Monday, January 30, 2017

শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে বিত্তবানদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৭ উদযাপনের উদ্বোধনী  অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ক্লাস ফাইভে এবং ক্লাস এইটে আগে থেকেই বৃত্তি দেয়া হতো। তাই বৃত্তি পাওয়ার জন্য উভয় ক্লাস থেকেই কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে বেছে নিয়ে আলাদাভাবে ক্লাস করানো হতো। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের বাইরে যারা ছিল তারা অবহেলিতই থেকে যেত। বাদ পড়ে যাওয়া এসব শিক্ষার্থীর মধ্যেও কিন্তু মেধাবী থাকতে পারে, যাদের মূল্যায়ন হতো না।
তিনি বলেন, সেজন্য আমি চিন্তা করলাম, সবাই পরীক্ষা দেবে। সেখান থেকে যারা মেধাবী বা দরিদ্র, অসচ্ছল তাদের যে নিয়মমতো বৃত্তি দেয়া হয় সেভাবে বৃত্তি দেয়া হবে। কচি বয়সেই একটি বোর্ডের সার্টিফিকেট পাওয়া অত্যন্ত সুখকর অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্কুলে ভর্তির ১০ বছর পর (এসএসসি) শিক্ষার্থীরা একটা সার্টিফিকেট পেত। আর সেখানে ক্লাস ফাইভেই তারা যদি একটি সার্টিফিকেট পেয়ে যায় তাহলে বিষয়টি যেমন ভালো লাগে, তেমনি তাদের সেল্ফ কনফিডেন্সও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান এবং প্রথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবুহেনা মোস্তফা কামাল বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০১৬ বিতরণ করেন। ১৯ জন কর্মকর্তা, শিক্ষক, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট, ইনস্ট্রাকটর ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিগণ এ পুরস্কার লাভ করেন। শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক হিসেবে যশোরের জেলা প্রশাসক ড. মো. হুমায়ুন কবীর, শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে সাঁথিয়া মডেল বিদ্যালয় সাঁথিয়া, পাবনার সহকারী শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম এবং শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক শিক্ষিকা হিসেবে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার দাসপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আফরোজা ইয়াসমীন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যেও পুরস্কার বিতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি খুব আনন্দিত যখন দেখলাম ২০১৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে ৯৮ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং এবতেদায়ীতে ৯৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাস করেছে। শতকরা ৯৮ ভাগ পাস করা মানে প্রায় সকলেই পাস করা। আগে দেখতাম আমাদের এসএসসি পরীক্ষায় ৪০ ভাগ পাস করেছে। তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগতো আমাদের শিক্ষার্থীরা তো খুব মেধাবী। তারা ফেল করবে কেন? একটু কষ্ট করলেই তো পরীক্ষায় পাস করা যায়। প্রধানমন্ত্রী সার্বিক পাসের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। ঝরেপড়া রোধে ১ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ঝরে পড়ার হার হ্রাস পেয়েছে।
তিনি বলেন, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় শিক্ষার্থীদের খাদ্য ও পুষ্টির যোগান দিতে ‘স্কুল ফিডিং প্রকল্প’ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে মোট ৯৩টি উপজেলায় ৩০ লাখ ৫ হাজার ৪০৯ জন শিক্ষার্থীর পুষ্টিমানসমৃদ্ধ বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ, অভিভাবক ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সারা দেশে ‘মিড-ডে মিল’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি সরকারের এই উদ্যোগে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, স্থানীয় বিত্তবান এবং অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যালয় বহির্ভূত, অনগ্রসর, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষার জন্য ‘সেকেন্ড চান্স এডুকেশন’ ও ‘আনন্দ স্কুল’ চালু রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলায় ইতিমধ্যে ১৯টি আবাসিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। জাতির পিতা বলতেন, “সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই”। আপনারা হচ্ছেন সেই সোনার মানুষ গড়ার কারিগর। আপনারাই পারেন প্রতিটি শিশুকে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশপ্রেমিক ও আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও মান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, শিক্ষকদের জন্য ৬০টি পিটিআইতে ১৮ মাস মেয়াদি ডিপিএড (ডিপ্লোমা-ইন-প্রাইমারি এডুকেশন) কোর্স চালু করা হয়েছে। পিটিআইবিহীন ১১টি জেলায় নতুন পিটিআই স্থাপন করা হয়েছে। ৫৫টি পিটিআইতে অত্যাধুনিক আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীতকরণসহ সহকারী  শিক্ষকদের বেতনস্কেল আপগ্রেড করা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে মেয়েদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও এবদেতাদায়ী পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে দেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ ও সংগ্রামী জীবনের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জনে আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী নিজ নিজ এলাকার স্কুলগুলোতে অথবা নিজেদের লেখাপড়া করা বিদ্যালয়কেই আধুনিক ডিজিটাল কনটেন্ট ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমসমৃদ্ধ করে গড়ে তোলায় সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ এবং বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘কতই বা টাকা লাগে একটা কম্পিউটার বা একটা প্রজেক্টর নিজে যে স্কুলে পড়েছেন তার জন্য কিনে দিতে। অনেকে এত বড়লোক আছেন যারা টাকা খরচ করবেন কোথায় তারও জায়গা অনেক সময় খুঁজে পান না।
>>>মানবজমিন

No comments:

Post a Comment