসি পরিবর্তন করে ফেলল। যেমন- প্রাইজিং পলিসি। প্রকল্পের শুরুতে যে টাকার অংক দেখানো হল, কোনো কারণে কাজ শুরু হতে দেরি হলে খরচ বেড়ে যেতে পারে। তখন সরকার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বরং যদি বলে, প্রাইজ কমাও- তাহলে তো হবে না। ট্যাক্স পলিসির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এরপর গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জমির জন্য বিওআই-এর কাছে যেতে হবে। এখানে জমি রেজিস্ট্রেশন একটি বড় ব্যাপার। রাস্তাঘাটের অবস্থাও মাথায় রাখতে হবে। এসবের ক্ষেত্রে এখনও কিন্তু তেমন স্পেসিফিক কোনো পলিসি নেই। একমাত্র সাভার ও চট্টগ্রামে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনগুলো ঠিকমতো কাজ করছে। কিন্তু অন্যগুলোর কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এগুলো ভবিষ্যতে বিসিক শিল্পনগরীর রূপ ধারণ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
যুগান্তর : তার মানে শিল্প এলাকার মাঠে গরু-ছাগল চরছে- এ রকম একটা অবস্থা?
সা. আ. : হ্যাঁ। দেশের অনেক স্থানে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছে এবং সেগুলো ভালো ভালো জায়গায় আছে। কিন্তু অধিকাংশ শিল্পনগরীর মাঠে এখন গরু-ছাগল চরছে। জায়গা ভালো হলে কী হবে- কোনো সাপোর্ট নেই, তাই কেউ যায় না ওখানে। এখন বিডা (বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) হয়েছে। ওরা যদি এগিয়ে আসে, তাহলে একটা কিছু হতে পারে। ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে যে অরাজকতা চলছে, পিপিপির ক্ষেত্রে বড় বড় প্রজেক্টে ব্যাংক-টু-ব্যাংক লেনদেনের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে বিদেশী ব্যাংকের ওপরও পুরোপুরি নির্ভর করা ঠিক হবে না। ওরা আমাদের বিষয়গুলো হ্যান্ডেল করবে, এটা ঠিক না। পিপিপিতে বড় আকারের প্রজেক্ট থাকায় প্রচুর টাকা প্রয়োজন হয়। ব্যাংক থেকে বড় আকারের ঋণ নেয়ার বিষয়টি মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। এ জন্য মূলত আমাদের পুঁজিবাজার সুসংহত করা দরকার। কিন্তু সে রকম কোনো লক্ষণ তো দেখছি না আমরা।
যুগান্তর : দেশের ব্যাংকিং খাত, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোয় দুর্নীতির বিস্তার ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। ২০১৭ সালে আমরা যদি ব্যাংকিং খাতকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে চাই, তাহলে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে?
সা. আ. : প্রথম কথা হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। কারণ ব্যাংকিং কার্যক্রম হচ্ছে সম্পূর্ণ টেকনিক্যাল, অত্যন্ত প্রফেশনাল একটি বিষয়। এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকলে কারও পক্ষে সঠিকভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত. রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের একক কর্তৃত্ব থাকতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফিন্যান্স ডিভিশনের ক্লিয়ারেন্স নিয়ে সবকিছু করতে হবে, আমার মতে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টে যেসব রেগুলেশন আছে, তা খুব কঠোরভাবে পরিপালন করতে হবে। যেমন- নিয়ম রয়েছে কোনো ব্যাংকে একজন পরিচালক ৬ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। এখন ৬ বছরের বেশি সময় থাকার জন্য দাবি তোলা হচ্ছে, এটা অযৌক্তিক। ব্যাংকগুলোয় পরিচালকদের আত্মীয়স্বজনরা বসে আছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। মূল কথা হচ্ছে, ব্যাংকগুলোয় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান আরও শক্ত ও কঠোর হতে হবে। আমি বলছি না, অতিমাত্রায় কন্ট্রোল করতে হবে। ওভার রেগুলেশন ইজ ব্যাড। একটা ব্যালেন্স থাকতে হবে। কোনো কিছু যেমন অতিমাত্রায় করা যাবে না, আবার একেবারে ছেড়ে দেয়াও ঠিক হবে না। সর্বশেষ হল, কেউ অনিয়ম করলে তাকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে- যাতে মানুষ বুঝতে পারে, অনিয়ম করায় তার বিচার ও শাস্তি হয়েছে।
যুগান্তর : তার মানে বিচার ও শাস্তির বিষয়টি দৃশ্যমান হতে হবে?
