ব্যাংক
ঋণের সুদহার না কমায় বিনিয়োগ বাড়ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খুবই কম হচ্ছে। কারণ উচ্চ সুদ ও
গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে নতুন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। ঋণের উচ্চ
সুদহার ছাড়াও ব্যাংক সেক্টরজুড়ে চলছে সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থপাচার। আবার
সুষ্ঠু বিচারও হচ্ছে না। বিনিয়োগ না বাড়ার এটিও কারণ। শনিবার রাজধানীর ইস্ট
ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ সমিতি আয়োজিত ‘আগামী
দিনের অর্থনীতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব
কথা বলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক
গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি
বদরুল মুনিরের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য দেন পল্লী কর্মসহায়ক
ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ইস্ট ওয়েস্ট
ইউনিভার্সিটির ভিসি এমএম শহীদুল হাসান, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক
ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।
অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জামান বলেন, প্রযুক্তিতে অনেক উন্নতি হয়েছে। কিছু
ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে
হবে।
অতিদরিদ্র্য মানুষগুলো এখনও বৈষম্যের শিকার। তাদের দিকে নজর দিতে হবে।
সবক্ষেত্রে সুন্দর আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। সে কারণে সফল হতে
পারছি না। তাই আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সব
জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। তা না হলে জঙ্গিবাদ ছড়াবে। জঙ্গিবাদ শুধু
মাদ্রাসায় নয়, সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের
অর্থনীতিতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। আবার রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জও। কিন্তু
অনেকে অগ্রগতির কথা স্বীকার করতে চান না। চলমান অর্থনীতিতে সমস্যা থাকবেই।
পাশাপাশি সম্ভাবনাও থাকবে। কেউ কেউ শুধু সমস্যা আর দুর্নীতির কথা বলেন,
সম্ভাবনার কথা বলতে চান না। তিনি বলেন, দুর্নীতি হচ্ছে না, তা বলব না।
দুর্নীতি কমাতে পারলে বছরে এক শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে। কিন্তু অনেকে
শুধু দুর্নীতি প্রমাণের চেষ্টা করছেন। এটা ঠিক নয়, দুর্নীতি পৃথিবীর সব
দেশে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের
কর-জিডিপি এবং বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কাক্সিক্ষত হারে বাড়াতে অর্থপাচার ও
দুর্নীতি কমাতে হবে। সেইসঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং
দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় আরও বেশি জোর দিতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল সিভিল সার্ভিস কমিশনের সদস্য এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন,
গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুয়ার খুলে গেছে। বিগত
ছয় বছরে গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে সামষ্টিক আয়ের
অনুপাতে বিনিয়োগ তেমন বাড়ছে না। সরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে মোট বিনিয়োগের
এক-পঞ্চমাংশ, যা অবকাঠামো সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ করে বেসরকারি খাতের
চার-পঞ্চমাংশ বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করে। হতাশার কথা হল, বর্তমান সময়ে
সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তেমন উৎসাহ নেই। ড.
ফরাসউদ্দিন বলেন, দেশে শিল্পায়নের গতি বাড়াতে হবে এবং তা বহুবিধভাবে বাড়াতে
হবে। ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্প
প্রসারে পরামর্শ, অত্যন্ত সহজ শর্তে ঋণদান, বিপণন সহায়তা এবং নবায়নযোগ্য
শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত
বর্তমানে শূন্য দশমিক ১১ থেকে অন্তত শূন্য দশমিক ১৭ এবং বিনিয়োগ-জিডিপি
বর্তমানের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে প্রধান বাধা মূলধন
পাচার ও দুর্নীতি।
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের বর্তমান
পরিধি বাহাত্তরের তুলনায় ১৭৪ গুণ বেড়েছে। জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়া
সত্ত্বেও মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৮২ গুণ। দেশের সামষ্টিক জাতীয় আয়ে রফতানি
খাতের ২৩ শতাংশ অবদান। এটাকে আরও বহুমুখীকরণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন,
বাংলাদেশ কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সুযোগে বার্ষিক সামষ্টিক আয় ২০২০
সাল নাগাদ ১০ ভাগ এবং মানবসম্পদ সূচকে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ধাপে
ওঠার পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি।
কেননা স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো উন্নয়নই সম্ভবপর হবে না। ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী
বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবুজ অর্থায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক
কর্মকাণ্ডে জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে
গেছে। বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসা করার খরচ কমিয়ে আনতে হবে। ঋণে সুদহার কমিয়ে
আনতে হবে। তৌফিক আহমেদ আরও বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাংকনির্ভর
অর্থায়নকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োজন। দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় খাতের
ব্যাংকগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তেমন থাকে না। এখানে অর্থ
মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
ক্ষমতায় দ্বৈততা রয়েছে।

No comments:
Post a Comment