ইন্টারনেট
ব্যবহার করে যে অপরাধ করা হয় তাকেই ‘সাইবার ক্রাইম’ বলা হয়। উন্নত বিশ্বে
সাইবার অপরাধকে অপরাধের তালিকায় ইতোমধ্যেই শীর্ষে স্থান দেয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত কয়েকটি সাইবার ক্রাইম হল- সাইবার পর্নোগ্রাফি,
হ্যাকিং, স্প্যাম, অ্যাকশান গেম ইত্যাদি। বিশ্বের সীমানা পেরিয়ে
বাংলাদেশেও এখন সাইবার ক্রাইম সংঘটিত হতে শুরু হয়েছে। সাইবার অপরাধ
প্রতিরোধে দেশের সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তথ্যপ্রযুক্তি
মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), র্যাপিড
অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নতুন
ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম টিম সাইবার
নিরাপত্তায় বিভিন্নভাবে কাজ করছে। তারপরও অপরাধীরা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে
নানা ধরনের অপরাধ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনদিন আমাদের প্রযুক্তিনির্ভরতা
বাড়ছে। সেই সঙ্গে সাইবার অপরাধ সংঘটিত হওয়ারও প্রবণতা বাড়ছে।
কোন কোন অপরাধ সাইবার ক্রাইম
০১. ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামোকে সরাসরি আক্রমণ।
০২. ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যত্যয় ঘটানো। এ দুই অংশে সাইবার অপরাধও ঘটতে পারে। একটি ভাইরাস আক্রমণ এবং অন্যটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইট হ্যাকিং।
০৩. মেলওয়্যার স্পামিং বা জাঙ্ক মেইল; এটি সম্পূর্ণই মেইলভিত্তিক। ভুয়া আইডি বা ই-মেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নাম-ঠিকানা, ক্রেডিট কার্ড নাম্বার এমনকি ফোন নাম্বার নিয়ে মিষ্টি কথায় ভোলাতে চেষ্টা করবে অপরাধী চক্র। ফাঁদে পা দিলেই বিপদ! স্প্যাম ফোল্ডারে এমন মেইল প্রায়ই আসে।
০৪. সাইবার হয়রানি। ই-মেইল, ব্লগ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে হুমকি দেয়া, ব্যক্তির নামে মিথ্যাচার বা অপপ্রচার, নারী অবমাননা, যৌন হয়রানি।
০৫. ফিশিং। লগইন বা অ্যাকসেস তথ্যচুরি, বিশেষত ই-কমার্স, ই-ব্যাংকিং সাইটগুলো ফিশারিদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে।
০৬. অর্থ আত্মসাৎ। ইন্টারনেট থেকে তথ্যচুরি করে ব্যাংকের এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর একটি উদাহরণ।
০৭. সাইবার মাদক ব্যবসা। আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে ইদানীং ইন্টারনেট ব্যবহার করে মাদক ব্যবসার প্রবণতা বেড়েছে।
০৮. পাইরেসি। সদ্য প্রকাশিত গান ও সিনেমার এমপিথ্রি বা মুভি ফাইল ইন্টারনেটে শেয়ার হয়ে যাচ্ছে।
০৯. ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। ব্লগ ও ওয়েবসাইট থেকে কোনো লেখা ও ফটোগ্রাফি সহজেই কপি-পেস্ট করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে সাইবার কমিউনিটিতে।
১০. পর্নোগ্রাফি। শিশু পর্নোগ্রাফি ইন্টারনেটে ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে।
১১. ব্যক্তিগত তথ্য, পরিচয়, ছবি চুরি ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার বেড়েছে।
১২. হ্যাকিং। বাংলাদেশেও ওয়েবসাইট হ্যাকিং ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
১৩. ক্র্যাকিং। ক্র্যাকিং হল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিংবা ক্রেডিট কার্ড নাম্বার চুরি করে গোপনে অনলাইন ব্যাংক থেকে ডলার চুরি করা।
কম্পিউটার ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে বাংলাদেশ
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার প্রযুক্তি নিরাপত্তা পণ্য উৎপাদন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির বার্ষিক দ্বিতীয় প্রান্তিকের গবেষণা রিপোর্টে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কম্পিউটার ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এক নম্বরে চলে আসে। এর আগে ২০১৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় ভিয়েতনাম শীর্ষে ছিল। ওই রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যবহৃত কম্পিউটারের মধ্যে ৬০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ২০ ধরনের বিপজ্জনক ভাইরাস আক্রান্ত। এছাড়া বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৭৫ শতাংশই তাদের ব্যবহৃত কম্পিউটারে ভাইরাস আক্রমণ নিয়ে চিন্তিত নন।’ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘তাদের এই প্রবণতা বিপজ্জনক। বিশেষ করে যেখানে বিপজ্জনক ম্যালওয়ার ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তথ্য, এমনকি অনলাইন ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য ম্যালওয়ারের মাধ্যমে চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের পুরো অনলাইন এবং মোবাইল ব্যাংকিং খাতই সংকটে পড়তে পারে।’