উত্তর : হ্যাঁ, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয়- দু’দিক থেকেই। কারও বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলে, গুরুতর অপরাধ বা অনিয়ম করার পর শাস্তি হিসেবে কারও চাকরি চলে গেলে সে অন্য জায়গায় নতুন চাকরি জোগাড় করতে পারবে। কাজেই এটা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নয়। তাকে যদি বিচারের আওতায় এনে তার প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ বিচার ও শাস্তির পুরো প্রক্রিয়াটা দৃশ্যমান হতে হবে।
যুগান্তর : ২০১৬ সালে মূল্যস্ফীতি মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে ছিল। ২০১৭ সালে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে?
সা. আ. : আমাদের প্রধান খাদ্য উপাদান হল চাল। এর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা যদি নিশ্চিত করা যায়- অবশ্য জাতীয় কোনো দুর্যোগের সম্মুখীন হলে সেটা অন্য ব্যাপার- সাধারণভাবে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে সম্ভব হবে বলেই মনে হয়। তবে মূল্যস্ফীতি রোধ করতে গিয়ে কৃষকদের যাতে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা না হয়, সেদিকটায় খেয়াল রাখা জরুরি। এ তো গেল একটা দিক। অন্যদিকে নন-ফুড সেক্টরে দেখা যাচ্ছে, অনেক কিছু সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। বাড়িভাড়া বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। গ্যাসের দাম ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়গুলো ভেবে দেখা উচিত, নিু ও নিু-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ যাতে এগুলো অ্যাফোর্ড করতে পারে।
যুগান্তর : ২০১৬ সালে শেয়ারবাজারের যে চিত্র, তা সুখকর নয়। ২০১৭ সালের এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে করণীয় কী?
সা. আ. : প্রথম কাজ হল, দেশের শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা। যারা বিভিন্ন অনিয়ম করছে এবং অতীতে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে মানুষ ভাববে, শেয়ারবাজার যদি পুনরায় ম্যানিপুলেশনের শিকার হয়, ক্রিমিনালদের কিছুই হবে না। দ্বিতীয়ত. এখনও কিছু অনিয়ম হচ্ছে, ওভারপ্রাইজিং হচ্ছে, নন-অথরিটি সাইডে শেয়ারিং চলছে। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মোদ্দাকথা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে অত্যন্ত দক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অন্যদিকে যেসব এক্সচেঞ্জ হাউস আছে, তাদেরও সুশাসন ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এখানে হয়তো আবারও ম্যানিপুলেট হবে, ইনসাইডার ট্রেডিং হবে এবং মানুষ আস্থা হারাবে।
যুগান্তর : দেশের বাজেট ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল, যা ২০১৬ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। আগামী বাজেটে এর গুণগত পরিবর্তন চাইলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি?
সা. আ. : সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মোটামুটি ইতিবাচক। যেমন কিছু কিছু ক্ষেত্রে কর আদায় হচ্ছে। তবে এর পরিমাণ খুবই কম। বাংলাদেশে ট্যাক্স-জিডিপির হার অনেক দেশ, এমনকি নেপালের চেয়েও কম। আমি মূলত জোর দিতে চাই প্রত্যক্ষ করের ওপর, পরোক্ষ করের ওপর নয়। প্রত্যক্ষ কর আদায় ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যারা ট্যাক্স-নেটের আওতায় রয়েছে, তাদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করা এবং যারা নেই, তাদের ট্যাক্স-নেটের অন্তর্ভুক্ত করা। পরোক্ষ করের ব্যাপারে সরকার যে চাপ দিচ্ছে- আমি মনে করি, এটা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রথমত. আদায় প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে। কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়। দ্বিতীয়ত. অহেতুক যেখানে-সেখানে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা বাড়ানো উচিত। যেমন দেখা যাচ্ছে, জমিজমার ক্ষেত্রে সরকার দিনের পর দিন ট্যাক্সের হার বাড়িয়েই চলেছে। অথচ যাদের ট্যাক্স দেয়ার কথা, তারা ট্যাক্স দিচ্ছে না। আরেকটি কথা, এনবিআরের আরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। আমাদের এখানে একই অবস্থানে থেকে কাউকে বেশি ট্যাক্স দিতে হচ্ছে, আবার কাউকে কম দিতে হচ্ছে। এটা যেন না হয়। বিদেশে এ রকম ঘটে না। বিদেশে তো পরস্পরের সঙ্গে দেখাই হয় না। মানুষ ই-মেইলে রিটার্ন পাঠিয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষ সেটা অ্যাসেস করে কর প্রদানকারীর কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। আমাদের এখানে ব্যক্তিগতভাবে দেখা না করলে ঝামেলা হয়।
যুগান্তর : তদবিরসহ আরও অনেক কিছু করতে হয়?
