Saturday, January 7, 2017

সবার বাবা স্কুলে আসে আমার বাবা আসে না

‘সবার বাবা স্কুলে আসে; কিন্তু আমার বাবা আসে না। আমাকে কেউ চকলেট-আইসক্রিম কিনে দেয় না। আমিও বন্ধুদের মতো বাবাকে দেখতে চাই।’ মর্মস্পর্শী কথাগুলো বলেছে ৫ বছরের শিশু ঋদি। সে মাতুয়াইল আদর্শ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এবার প্লে গ্রুপ থেকে নার্সারিতে উঠেছে। ঋদি শুক্রবার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এসেছে তার বাবা গুম হওয়ার প্রতিবাদ জানাতে।
গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোকে নিয়ে এ সমাবেশের আয়োজন করে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় জোট। এ সময় ৫ বছরের ঋদি তার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানায়। ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফকিহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম, কবি হাসান ফকিহ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলামের মা হাজেরা বেগম, নয়াগণতান্ত্রিক মোর্চার সভাপতি জাফর হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার মো. শাহীনুরের ভাই মেহেদী হাসান, রামপুরায় ক্রসফায়ারে নিহত কায়সার মাহমুদ বাপ্পীর বোন শামসুন্নাহার, বংশালে গুমের শিকার ছাত্রদল নেতা সোহেলের বাবা শামসুর রহমানসহ অনেকে। এ সময় স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্নায় শোকাবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। হাজেরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আপনাদের কাছে আর কিছু চাই না, আমার ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলেকে কোথাও পাই না। কত জায়গায় গেছি, কতজনের কাছে ধরনা দিয়েছি; কিন্তু আমার ছেলের খোঁজ কেউ দেয় না।’ তিনি ছেলের সন্ধান পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সমাবেশস্থলে ঋদির মা ফারজানা আক্তার জানান, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তার স্বামী ৭১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হোসেনসহ ৪ জনকে শাহবাগ থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে ধরে নেয়া হয়। তখন তিনি গর্ববতী ছিলেন। পরে তার একটি ছেলে হয়েছে। ছেলেটির বয়স আড়াই বছর। তিনি এখন বাবার বাড়িতে থাকেন। জানেন না তার দুই সন্তানের বাবা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন। তিনি স্বামীর সন্ধান চান। শাহীনুরের ভাই মেহেদী হাসান বলেন, তার ভাইয়ের নামে দেশের কোনো থানায় মামলা তো দূরে থাক, একটি সাধারণ ডায়েরিও ছিল না। তারপরও র‌্যাব সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তার ভাইকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। ভাইয়ের হত্যার বিচার চেয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে মামলা করেছেন।
মামলার রায় দেয়ায় দুই ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটকে বিচারিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন। হাইকোর্টে শুনানির তালিকায় তার রিট আবেদনটি এলেও বারবার সেটি রহস্যজনক কারণে পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। মেহেদী হাসান প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো ভাই হারানোর যন্ত্রণা জানেন। আপনি কেন কিছু অসৎ র‌্যাব কর্মকর্তার পক্ষ নিয়ে আমাদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছেন। আমার ভাইকে আর ফেরত পাব না। কিন্তু ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার পেলে তার আত্মা কিছুটা শান্তি পাবে।’ সমাবেশে কায়সার মাহমুদ বাপ্পীর বোন বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তে আমার ভাই বাপ্পীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তিনি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার দাবি জানান।’ সমাবেশে অন্য বক্তারা বলেন, দেশে আইন আছে, বিচার ব্যবস্থা আছে। অথচ আমাদের নাগরিকরা হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের মর্গে, হাসপাতালে, জেলখানায়, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয়- কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন তাদের স্বজন অপেক্ষায় থাকে কখন ফিরবে তার স্বজন। কিন্তু তাদের কোনো হদিস মিলছে না। দেশের একজন নাগরিকও যাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের শিকার না হয়- এ দাবি জানান তারা।

No comments:

Post a Comment