গাইবান্ধার
সুন্দরগঞ্জ আসনের ক্ষমতাসীন দলের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নিজ বাড়িতে
দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হওয়ার ঘটনায় পৌর আওয়ামী লীগের হরতাল রোববার অবরোধে
পরিণত হয়। পুরো সুন্দরগঞ্জে সারা দিন ছিল লিটন সমর্থকদের বিক্ষোভ সমাবেশ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো উপজেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে
পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে র্যাব ও বিজিবি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত
গ্রেফতার করা হয়েছে ১৮ জনকে। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতরা জামায়াত, উগ্রবাদী
নাকি দলীয়, পারিবারিক, আর্থিক, না ব্যক্তিগত বিরোধের সাথে সম্পৃক্ত তা
খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে উপস্থিত থাকা তার
স্ত্রীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার মোটিভ উদঘাটনের চেষ্টা
করছে। রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও
মেয়র আবদুল্লাহ আল মামুনের ডাকে হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে উপজেলার
সর্বত্র যানবাহন চলাচল, দোকানপাট, মিলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা বন্ধ ছিল। ট্রেন আটকিয়ে রেল যোগাযোগও বন্ধ করে
দেয়া হয়। কালো ব্যাজ ধারণ করে পথসভা করেন নেতাকর্মীরা। সর্বত্রই কালো পতাকা
ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে শোক পালন করছেন তারা। ফলে উপজেলার সাথে সারা
দেশের যোগাযোগ বিছিন্ন ছিল। বিক্ষুব্ধ জনতা সকাল থেকে বামনডাঙ্গা স্টেশনে
লালমনিরহাট-শান্তাহারগামী ট্রেনটি অবরোধ করে রাখে। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
হয় সব জায়গায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলার সর্বত্রই আইনশৃঙ্খলা
রক্ষায় র্যাব, পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এ দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের
সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা প্রতিবাদ সভায় বলেছেন,
জামায়াত-শিবিরের
লোকজনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা বহুবার তাকে আক্রমণ করেছিল। আগামী কিন
দিনের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করা না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি এ
ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করে বলেন, জামায়াত-শিবিরের কাছ থেকে এমপির জীবনের
থ্রেট থাকলেও পুলিশ তাকে সেভাবে প্রটেকশন দেয়নি। তিনি সুন্দরগঞ্জ থানার
ওসিকে জামায়াত-শিবিরের দোসর বলেও মন্তব্য করেন। শনিবার রাতেই পুলিশের রংপুর
রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম,
র্যাব-১৩সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধŸতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন
করেছেন। ঘটনার পর থেকে এমপি লিটনের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করে অতিথি কক্ষটি
(যে কক্ষে এমপিকে গুলি করা হয়) কর্ডন করে রাখা হয়। এ ছাড়াও রাজশাহী থেকে
সিআইডির ক্রাইম ইউনিটও সারা রাত ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে
প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে। সুন্দরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আতিয়ার রহমান
জানান, গত শনিবার রাতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি যৌথ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে
হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে যে ১৮ জনকে আটক করেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ
করা হচ্ছে। এ দিকে এমপিকে হত্যার ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশন
সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
জানানোসহ সোমবার সব ইউপি কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও মানববন্ধন
কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অ্যাসোসিশনের
আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম। অন্য দিকে পৌর আওয়ামী লীগ তিন দিনের শোকসহ বিভিন্ন
কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।
মোটিভ উদ্ধারে
তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদ্ধারে তদন্তরত আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সাথে কথা বলে এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য
বিশ্লেষণ করা জানা গেছে, এমপি লিটনের কাজের লোক ইউসুফ আলীর বর্ণনা এখানে
উল্লেখযোগ্য। তিনি দুর্বৃত্তদের দেখেছেন। এ ছাড়াও দুর্বৃত্তরা উঠোন থেকে