সা. আ. : হ্যাঁ। রেভিনিউ কালেকশনের ক্ষেত্রে অনেকেই বাইরে রয়ে গেছে। ঢাকা শহরের বাইরে মফস্বলে অনেক বড় ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা ট্যাক্সের আওতায় নেই। তাদের ট্যাক্সের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি রেভিনিউ এক্সপেনডিচারের দিকেও নজর দিতে হবে। আমাদের রেভিনিউর বিশাল একটা অংশ ব্যয় হয় নন-ডেভেলপমেন্ট খাতে, অর্থাৎ বেতন-ভাতা খাতে। শিক্ষা খাতে আমরা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের কথা বলি। কিন্তু ওখানেও বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় বেশি হয়। শিক্ষা উপকরণ খাতে, ছাত্রদের বসার ব্যবস্থা, স্কুল লাইব্রেরি, ল্যাব ইত্যাদি খাতে কম খরচ হয়। আমার মনে হয়, সামাজিক খাতে যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ইত্যাদির ক্ষেত্রে একটু বেশি ব্যয় করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষের উপকার হয়।
যুগান্তর : কর ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে ২০১৬ সালে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেগুলো কি যথেষ্ট? না হলে আগামী অর্থবছরে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার?
সা. আ. : প্রথমত. ভ্যাট কালেকশনটা র‌্যাশনালাইজ করা উচিত। যারা ভ্যাটের আওতায় নেই, তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনেক দোকানে ভ্যাট আদায় ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। যারা ভ্যাট দিচ্ছেন, তারাও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। দ্বিতীয়ত. যেসব কর্মকর্তা ভ্যাট আদায়ের সঙ্গে যুক্ত, তারা যেন দুর্নীতিতে জড়িয়ে না পড়েন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা, লোকজন যেন ট্যাক্স দেয়ার ক্ষেত্রে একটু স্বস্তি অনুভব করে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ট্যাক্স-নেটটা আরেকটু সম্প্রসারিত করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের পুরো ট্যাক্স ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড করা উচিত। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে কিছু কিছু কাজ অবশ্য শুরু হয়েছে। এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
যুগান্তর : লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলে আগামী অর্থবছরে সরকারি ব্যয় নির্বাহ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা দেখা দেবে?
সা. আ. : এ ক্ষেত্রে একটা ব্যবস্থা হল, ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ঋণ নেয়া। সরকার ইচ্ছে করলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। তবে আমি মনে করি, সেটা উচিত হবে না। কারণ ব্যাংক থেকে মোটামুটি উচ্চসুদে ঋণ নিতে হয়। সত্যি সত্যি বাজেট ঘাটতি হলে সরকারের উচিত হবে, যেসব প্রকল্প অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, প্রথমে সেগুলোর দিকে নজর দেয়া। সেগুলোর অ্যালোকেশন ও বাস্তবায়ন দ্রুত করা। যেমন- যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভৌত অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি। কিছু কিছু প্রজেক্ট আছে, যেগুলোর বাস্তবায়ন না হলেও তেমন ক্ষতির আশংকা নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল, এই যে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, দুই বছরের প্রজেক্ট শেষ করতে চার বছর লাগছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা কমানো গেলে, সন্দেহ নেই, সরকারের খরচও অনেক কমে যাবে।
যুগান্তর : ২০১৬ সালে সরকার দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে অনেকটা সফলতার পরিচয় দিয়েছে। আগামী বছর তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করেন?
