আওয়ামী
লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান ও
তার স্ত্রী হাসিনা সুলতানার দুর্নীতির বিচার অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাইপ্রোফাইল ক্যাটাগরির এ মামলার তদন্ত শেষ
করতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছে। আর বিচার শুরু করতে এরই মধ্যে পার হয়েছে দেড়
বছরের বেশি সময়। ইতিমধ্যেই চার্জ (অভিযোগ) গঠনের শুনানি সাত দফা পিছিয়েছে।
রোববার এ মামলার চার্জ গঠনের দিন ধার্য রয়েছে।
সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত
আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে ২০১৪ সালে এই দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা হলেও
নানা কারণে বিচার শুরুর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য
আবদুর রহমান বদি ও মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে গত বছর একই সময়ে আদালতে
চার্জশিট দেয় হয়। গত ৩০ অক্টোবর দুর্নীতির মামলায় বদির সাজা হলেও মান্নান
খান দম্পতির বিরুদ্ধে গত দেড় বছরে বিচারই শুরু করতে পারেনি দুদকের
প্রসিকিউশন। তাদের দাবি, আসামিপক্ষের অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদনের কারণে
বিচার শুরু করতে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তবে এবার চার্জ গঠনের
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে কমিশনের প্রসিকিউশন। এদিকে সাবেক সংসদ সদস্য,
ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারসহ অন্তত দুই ডজন হাইপ্রোফাইলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির
মামলার বিচার ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে চলছে। দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের নির্দেশে
বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা বেশ কয়েকটি মামলার বিচার ফের গতি পাচ্ছে।
জানতে চাইলে মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল যুগান্তরকে বলেন,
ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির মামলাগুলোর বিচার কাজ ধীরগতিতে চলায় ন্যায়বিচার
নিশ্চিত হচ্ছে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলাগুলোর বিচার কাজ দ্রুত
সম্পন্ন করা উচিত। মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা প্রসঙ্গে
জানতে চাইলে দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম যুগান্তরকে বলেন, ‘এবার
আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আছি। আসামিপক্ষ আদালতে অব্যাহতির আবেদন
(ডিসচার্জ পিটিশন) করেছেন। এ জন্য তাদের সময়ও দেয়া হয়েছিল। ওই আবেদনের
শুনানির জন্য রোববার (আজ)
দিন ধার্য রয়েছে। আশা করছি, শুনানি শেষে আদালত
আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করবেন। মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা
দায়ের ও তদন্ত : ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে ৭৫ লাখ ৪
হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলার তিন
দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট মান্নান খান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট
(সিএমএম) আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। অপরদিকে তার স্ত্রী হাসিনা
সুলতানার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৩
কোটি ৪৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একই
বছরের ২১ অক্টোবর মামলা করে দুদক। এর দু’দিনের মাথায় ২৩ অক্টোবর ঢাকার
সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন হাসিনা সুলতানা। এরপর শুরু হয়
মামলার তদন্ত। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে
আদালতে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। চার্জশিটে মান্নান খানের অবৈধ সম্পদের
পরিমাণ বেড়ে যায়। তাতে দেখা যায়, তার আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৬৬
লাখ ৭ হাজার টাকা এবং তিনি সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন ৩১ লাখ ৪৫ হাজার
টাকার। তদন্ত শেষে হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৯ জুন আদালতে
চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের
তথ্য গোপন ও ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বিচার শুরু করতে কেটে গেছে দেড়
বছর : ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের পর ৩
সেপ্টেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়।
এরপর নানা অজুহাতে বিচার শুনানি পেছাতে থাকে। আদালত সূত্র জানায়, মান্নান
খানের মামলাটি বিচারের জন্য বদলি হওয়ার পর ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর এটি আমলে
নেয়ার বিষয়ে শুনানি শেষে বিচারের জন্য গ্রহণ করা হয়। মামলা বিচারের জন্য
গৃহীত হওয়ার পর বিচার শুনানির জন্য ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে বদলি করা
হয়।
৭ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত মামলায় আসামি মান্নান খানের বিরুদ্ধে চার্জ
গঠন শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। নির্ধারিত দিন চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি তার
পক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়। ওইদিন দুদক প্রসিকিউশন শুনানি করতে জোর চেষ্টা
চালালেও আসামির সময় আবেদনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এভাবে পরবর্তী সময়ে ১৭
জানুয়ারি, ২৪ জানুয়ারি, ২৮ ফেব্র“য়ারি, ২৪ এপ্রিল, ৩১ জুলাই ও সর্বশেষ ৩০
অক্টোবর তার বিরুদ্ধে চার্জ শুনানির কথা থাকলেও তা হয়নি। পরে আদালত মান্নান
খান দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন সংক্রান্ত শুনানির জন্য রোববার দিন ধার্য
করেন। অপরদিকে মান্নান খানের স্ত্রী হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে সম্পদের
মামলা বিচারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এ মামলাটি বিচারের জন্য ২০১৫
সালের ১১ মে ঢাকা মহানগর আদালতে বদলি হয়। এরপর ৭ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে
চার্জ গঠন শুনানির মাধ্যমে বিচার শুরুর জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু দফায় দফায়
সময় আবেদন করায় তার বিরুদ্ধেও বিচার শুরু করতে পারেনি দুদকের প্রসিকিউশন।
সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর মান্নান খান ও তার স্ত্রী আদালতে হাজির হলেও এক
আইনজীবীর ব্যস্ততার কারণে চার্জ গঠন শুনানি হয়নি। ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ
আদালতে এ দুটি মামলা বিচারাধীন।

No comments:
Post a Comment