সরকারি সাইট হ্যাক ও ডোমেইনে নিরাপত্তা ত্রুটি
দুর্বল নিরাপত্তার কারণে দেশের সরকারি সাইট হ্যাকের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ জানুয়ারি সরকারের ‘প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট’ (পিআইডি) পুরনো ওয়েবসাটের হোম পেজে প্রদর্শিত হয়েছে ভারতের অভিনেত্রী ও সাবেক পর্নো তারকা সানি লিওনের ছবি। এই ছবি কয়েকদিন ধরে সাইটে ঝুলে ছিল। এছাড়া গত বছরে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কয়েক দফায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাকের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিটিসিএল-এর ওয়েবসাইটসহ চারটি ওয়েবসাইট এ বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হ্যাক হওয়ায় আলোচনায় উঠে এসেছে বিটিসিএলের নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে। দ্বাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞানের ছাত্র সায়জার রহমান নিরাপত্তার ত্রুটি কাজে লাগিয়ে পরিবর্তন করে দেয় চারটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন নেইম। ডটবিডি ডোমেইনের চারটি ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়। সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বাংলাদেশী ওয়েবসাইট গুগল ডটকম ডটবিডিসহ বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ করা যায়নি। সায়জার রহমান গুগল ডটকমডটবিডি, রবি ডটকমডটবিডি, বাংলালিংক ডটকমডটবিডি ও ইত্তেফাক ডটকমডটবিডি সাইটের নেম সার্ভারের ঠিকানা পরিবর্তন করে দিয়েছিল। সায়জার ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করে বলেছেন, এভাবে হাজার হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া সম্ভব। কারণ বাংলাদেশের ওয়েবসাইটগুলো অনেক পুরনো ও নিরাপত্তা ত্রুটি রয়েছে। যদিও হ্যাক হওয়া সাইটগুলো দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছে। বিটিসিএল’র ত্রুটির কারণে যদি বাংলাদেশের সব সরকারি দফতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, বিভিন্ন পত্রিকা বা ই-কমার্স সাইটগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখন কী ঘটতে পারে তা চিন্তা করে দেখার অনুরোধ জানিয়ে সে আরও লিখেছে, কেন জানি উদাসীনতার ফলে কোন নিরাপত্তাজনিত চিন্তা-ভাবনা তাদের মাথায় কাজ করে না, এমনকি কয়েক দফা ফোন করে দিলেও না!
সাইবার পর্নোগ্রাফি
অনলাইন পর্নোগ্রাফি বা সেলফোন পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে এখন কম-বেশি সবাই জানেন। বিশেষ করে উঠতি বয়সের কিশোর, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যায়নরত ছাত্রছাত্রীদের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক। বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসায়ে যে সাইটগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি তার কয়েকটি যেমন পাইরেটেড বই, চলচ্চিত্র সংবলিত, নানা ধরনের পর্নোসাইট। পর্নো সাইটগুলো বন্ধে সরকার একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে এখনও চলছে সাইবার পর্নোগ্রাফি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামে এক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, পর্নো ছবির দর্শকদের ৭৭ শতাংশ শিশু। স্কুল শিক্ষার্থীরা ভিডিও মোবাইলে, সাইবার ক্যাফেতে বাসায় ইন্টারনেটে পর্নো ছবি দেখে থাকে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান ইন্টারনেটের তথ্য ভাণ্ডারের প্রায় ২৫ ভাগই পর্নোগ্রাফি। বর্তমানে ইন্টারনেটে মোট ২০,৫২,০৩,২০০টি ওয়েবসাইটের মধ্যে ৫১,০০০০০০ (পাঁচ কোটি দক্ষ) পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট রয়েছে। শিশুদের নিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবির ওয়েবসাইট রয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি। ১০ লাখের বেশি শিশুর ছবি রয়েছে এসব সাইটে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এক গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে সামাজিক যোগাযোগের নামে তরুণদের নানা অপরাধের চিত্র ফুটে উঠেছে। তাতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট মাইস্পেস তরুণ সদস্যদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এসব তরুণ মাইস্পেস ব্যবহারকারীর বেশিইভাগই অনিরাপদ যৌন কিংবা মাদকাসক্তের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করছে।