অতিথিরুমে যখন এমপিকে ডেকে নিয়ে যায়, তখন সেখানে তার স্ত্রী খুরশিদা জাহান
স্মৃতিও ছিলেন। দুর্বৃত্তরা তাকে গোপন কথা আছে বলে অন্য রুমে পাঠিয়ে দিয়ে
গুলি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, এমপি যখন দুর্বৃত্তদের সাথে
বৈঠকখানায় যেতে চাইলেন, তাহলে কি তিনি তাদের চিনতেন? তার স্ত্রী তাদের
কথায় ঘর থেকে চলে গেলেন, তাহলে কি তিনিও তাদের চিনতেনÑ এসব প্রশ্ন উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে এসব বিষয় নিয়ে
স্ত্রী স্মৃতির সাথে খুব ক্লোজ কথাবার্তা হয়েছে। সেখান থেকে দুর্বৃত্তদের
পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলোর মতে, এই
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অন্যতম একটি দিক হচ্ছে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের লোকজন।
সূত্রগুলোর মতে, সুন্দরগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিপক্ষে
সব সময় সোচ্চার ছিলেন এমপি লিটন। স্থানীয় জামায়াত তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
ফলে তদন্তের প্রথম ফোকাসই তাদের দিকে। যদি তারা হত্যা করে থাকে, তবে কিভাবে
করল সেটা খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলীয়
কোন্দলের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে। সে ক্ষত্রে সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ,
২০১৫ সালে গোপালচরণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র সৌরভকে গুলি
করা, তার বাড়ির পাশে হাফিজার রহমান নামের এক ব্যাক্তির বাড়িঘর ভাঙচুর করা,
সুন্দরগঞ্জ স্থাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফাঁকাগুলি করা, সরকারিভাবে গম, ধান ও পাট
ক্রয়, সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিজের সমর্থকদের প্রাধান্য দেয়ায়
তার সাথে সুন্দরগঞ্জ আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের বিরোধ ছিল। বিশেষ করে এই
পক্ষটি অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সী।
এরা
অতীতে বিভিন্ন সময়ে তার বিরোধিতা করে রাস্তায়ও দাঁড়িয়েছিল। এ ছাড়াও
বামনডাঙ্গা আবদুল হক কলেজ মাঠে সার্কাসের প্যান্ডেলে ম্যাজিস্ট্রেটকে
লাঞ্ছিত করা এবং অতি সম্প্রতি উপজেলা পিআইর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মামলার
বিষয়টি ভালোভাবে দেখেনি আওয়ামী লীগের ওই অংশটি। এ বিষয়গুলো গভীরভাবে খতিয়ে
দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলোর মতে,
এমপির কাছে সব সময়ই তার দলীয় লোকজন থাকতেন। কিন্তু ওই দিন সন্ধ্যায় কেন তার
বাড়িতে দলীয় লোকজন থাকল না এবং সে বিষয়টি কিলাররা জেনে হামলা চালাল
কিভাবে। অন্য দিকে এ ঘটনায় পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও আর্থিক বিষয় জড়িত কি না
তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। অপর দিকে স্কুলছাাত্র
সৌরভকে গুলি করার ঘটনার পর এমপির লাইসেন্স করা পিস্তলটি সিজ করার পর আর
কেন সেটি দেয়া হয়নি সে বিষয়েও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়াও নব্য
উগ্রবাদীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখছে তারা। এ দিকে রংপুর
পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে নামাজে জানাজার পর সংরক্ষিত মহিলা
আসনের এমপি মাহবুব আরা গিনী বলেন, কিছু দিন আগে একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার
পর লিটন আমাকে বলেছিল আপা সরকার তো আমার লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা নিয়েছে।
এলাকায় আমি নিরাপত্তাহীনতায় আছি। সুন্দরগঞ্জে স্বাধীনতাবিরোধীরা বিশৃঙ্খলা
করতে পারে। এমনকি আমাকেও মেরে ফেলতে পারে। আপা একটু খেয়াল রাখিয়েন। এ সময়
তিনি বলেন, লিটন চলে গিয়ে প্রমাণ করে গেল দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা কতটা
বেপরোয়া।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সন্ধ্যায় সরকার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে দুর্বৃত্তরা সর্বানন্দ ইউনিয়নের উত্তর সাহাবাজের (মাস্টারপাড়া) নিজ বাড়িতে ঢুকে গুলি করে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হলে রাত ৭টা ৪০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সন্ধ্যায় সরকার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে দুর্বৃত্তরা সর্বানন্দ ইউনিয়নের উত্তর সাহাবাজের (মাস্টারপাড়া) নিজ বাড়িতে ঢুকে গুলি করে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হলে রাত ৭টা ৪০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।

No comments:
Post a Comment