সা. আ. : আমাদের সৌভাগ্য, গত কয়েক বছর আমরা বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মন্দার সম্মুখীন হইনি। উৎপাদনও ভালো হয়েছে। এ ছাড়া যেসব পণ্য আমরা আমদানি করি, আন্তর্জাতিক বাজারে সেগুলোর দামও কম ছিল, বিশেষ করে পেট্রোলিয়ামজাতীয় পণ্য, ভেজিটেবল অয়েল ইত্যাদি। তবে যদি হঠাৎ করে পেট্রলের দাম বেড়ে যায়, ভেজিটেবল অয়েল বা অন্যান্য আমদানি পণ্যের দামও বেড়ে যায়, তখন কিন্তু আমাদের ডিমান্ড ম্যানেজমেন্ট বা চাহিদার দিকে নজর দিতে হবে। মার্কেটিং চ্যানেলটাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। সাধারণত কোনো জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে থাকে চাঁদাবাজি, মিডল ম্যান ইত্যাদি। দিনাজপুর থেকে কোনো পণ্য ঢাকায় আসার পর তার দাম পাঁচ গুণ বেশি হয়ে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে অতটা হওয়ার কথা নয়। হ্যাঁ, পরিবহন, হ্যান্ডলিং ও প্যাকেজিং ব্যয় ইত্যাদি অবশ্যই যোগ হবে, কিন্তু তারপরও দাম এত বেশি হওয়ার কথা নয়।
যুগান্তর : ভালো-মন্দ মিলিয়ে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প খাত ২০১৬ সালে যথেষ্ট গতিশীল ও সাফল্যমণ্ডিত ছিল। ২০১৭ সালে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে?
সা. আ. : প্রথম চ্যালেঞ্জটা হল, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে আমাদের কমপ্লায়েন্সগুলো আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। আমাদের সামনে হয়তো চীন থাকবে না, কিন্তু ভারত থাকবে; কম্বোডিয়া থাকবে। ওদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। এ জন্য আমাদের উচিত শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো। পাশাপাশি শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে পারলে এখন ৫ জন শ্রমিক যে কাজ করে, তখন সে কাজ ৩ জন শ্রমিক করতে পারবে। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা ও দক্ষতা অনেক কম। এ জন্য তুলনামূলকভাবে আমাদের বেশি শ্রমিক নিয়োগ করতে হয় এবং এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মজুরিও কম হয়। আর একটা কথা, আমাদের এখন শুধু আরএমজির ওপর নির্ভর করলে চলবে না; অন্যান্য রফতানি খাতের দিকেও নজর দিতে হবে। এখন মোটামুটি চামড়াটা চলে এসেছে। সিরামিক তো আছেই। কিছু কিছু লাইট ইন্ডাসট্রিজ আছে। বাইসাইকেল তৈরি হচ্ছে। টায়ার তৈরি হচ্ছে। সিমেন্ট তৈরি হচ্ছে। এগুলোর দিকে আমাদের আরেকটু নজর দেয়া উচিত।
যুগান্তর : সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সভরিন বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ভালো-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে বলুন।
সা. আ. : এটার পজিটিভ দিক হচ্ছে, প্রচুর রেমিটেন্স অলস পড়ে আছে, সরকার যদি এটা বিভিন্ন প্রজেক্টে ব্যবহার করতে পারে, তবে বাইরে থেকে ঋণ নিতে হবে না। অতিরিক্ত রিজার্ভ আর অতিরিক্ত তারল্য একই জিনিস। তবে এ ধরনের বন্ডের ক্ষেত্রে কতগুলো সাবধানতা অবলস্বন করা উচিত। এটা দীর্ঘ মেয়াদের জন্য নিয়ে রাখা ঠিক হবে না। এই রিজার্ভটা কিন্তু সরকারের না। এটা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। ধরুন, সরকার পাঁচ বছরের জন্য এটা নিল। পরে যদি আবার রিনিউ করতে চায়, তাহলেই বিপদ। সরকার রিটার্নটা ঠিকমতো দিতে পারবে কিনা, রেট অব রিটার্ন কী হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি এবং এটা অবশ্যই ফরেন এক্সচেঞ্জে দিতে হবে, টাকায় দিলে হবে না। আরেকটা বিষয় হল, সরকার কোথা থেকে আয় করবে? ব্রিজ থেকে যদি করে, সেটা যথেষ্ট কিনা, এক্সচেঞ্জ যদি লাস্ট মার্জিনে না হয়, যেমন এখন প্রতি ডলার ৮০ টাকা আছে, এটা ৯০ টাকা হয়ে গেলে প্রকৃত এক্সচেঞ্জের হার অনেক বেশি হবে। প্রশ্ন হল, সরকার তখন ওই রেটে তার পাওনা পরিশোধ করবে কিনা? সবচেয়ে বড় বিষয় হল, যেহেতু দেশের টাকা; বাইরে থেকে আনছি না, কেউ শর্তও দিচ্ছে না, বাংলাদেশ ব্যাংকও কোনো শর্ত দিতে পারবে না- এ রকম শর্তহীন অবস্থায় পাওয়া টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে অপচয়ের একটা আশংকা থেকেই যায়।
যুগান্তর : খেয়ালখুশি মতো ব্যয় হবে?
