Wednesday, January 25, 2017

ধ্বংসের মুখে মহেঞ্জোদারো সভ্যতার নিদর্শন

উপমহাদেশে প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে পরিচিত সিন্ধু সভ্যতা। এ সভ্যতার সবচেয়ে বড় নগরী মহেঞ্জোদারো। বলা যায়, ওই নগরীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এ সভ্যতা। এ জন্য সিন্ধু সভ্যতাকে অনেকে ‘মহেঞ্জোদারো সভ্যতা’ বলেও অভিহিত করে থাকেন। নগরীটি বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় অবস্থিত। গত বছর ভারতের একদল গবেষক জানান, সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা সাড়ে ৫ হাজার বছরের পুরনো বলে এতদিন ধরে মনে করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা অন্তত আট হাজার বছরের পুরনো। ২০১৬ সালের ২৫ মে মাসে ‘নেচার’ ম্যাগাজিনে প্রথম গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়। এতে বিশ্বজুড়ে মানব সভ্যতার ইতিহাস বদলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ভারতের আইআইটি খড়গপুরের জিওলজি অ্যান্ড জিওফিজিক্স বিভাগের প্রধান অনিন্দ্য সরকার বলেন, ‘আমরা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো মৃৎপাত্র খুঁজে পেয়েছি। ‘অপটিক্যালি স্টিমুলেটেড লুমিনেসিন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ মৃৎপাত্রের বয়স জানা গেছে। এ সভ্যতার বয়স ছয় হাজার বছরের পুরনো হরপ্পা সভ্যতার চেয়েও বেশি।’মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থ ‘মৃতদের স্তূপ’। তবে নানা জাঁকজমকপূর্ণ কর্মকাণ্ড এবং সভ্য ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে কিংবদন্তি হয়ে আছে এটি।
এখানে প্রাচীন যত বাড়িঘরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় তার প্রায় সবই পোড়া মাটির তৈরি দোতলা বাড়ি। এমনকি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ছিল বর্তমান সময়ের মতোই আধুনিক। একসময় নগরটিতে যারা বাস করত তাদের পরিকল্পনা দক্ষতার সাক্ষী হিসেবে আজো পুরনো রাস্তাগুলোর সাথে দেখা যায় এসব ড্রেন। মহেঞ্জোদারোর ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত ‘গ্রেট বাথ’ (মহাস্নান) নামক স্থাপনাটি। গবেষকদের ধারণা, এক সময় ধর্মীয় পরিশুদ্ধির জন্য এ জায়গায় গোসল করতে আসতেন পুণ্যার্থীরা। শহরের মাঝখানে দেখা যায়, এখানকার দীর্ঘতম স্থাপনাটি। এটি একটি বৌদ্ধ স্থাপনা। পাকিস্তানের ২০ রুপির নোটে রাখা হয়েছে এর প্রতিকৃতি। পাশেই ছুটে চলেছে সিন্ধু নদ। এ নদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল সভ্যতাটি। আর তাই এর নাম হয়েছে সিন্ধু সভ্যতা। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, বর্তমানে নিঃশেষ হতে চলেছে প্রাচীন এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ। আর এটা শুধু প্রাচীনত্বের কারণেই হচ্ছে না। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। বর্তমানে বার্ষিক কী পরিমাণ পর্যটক আসছে তার হিসাব দিতে না পারলেও পর্যটক সংখ্যা কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান তারা। মহেঞ্জোদারো ভ্রমণেও রয়েছে জটিলতা। নগরীটির পাশেই একটি বিমানবন্দর থাকলেও আগের চেয়ে তার ফ্ল¬াইট সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগে দিনে দুইটি ফ্লাইট পরিচালনা করত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা। বাইরে থেকে আসা ফ্লাইটগুলোও ঠিক সময়ে আসে না। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে একটি মাত্র গেস্ট হাউজ। সেখানেও আছে বিদ্যুৎ সমস্যা। গরমের সময়ে ওই সমস্যা আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তবে শুধু এসব প্রাকৃতিক কারণেই নয়, পর্যটক কমে যাওয়ার পেছনে কিছু বাহ্যিক কারণ রয়েছে বলে জানান প্রাদেশিক সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী শর্মিলা ফারুকি। তিনি বলেন, ‘বিদেশীদের একটি বড় অংশই এখানে আসে না পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে। এটি সমাধান করা প্রয়োজন। যদিও পর্যটক আকর্ষণ একটি ভিন্ন ব্যাপার। তবে অনেক কিছুই এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে।’ ধ্বংসাবশেষটি সংরক্ষণ আরেকটি জরুরি ইস্যু। সূর্যাস্তের সময় অনেক দর্শনার্থী এখানে তাদের পরিবার নিয়ে আসেন। শিশুরা চার দিকে দৌড়াদৌড়ি করে, বড়রা সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। স্থানটির সংরক্ষণে ধ্বংসাবশেষের দেয়ালগুলোতে প্রতিদিনই করা হয় বিশেষ ধরনের স্প্রে। কিন্তু তাতেও ঝুঁকি কমছে না। এ বিষয়ে মহেঞ্জোদারোর সাবেক প্রকল্প পরিচালক কাসিম আলি কাসিম জানান, এর পেছনে পর্যটকদের দায়বদ্ধতাও কম নয়।
এখানকার নিয়মকানুন সম্পর্কে অবহিত করার জন্য পুরো স্থাপনাজুড়েই নানা সতর্কতামূলক কথা লেখা রয়েছে, যাতে কেউ শিল্পকর্মগুলো স্পর্শ কিংবা এর কোনো ক্ষতি না করে। কিন্তু আইন প্রয়োগের জন্য নেই পর্যাপ্ত জনবল। ১৯৮৮ সাল থেকে মহেঞ্জোদারোর এ প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনাটির সাথে যুক্ত কাসিম। এ জন্য এর প্রতি পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি এক ধরনের আবেগও আছে তার। তিনি বলেন, ‘প্রাচীন এ স্থাপনাটির ব্যাপারে স্থানীয়দের সচেতন করে তোলা দরকার। পাকিস্তানিরা খুবই কৌতূহলী। কোনো কিছু স্পর্শ না করা পর্যন্ত তাদের কৌতূহল যায় না। শীর্ষমহল লাহোরের খুব সুন্দর একটি মার্বেলখচিত স্থাপনা। এটা কতটা শক্ত, তা দেখার জন্য একবার এক ব্যক্তি একে লাথি মেরে ভেঙে ফেলে।’ মহেঞ্জোদারো বিষয়ক পাঠ বইপুস্তকে রাখা দরকার বলেও মনে করেন কাসিম। তার ভাষায়, ‘এটা আমাদের পাঠ্যক্রমের একটি অংশ হওয়া উচিত। আমরা আমাদের ইতিহাস হারিয়ে ফেলছি এবং তা আমাদেরই ভুলে।’এ প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনটিতে রয়েছে একটি পোস্ট অফিস, একটি প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাগার, একটি পুলিশ স্টেশন, একটি জাদুঘর এবং একটি উপহার সামগ্রীর দোকান। দর্শনার্থী না থাকায় এতে নেই তেমন কোনো ক্রেতা। দোকানটির মালিক বলেন, ‘এখানে কেউ এলে আমরা তাকে প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সহায়তা করি। তারা কিছু না কিনলেও দিই। কারণ এটা আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে সহায়তা করবে।’ প্রাচীন এ নগরীটির ধ্বংসাবশেষের মাত্র ১০ শতাংশ এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। ২২৫ হেক্টরের বাকি অংশ এখনো মাটির নিচেই চাপা পড়ে আছে। জনবল এবং অর্থসঙ্কট সেই সাথে দর্শনার্থীদের মধ্যে সচেতনতার অভাবে এর বাকি অংশ উন্মোচন করা হবে কি নাÑ তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে বলে জানান কাসিম। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা যদি সঠিক হয়, তবে সম্ভবত মহেঞ্জোদারো ছিল একটি বিশ্বমানের শহর এবং বহুজাতিক নগরী। আমি বারবার বলেছি, পাঁচ হাজার বছর আগে, যখন ইউরোপ এবং অন্য জায়গার মানুষ গুহায়, জঙ্গলে বাস করত, তখন মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দারা একটি সভ্য ও পরিকল্পিত নগরীতে ইটের তৈরি বাড়িতে বাস করত।’ ২০১৪ সালে একবার ‘সিন্ধু ফেস্টিভাল’ প্রাদেশিক সরকার একটি উৎসবের আয়োজন করেছিল। তখন এতে সেখানকার দুইটি প্রাচীন স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউনেসকো। তবে কাসিম জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ২০০২ সালেও প্রাচীন কিছু সিলমোহর ডাকাতি হয় সেখান থেকে। পরে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলেও সিলমোহরগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওই ঘটনার পর থেকে নতুন করে কোনো খননকাজ শুরু করেনি কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে পাওয়া কবিতা ও গানের লিরিক প্রদর্শনে নতুন একটি জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির সরকারের।
সূত্র : আল জাজিরা

No comments:

Post a Comment