ছাত্রলীগের
৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২৫ জানুয়ারি গণভবনে ছাত্রলীগের
নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বলেছেন, তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখতে চান
না। শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার জন্য ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীদের
আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। লেখাপড়ার পাশাপাশি জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও
মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্যও ছাত্রলীগের
নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের সঙ্গে সম্পূর্ণ
একমত পোষণ করে দেশবাসীই যেন বলতে চায়, ছাত্রলীগসহ সব ছাত্র প্রধানমন্ত্রীর
নির্দেশনা মেনে চলুক। আর প্রধানমন্ত্রীর মতো দেশের কেউই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
কোনো ধরনের অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখতে চায় না; কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের
অনেক এমপি-মন্ত্রী এর আগে বহুবার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এ ধরনের
আহ্বান জানিয়েছেন, ভালো কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন; কিন্তু কে শোনে কার
কথা? প্রকৃত অবস্থা এই যে, কীভাবে টাকা কামাই করা যাবে, কীভাবে প্রভাব
বিস্তার করা যাবে সেদিকে মন থাকায় এসব নীতিকথা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এক
কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ‘শুধু কথায় চিঁড়া
ভেজেনা’-এর মতো অবস্থা। ইতিপূর্বে (৩১ আগস্ট, ২০১৩) এমনও দেখা গেছে,
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংগঠন করার পাশাপাশি
লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে আহ্বান জানাচ্ছেন; ঠিক তখনই চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে
দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে ১৩ জন আহত হয়েছে। ফলে সহজেই বোঝা
যাচ্ছে, ছাত্রলীগের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীসহ এমপি-মন্ত্রীদের করা এসব
আহ্বান,
উপদেশ ও পরামর্শ ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীই আমলে নেয়নি।
সর্বোপরি, এসব বক্তব্য ও আহ্বানের ফল শেষ পর্যন্ত শূন্যের কোঠায় গিয়েছে তা
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ছাত্রলীগ’ নামধারী উচ্ছৃংখল নেতাকর্মীদের
দ্বারা ‘কৃতকর্ম’ দেখে সহজেই বোঝা যায়। যেমন- মাত্র এক মাস আগে কুমিল্লা
মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১৫ নেতাকর্মী আহত হওয়াসহ কলেজ
ছাত্রাবাসের একাধিক কক্ষ ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে
অনির্দিষ্টকালের জন্য মেডিকেল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনার রেশ কাটতে
না কাটতেই ২১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ
শাখা ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, গোলাগুলি ও সাতটি
মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটল। এসব ঘটনার আগে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের
পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনায় সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এর আগে শোকের মাস আগস্ট
(২০১৬) শুরুর প্রাক্কালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের
গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের
শিক্ষার্থী খালিদ সাইফুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ওই ঘটনার
পরিপ্রেক্ষিতেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা
করা হয়েছিল। দেশের উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা
একদিকে যেমন দুঃখজনক ও নিন্দনীয়; অপরদিকে তা উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু ও
স্বাভাবিক পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি। ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান সরকার
দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা (বিশেষ
করে যারা ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশকারী, যারা মাইগ্রেটেড ছাত্রলীগ, যারা
সুযোগসন্ধানী ও নিজ স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত) অব্যাহতভাবে শুরু করে সন্ত্রাস,
হত্যা, হামলা, ভাংচুর, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য
বিস্তারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ঠিক যেমনটি বিএনপি-জামায়াত চারদলীয়
জোট সরকারের আমলে ঘটিয়েছিল ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা। এ যেন
মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এতটাই প্রকট যে, সংগঠনটির
এক পক্ষের কর্মীদের কাছে অপর পক্ষের কর্মীরা মোটেও নিরাপদ নয়। তার
প্রকৃষ্ট প্রমাণ, বছর কয়েক আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ্মখদুম হলে
ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের সমর্থক কর্মী নাছরুল্লাহ্ নাসিমকে
প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী কর্তৃক মারধর করে হলের দোতলা থেকে নিচে ফেলে দিয়ে
মৃত্যু ঘটানো। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল আর ছাত্রশিবিরের এসব সন্ত্রাসী দ্বারা
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অব্যাহতভাবে সন্ত্রাসী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড
সংঘটিত হওয়ায় অনেক ছাত্রের যেমন প্রাণহানি ঘটেছে, তেমনি অনেকে পঙ্গুত্বও
বরণ করেছে। পাশাপাশি এসব ঘটনার ফলে বারবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া
মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, বিনষ্ট হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মূল্যবান
সম্পদ। কিন্তু মাত্র একদিন এ ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে
সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে ধরনের ক্ষতি এবং দুর্ভোগের শিকার হয়, তা কি এসব
ঘটনা সৃষ্টিকারী ও তাদের নেপথ্যের মোড়লরা উপলব্ধি করতে পারে? সরকার যেখানে
দাবি করছে, দেশে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসন বিরাজ করছে, সেখানে ছাত্রলীগের
বাইরে অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে কেন কার্যক্রম চালাতে পারছে না এবং
কেন ছাত্রলীগ একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাচ্ছে? এসব ক্ষেত্রে
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও শাস্তি দেয়া এবং ছাত্রলীগকে রক্ষার যে
নীতি চালু করেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়,
ছাত্রলীগের কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা
হয়েছে। আবার কিছুদিন পর এ-ও দেখা যায়, বহিষ্কৃত ব্যক্তিকে ‘ব্যাক টু দ্য
প্যাভিলিয়ন’-এর মতো আবারও সংগঠনে টেনে নেয়া হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ
ধরনের বহিষ্কার করাটাই কি যথেষ্ট? ছাত্রলীগের উচ্ছৃংখল এসব নেতাকর্মীসহ
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ছাত্রদল আর ছাত্রশিবিরের যেসব সন্ত্রাসী
শিক্ষাঙ্গনগুলোয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছিল; সবার বৃহত্তর স্বার্থেই
তাদের কি আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত নয়? বর্তমান সরকার কর্তৃক দেশের
অনেক উন্নয়ন-অগ্রগতি সাধিত হলেও তার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে ছাত্রলীগের
সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে। এ বিষয়টিকে সরকারের
অবশ্যই গুরুত্বসহকারে আমলে নেয়া প্রয়োজন। বারবার ছাত্রলীগ দ্বারা সৃষ্ট
সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটায় জনগণের মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ছাত্রলীগ নামধারী
সন্ত্রাসীরা কি অপ্রতিরোধ্য, এদের কি সামলানো সম্ভব নয়? যদি সামলানো সম্ভব
হয়, তাহলে সামলানোর দায়িত্ব কার? সামলানোর দায়িত্ব যদি ছাত্রলীগের
পিতৃসংগঠন কিংবা সরকারের হয়ে থাকে, তাহলে কেন তাদের সামলানো হচ্ছে না, কেন
দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না? এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর
কর্তাব্যক্তিরাইবা কী করছেন? সবাইকে মনে রাখতে হবে, জনগণের কষ্টার্জিত
টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে জ্ঞানের আধার। স্বাভাবিকভাবেই
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-গবেষণা চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকার
কথা; মেধাভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে দেশ-জাতি-সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার
কথা। মহান ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ অতীতের ছাত্র
রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়,
ছাত্র রাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
কিন্তু বর্তমান ছাত্র রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা মেলে সম্পূর্ণ ভিন্ন
চিত্র। বলা বাহুল্য, কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড
ঘটালে সেই সংগঠনের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুন্ন হয়, তেমনি পরবর্তী সময়ে
নির্বাচনে বা সরকার গঠনে ওই দলের ওপর ওইসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক
প্রভাব পড়ে। বর্তমান সরকারসহ সব রাজনৈতিক সংগঠনেরই উচিত হবে, দেশের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার সুষ্ঠু-স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে যে
কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার ব্যবস্থা করা। প্রধানমন্ত্রীর
আহ্বান ভালোভাবে আমলে নিয়ে এবং নিজেদের প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থেকে ছাত্রলীগ
সমাজে বিভিন্ন জনবান্ধব ও ইতিবাচক পরিবর্তনের শুভ সূচনা করবে- সংগঠনটির কাছ
থেকে এমনটাই আশা করেন প্রধানমন্ত্রীসহ দেশবাসী। দেশবাসী এটাও প্রত্যাশা
করে, ছাত্রলীগ হানাহানি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মতো
ন্যক্কারজনক কাজে জড়িত না হয়ে লেখাপড়া ও শিক্ষাসংক্রান্ত এবং কল্যাণমূলক
কাজে মনোযোগী হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ছাত্রলীগ পরিবর্তনের
সূচনার চেষ্টা করলে দেশের রাজনীতির চেহারা যে অতি সহজেই ইতিবাচকভাবে বদলে
যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নিজেদের শপথ ও
সরকারপ্রধানের নির্দেশনা এখন থেকে যথাযথ মেনে চলবে- এমনটাই সবার প্রত্যাশা।
তবে সর্বোপরি বর্তমান সরকারসহ সবাইকে এ কথা বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে,
দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জনসহ অবৈধ নানা সুযোগ-সুবিধা অর্জনের পথ
বন্ধ না করলে দলীয় নেতাকর্মীদের শুধু নীতিকথা কিংবা পরামর্শ বা উপদেশ দিয়ে
কোনো কাজ হবে না।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

No comments:
Post a Comment