সা. আ. : হতেও পারে। বাইরের টাকা হলে, যেমন বিশ্বব্যাংকের টাকা হলে তারা বলে এটা করো, ওটা করো, তাদের সুদ পরিশোধের বিষয়েও একটা চাপ থাকে। কিন্তু সভরিন বন্ডের ক্ষেত্রে তো সে রকম কিছু হবে না। কাজেই অপচয় ও বাহুল্য খরচ যেন না হয়, সেদিকে শক্ত নজরদারি প্রয়োজন।
যুগান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ২০১৬ সালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত?
সা. আ. : প্রথমত. যারা রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত, তাদের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আর যেসব প্রক্রিয়ায় গলদ ছিল, বিশেষ করে সাইবার সিকিউরিটির ব্যাপারে নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে কিন্তু কমার্শিয়াল ব্যাংকও যুক্ত। কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোরও যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। সেগুলোও ঠিকঠাক করতে হবে। দ্বিতীয়ত. আমাদের কিন্তু প্রযুক্তি নেই। যেসব মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ইনসেনটিভ দেয়ার বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। প্রযুক্তি খারাপ মানুষের হাতে পড়লে সেটা খারাপভাবে ব্যবহার হবে এবং তার ফলও খারাপ হবে। এ জন্য আমাদের হিউম্যান রিসোর্সও উন্নত করা উচিত। আর টেকনোলজি কিন্তু ক্রমাগত চেঞ্জ হচ্ছে, সেদিকেও আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লেনদেনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় সম্পৃক্ত। সব কাজের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুইফটের কথা বলা যেতে পারে। ফান্ড ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গেও বিশ্বস্ত ও কার্যকর যোগসূত্র গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, একই সঙ্গে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যংক ও কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
যুগান্তর : আমাদের এত সম্ভাবনা- এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাধা কোথায়?
সা. আ. : বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রাজনীতির চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগণের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান। এতে দিনে দিনে কেবল সমস্যার পাহাড় জমছে, কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয়, আইনের শাসন আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
যুগান্তর : সরকার দিন বদলের কথা বলছে। সত্যিকার অর্থে দিন বদলের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?
সা. আ. : দিন বদলের জন্য আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় উদ্যোগ যেটা নেয়া দরকার, তা হল- সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। এটা শুধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে নয়। আমাদের অর্থনৈতিক বিষয়গুলো এখনও একটু একপেশে অবস্থায় আছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তি রোধ করতে হবে। সাধারণভাবে কারও মধ্যে মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। এটা সব যুগে, সব দেশেই ছিল। কিন্তু মতাদর্শের ভিত্তিতে কে কোন কাজ পাবে, কে কোন চাকরি পাবে- তা নির্ধারিত হওয়া একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত. দিনবদলের জন্য প্রয়োজন দুর্নীতি দূর করা এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে, তরুণদের নিয়ে আসা। তরুণদের নিয়ে আসার একমাত্র উপায় হল, পুরো গভর্নেন্সকে স্বচ্ছ করা। পুরো বিষয়টাকে যদি জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়, তাহলে চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মেধাবী তরুণদের প্রবেশগম্যতা সহজ হবে। সত্যিকারভাবে দিনবদলের জন্য আরও একটা কাজ করা দরকার। আমাদের সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণী কিন্তু উন্নয়নের সুফলটা পাচ্ছে না। সুফলের বেশিরভাগ চলে যাচ্ছে ওপরের শ্রেণীর লোকজনের কাছে। এটা যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
যুগান্তর : তার মানে, আপনি সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন?
সা. আ. : হ্যাঁ। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেরও লক্ষ্য ছিল- রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি। অর্থনৈতিক মুক্তি মানে সমতা, যেটা পশ্চিম পাকিস্তানে আমরা পেতাম না। তারা আমাদের কিছুই দিত না। সব বেনিফিট ওরাই নিয়ে নিত। এ জন্য আমি সব সময় বলি, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটোই পাশাপাশি চলতে হবে। আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন, আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন- তাহলে কিন্তু স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমি আশা করব, নতুন বছরে আমাদের অঙ্গীকার হবে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
সা. আ. : ধন্যবাদ।

No comments:

Post a Comment