স্প্যাম মেসেজ
স্প্যাম ফিল্টার ছাড়া একজন ই-মেইল ব্যবহারকারী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০টি স্প্যাম মেসেজ পেয়ে থাকেন। ২০০৯ সালে বিখ্যাত এন্টিভাইরাস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাকঅ্যাফির এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণাটির জন্য ম্যাকঅ্যাফি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবককে এক মাস স্প্যাম ফিল্টার ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বলা হয়। দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণকারী সর্বোচ্চ মোট ২৩ হাজার ২৩৩টি স্প্যাম মেইল আসে। এবং ব্রাজিলের অংশগ্রহণকারীর কম্পিউটারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮৫৬টি ইমেইল আসে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা ১১ হাজার ৯৬৫টি স্প্যাম ইমেইল পান। এ সময় সবচেয়ে কম স্প্যাম আসে জার্মানির প্রতিনিধির কম্পিউটারে। তবে এ সংখ্যাও ২ হাজার ৩৩১টি। গবেষণাটির ফলাফল এটাই ইঙ্গিত করে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটে স্প্যাম আক্রমণের সংখ্যা তো কমেইনি বরং আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। গবেষণাকালে স্প্যামগুলোর ধরন ও সংখ্যা অংশগ্রহণকারীদের অবাক করে দিয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বেশিভাগ সময়ই অখ্যাত নাইজেরিয়া স্প্যাম মেইল দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ধরনের মেইলে নাইজেরিয়া থেকেই ইন্টারনেট ব্যহারকারীকে জানান হয়, নাইজেরিয়ায় কেউ একজন উইল করে তার নামে বিপুল অংকের অর্থ রেখে গেছেন। আর এ অর্থ পেতে স্বভাবতই তার আর্থিক লেনদেনের গোপন তথ্য জানাতে বলা হয়। আর অর্থের লোভে অনেক সহজ-সরল ব্যক্তি এ ফাঁদে পা দিয়েও থাকেন। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে মোট স্প্যাম মেইলের ৮ শতাংশই মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে নানা ছলনায় ব্যবহারকারীর বিশ্বাস জিতে তার বিভিন্ন গোপন তথ্য যেমন- পাসওয়ার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত, ইউজার নেম, পিন ইত্যাদি হাতিয়ে নেয়া। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের মতো আর্থিক বিষয়গুলোর স্প্যাম মেইলগুলোর আক্রমণের মূল লক্ষ্য বলে চিহ্নিত। ম্যাক অ্যাফির পরিচালক বলেন, এ গবেষণার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে বর্তমানে স্প্যামগুলো অতিমাত্রায় উদ্দেশ্যমূলক এবং ইতোমধ্যেই সাইবার অপরাধের সঙ্গে তাদের একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয়ে গেছে।
কোন কোন অপরাধ সাইবার ক্রাইম
০১. ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামোকে সরাসরি আক্রমণ।
০২. ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যত্যয় ঘটানো। এ দুই অংশে সাইবার অপরাধও ঘটতে পারে। একটি ভাইরাস আক্রমণ এবং অন্যটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইট হ্যাকিং।
০৩. মেলওয়্যার স্পামিং বা জাঙ্ক মেইল; এটি সম্পূর্ণই মেইলভিত্তিক। ভুয়া আইডি বা ই-মেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নাম-ঠিকানা, ক্রেডিট কার্ড নাম্বার এমনকি ফোন নাম্বার নিয়ে মিষ্টি কথায় ভোলাতে চেষ্টা করবে অপরাধী চক্র। ফাঁদে পা দিলেই বিপদ! স্প্যাম ফোল্ডারে এমন মেইল প্রায়ই আসে।
০৪. সাইবার হয়রানি। ই-মেইল, ব্লগ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে হুমকি দেয়া, ব্যক্তির নামে মিথ্যাচার বা অপপ্রচার, নারী অবমাননা, যৌন হয়রানি।
০৫. ফিশিং। লগইন বা অ্যাকসেস তথ্যচুরি, বিশেষত ই-কমার্স, ই-ব্যাংকিং সাইটগুলো ফিশারিদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে।
০৬. অর্থ আত্মসাৎ। ইন্টারনেট থেকে তথ্যচুরি করে ব্যাংকের এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর একটি উদাহরণ।
০৭. সাইবার মাদক ব্যবসা। আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে ইদানীং ইন্টারনেট ব্যবহার করে মাদক ব্যবসার প্রবণতা বেড়েছে।
০৮. পাইরেসি। সদ্য প্রকাশিত গান ও সিনেমার এমপিথ্রি বা মুভি ফাইল ইন্টারনেটে শেয়ার হয়ে যাচ্ছে।
০৯. ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। ব্লগ ও ওয়েবসাইট থেকে কোনো লেখা ও ফটোগ্রাফি সহজেই কপি-পেস্ট করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে সাইবার কমিউনিটিতে।
