মার্কিন
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় অদূর ভবিষ্যতে
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে
ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম সপ্তাহেই ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি)
চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্তের ফলে সে আশায় চিড় ধরতে যাচ্ছে। মার্কিন
নাগরিক, শ্রমিক ও ভোক্তারা এ চুক্তি বাতিলে বেশ আঘাত পেয়েছেন। তবে,
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে লাভবান হতে যাচ্ছে চীন। ওবামা প্রশাসনের ‘এশীয়ামুখী
নীতি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দাবি করা হচ্ছিল টিপিপিকে।
নির্বাচনের প্রচারণা থেকেই ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, চীনের বিনিয়োগ বাড়ায়
আমেরিকানদের চাকরি ‘চুরি’ হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী
সোমবার ১২টি দেশের এ অংশীদারিত্বের চুক্তি টিপিপি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে
প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে আদতে বাণিজ্যিক চাবিকাঠি চীনের
হাতে তুলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। টিপিপি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে
আসায় চীনা পণ্যের ব্রান্ড এশিয়া অঞ্চলের বাজার দখল করে নেবে। ফলে এশিয়া
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হবে চীনের অর্থনৈতিক বাজারের একক আধিপত্য।
টিপিপির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বিপর্যয়ের’ কারণ এবং যারা দেশটাকে ‘ধর্ষণ
করতে চায়’ তারাই লাভবান হবে বলে মনে করেন ট্রাম্প। তার মতে, টিপিপি চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের ‘কর্মসংস্থান হত্যাকারী’ এবং ‘স্বার্থের ধর্ষণকারী’।
টিপিপির পরিবর্তে তিনি নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফটা)
চুক্তিকে পুনরায় সচল করার দাবি জানিয়েছেন। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের
জ্যেষ্ঠ ফিলো এডওয়ার্ড আলডিন বলেন, টিপিপির পরিবর্তে ট্রাম্প
‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ হয়ে কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে নাফটা
চুক্তিকে সচল করতে পারেন। রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন
ম্যাককেইন বলেন, ট্রাম্পের পিছু হটার সিদ্ধান্ত চীনের জন্য উৎসাহের কারণ
হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আমেরিকার জন্য ‘বিপর্যয়ের হুমকি’ বলে মনে করেন তিনি।
চীন এখন আঞ্চলিকভাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে নিজস্ব মডেল নিয়ে এগোচ্ছে।
‘রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ (আরসিইপি) নামের একটি
বাণিজ্য চুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা। আরসিইপিতে জাপান-অস্ট্রেলিয়ার মতো
দেশকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যারা টিপিপি চুক্তির আওতায়ও রয়েছে। ইতিমধ্যে
১৬টি দেশ আরসিইপিতে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। গত বছর ওবামা বলেছিলেন,
‘চীনের মতো দেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিয়মনীতি লেখার সুযোগ দিতে পারি না।
আমরাই এ নীতি তৈরি করব।’ তার কথার সঙ্গে সুর তুলে বিশ্ব অর্থনীতির লাগাম
চীনের হাতে চলে যাওয়ার আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা। ‘পিটারসন ইন্সটিটিউট ফর
ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স’র অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ গ্যারি হাফবুয়ার
বলেন, টিপিপি থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের জন্য যেমন
বড় ক্ষতি, তেমনি বেইজিংয়ের জন্য বড় বিজয়। টিপিপিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে এখন
বাড়তি প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাচ্ছে চীন। এই চুক্তি থেকে আমেরিকার
বেরিয়ে যওয়ার অর্থ হচ্ছে, পৃথিবীর অর্ধেক বাজার হাতছাড়া করা।
একই সুরে কথা
বলেছেন ব্রুকলিংস ইন্সটিটিউটের গবেষক বিল গ্যালস্টোন। তিনি বলেন, টিপিপি
থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আমেরিকার নেতৃত্বের ব্যর্থতা, যেটা
শেষ পর্যন্ত চীনের অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করবে। শুধু অর্থনীতি নয়,
ভূ-রাজনীতি ও কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই অঞ্চলে চীনবিরোধী রাষ্ট্রগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার
দেয়া প্রতিশ্রুতি এখন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমেরিকা বলয় থেকে বেরিয়ে
চীনা বলয়ে যোগ দিয়েছে ফিলিপাইন। কিছুদিন আগেও দেশটি আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ
সামরিক মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকার নেতৃত্ব
প্রমাণের জন্য একটি বিশাল সুযোগ ছিল টিপিপি বাস্তবায়ন। আর এটি থেকে
আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উল্টো নেতৃত্বের অসাড়তাই
প্রমাণ হল। অন্যদিকে, চীন পেল শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ। সিএনএন।

No comments:
Post a Comment