১০. পর্নোগ্রাফি। শিশু পর্নোগ্রাফি ইন্টারনেটে ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে।
১১. ব্যক্তিগত তথ্য, পরিচয়, ছবি চুরি ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার বেড়েছে।
১২. হ্যাকিং। বাংলাদেশেও ওয়েবসাইট হ্যাকিং ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
১৩. ক্র্যাকিং। ক্র্যাকিং হল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিংবা ক্রেডিট কার্ড নাম্বার চুরি করে গোপনে অনলাইন ব্যাংক থেকে ডলার চুরি করা।
কম্পিউটার ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে বাংলাদেশ
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার প্রযুক্তি নিরাপত্তা পণ্য উৎপাদন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির বার্ষিক দ্বিতীয় প্রান্তিকের গবেষণা রিপোর্টে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কম্পিউটার ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এক নম্বরে চলে আসে। এর আগে ২০১৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে ভাইরাস আক্রান্ত দেশের তালিকায় ভিয়েতনাম শীর্ষে ছিল। ওই রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যবহৃত কম্পিউটারের মধ্যে ৬০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ২০ ধরনের বিপজ্জনক ভাইরাস আক্রান্ত। এছাড়া বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৭৫ শতাংশই তাদের ব্যবহৃত কম্পিউটারে ভাইরাস আক্রমণ নিয়ে চিন্তিত নন।’ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘তাদের এই প্রবণতা বিপজ্জনক। বিশেষ করে যেখানে বিপজ্জনক ম্যালওয়ার ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তথ্য, এমনকি অনলাইন ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য ম্যালওয়ারের মাধ্যমে চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের পুরো অনলাইন এবং মোবাইল ব্যাংকিং খাতই সংকটে পড়তে পারে।’
সরকারি সাইট হ্যাক ও ডোমেইনে নিরাপত্তা ত্রুটি
দুর্বল নিরাপত্তার কারণে দেশের সরকারি সাইট হ্যাকের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ জানুয়ারি সরকারের ‘প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট’ (পিআইডি) পুরনো ওয়েবসাটের হোম পেজে প্রদর্শিত হয়েছে ভারতের অভিনেত্রী ও সাবেক পর্নো তারকা সানি লিওনের ছবি। এই ছবি কয়েকদিন ধরে সাইটে ঝুলে ছিল। এছাড়া গত বছরে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কয়েক দফায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাকের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিটিসিএল-এর ওয়েবসাইটসহ চারটি ওয়েবসাইট এ বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হ্যাক হওয়ায় আলোচনায় উঠে এসেছে বিটিসিএলের নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে। দ্বাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞানের ছাত্র সায়জার রহমান নিরাপত্তার ত্রুটি কাজে লাগিয়ে পরিবর্তন করে দেয় চারটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন নেইম। ডটবিডি ডোমেইনের চারটি ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়। সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বাংলাদেশী ওয়েবসাইট গুগল ডটকম ডটবিডিসহ বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ করা যায়নি। সায়জার রহমান গুগল ডটকমডটবিডি, রবি ডটকমডটবিডি, বাংলালিংক ডটকমডটবিডি ও ইত্তেফাক ডটকমডটবিডি সাইটের নেম সার্ভারের ঠিকানা পরিবর্তন করে দিয়েছিল। সায়জার ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করে বলেছেন, এভাবে হাজার হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া সম্ভব। কারণ বাংলাদেশের ওয়েবসাইটগুলো অনেক পুরনো ও নিরাপত্তা ত্রুটি রয়েছে। যদিও হ্যাক হওয়া সাইটগুলো দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছে। বিটিসিএল’র ত্রুটির কারণে যদি বাংলাদেশের সব সরকারি দফতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, বিভিন্ন পত্রিকা বা ই-কমার্স সাইটগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখন কী ঘটতে পারে তা চিন্তা করে দেখার অনুরোধ জানিয়ে সে আরও লিখেছে, কেন জানি উদাসীনতার ফলে কোন নিরাপত্তাজনিত চিন্তা-ভাবনা তাদের মাথায় কাজ করে না, এমনকি কয়েক দফা ফোন করে দিলেও না!
সাইবার পর্নোগ্রাফি
অনলাইন পর্নোগ্রাফি বা সেলফোন পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে এখন কম-বেশি সবাই জানেন। বিশেষ করে উঠতি বয়সের কিশোর, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যায়নরত ছাত্রছাত্রীদের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক। বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসায়ে যে সাইটগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি তার কয়েকটি যেমন পাইরেটেড বই, চলচ্চিত্র সংবলিত, নানা ধরনের পর্নোসাইট। পর্নো সাইটগুলো বন্ধে সরকার একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে এখনও চলছে সাইবার পর্নোগ্রাফি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামে এক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, পর্নো ছবির দর্শকদের ৭৭ শতাংশ শিশু। স্কুল শিক্ষার্থীরা ভিডিও মোবাইলে, সাইবার ক্যাফেতে বাসায় ইন্টারনেটে পর্নো ছবি দেখে থাকে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান ইন্টারনেটের তথ্য ভাণ্ডারের প্রায় ২৫ ভাগই পর্নোগ্রাফি। বর্তমানে ইন্টারনেটে মোট ২০,৫২,০৩,২০০টি ওয়েবসাইটের মধ্যে ৫১,০০০০০০ (পাঁচ কোটি দক্ষ) পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট রয়েছে। শিশুদের নিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবির ওয়েবসাইট রয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি। ১০ লাখের বেশি শিশুর ছবি রয়েছে এসব সাইটে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এক গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে সামাজিক যোগাযোগের নামে তরুণদের নানা অপরাধের চিত্র ফুটে উঠেছে। তাতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট মাইস্পেস তরুণ সদস্যদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এসব তরুণ মাইস্পেস ব্যবহারকারীর বেশিইভাগই অনিরাপদ যৌন কিংবা মাদকাসক্তের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করছে।
স্প্যাম মেসেজ
স্প্যাম ফিল্টার ছাড়া একজন ই-মেইল ব্যবহারকারী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০টি স্প্যাম মেসেজ পেয়ে থাকেন। ২০০৯ সালে বিখ্যাত এন্টিভাইরাস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাকঅ্যাফির এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণাটির জন্য ম্যাকঅ্যাফি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবককে এক মাস স্প্যাম ফিল্টার ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বলা হয়। দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণকারী সর্বোচ্চ মোট ২৩ হাজার ২৩৩টি স্প্যাম মেইল আসে। এবং ব্রাজিলের অংশগ্রহণকারীর কম্পিউটারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮৫৬টি ইমেইল আসে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা ১১ হাজার ৯৬৫টি স্প্যাম ইমেইল পান। এ সময় সবচেয়ে কম স্প্যাম আসে জার্মানির প্রতিনিধির কম্পিউটারে। তবে এ সংখ্যাও ২ হাজার ৩৩১টি। গবেষণাটির ফলাফল এটাই ইঙ্গিত করে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটে স্প্যাম আক্রমণের সংখ্যা তো কমেইনি বরং আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। গবেষণাকালে স্প্যামগুলোর ধরন ও সংখ্যা অংশগ্রহণকারীদের অবাক করে দিয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বেশিভাগ সময়ই অখ্যাত নাইজেরিয়া স্প্যাম মেইল দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ধরনের মেইলে নাইজেরিয়া থেকেই ইন্টারনেট ব্যহারকারীকে জানান হয়, নাইজেরিয়ায় কেউ একজন উইল করে তার নামে বিপুল অংকের অর্থ রেখে গেছেন। আর এ অর্থ পেতে স্বভাবতই তার আর্থিক লেনদেনের গোপন তথ্য জানাতে বলা হয়। আর অর্থের লোভে অনেক সহজ-সরল ব্যক্তি এ ফাঁদে পা দিয়েও থাকেন। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে মোট স্প্যাম মেইলের ৮ শতাংশই মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে নানা ছলনায় ব্যবহারকারীর বিশ্বাস জিতে তার বিভিন্ন গোপন তথ্য যেমন- পাসওয়ার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত, ইউজার নেম, পিন ইত্যাদি হাতিয়ে নেয়া। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের মতো আর্থিক বিষয়গুলোর স্প্যাম মেইলগুলোর আক্রমণের মূল লক্ষ্য বলে চিহ্নিত। ম্যাক অ্যাফির পরিচালক বলেন, এ গবেষণার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে বর্তমানে স্প্যামগুলো অতিমাত্রায় উদ্দেশ্যমূলক এবং ইতোমধ্যেই সাইবার অপরাধের সঙ্গে তাদের একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয়ে গেছে।

No comments:
Post a Comment