Thursday, February 9, 2017

‘আমাদের দিন শেষ, দোয়া করি তোমরা ভালো থাকো’

বিলু বিবি। যশোরের চৌগাছার শতবর্ষী এক হতদরিদ্র বৃদ্ধার নাম। স্বামীহারা বিলু বিবি উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নের নিভৃত পল্লীর নওদাপাড়া গ্রামের চকম আলীর স্ত্রী। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স হয়েছে ১০৯ বছর। কিন্তু গ্রামবাসী সূত্রে জানা যায়, বাস্তবে বিলু বিবির বয়স প্রায় একশ’ ২০ বছরেরও বেশি।
হত দরিদ্র এই বৃদ্ধার ভাগ্যে আজো জোটেনি সরকারের কোনো অনুদান। প্রায় ৫০ বছর আগে স্বামী হারিয়ে অসহায় জীবন-যাপন করছেন তিনি। সরকারি অনুদানের জন্য জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কেনো সহযোগিতা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। উপজেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে স্বরুপদাহ ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামের মাঝপাড়ায় এই শতবর্ষী বৃদ্ধার বাড়ি। বিলু বিবির সাথে সাক্ষাতের জন্য গিয়ে দেখা গেল- বাঁশবাগান ঘেরা সামান্য জমির উপরে ছোট একটি কুঁড়ে ঘর। সেখানে খোলা বারান্দায় দিন-রাত কেটে যায় তার। তিন বছর আগে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে বিলু বিবি পড়ে গিয়ে একটি পা ভেঙে যায় এবং কোমরে মারাত্মক আঘাত পান। তখন থেকে তেমন একটা হেটে চলে-বেড়াতে পারেন না তিনি। দিনমজুর ছেলে রেজাউল ও আতিয়ার অর্থাভাবে মাকে ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি। ব্রিটিশ শাসন থেকে বর্তমান পর্যন্ত জানা অজানা অনেক ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী এই শতবর্ষী বৃদ্ধা। স্বামী এবং একে একে ৬ সন্তানের বিয়োগ ব্যথা সহ্য করতে হয়েছে ১২ সন্তানের জননী বিলু বিবির। দিনমজুর দুই ছেলে রেজাউল ও আতিয়ার রহমানের অভাব অনটনের সংসারে খাবার ও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অতিকষ্টে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তিনি। শত বছরের বাংলার ভূখণ্ডে বসবাসকারীদের অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি এই শতবর্ষী বিধবা বিলু বিবির জীবনে। বর্তমান সরকার বিধবা ও বয়স্কদের জন্য চালু করেছে বিধবা ও বয়স্কভাতা। কিন্তু সরকারের এই সুবিধার কোনটিই তার ভাগ্যে জোটেনি। এ প্রতিবেদককে দেখে উঠে বসে জিজ্ঞাসা করলেন ‘কিডা কিছু বলতে হবে?’ শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন বিলু বিবির কথা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে নিজের মতোই বলতে থাকেন জীবনের নানা কথা। স্বামী ও সন্তান বিয়োগের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুশিক্ত হয়ে পড়েন তিনি। ইংরেজ নীল করদের অত্যাচারের কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায় তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানিরাও আমাদের ভালো চোখে দেখতো না। তাই মুজিবের ভাষণ শুনে সবাই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। কিন্তু আমাদের মতো গরীব মানষির (মানুষের) কোনো নাভ হয়নি।’ চোখ মুছতে মুছতে প্রতিবেদকের মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘আমাদের দিন শেষ, দোয়া করি তোমরা ভালো থাকো।’ সরকারি কোনো অনুদান পেয়েছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুইবার চারশ’ টাকা খরচা করে মেম্বর চৌগাছায় নিয়ে গেছিল কিন্তু কোনো টাকা দেয়নি। শুনি গরিব বুড়ো মানষির জন্যি শেখ হাসিনা সরকার অনেক কিছু দেয়। কিন্তু কই! আমি কত লোকের কলাম, কিছুইতো দিল না। আমিতো যাতি পারি না! যদি নিজে যাতি পাত্তাম তাহলে অফিসারদের বলতাম আমার ওষুধ কিনার জন্যি কডা টাকা দ্যান।’ এমন কথা বলতে বলতে ভেঙে যাওয়া পায়ে বারবার হাত দিচ্ছিলেন আর ভাঙা কণ্ঠে বললেন, ‘আর কত বলব! সবার কাছে বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গিয়েছে আর পাচ্ছিনা!’ বলে বিছানায় শুয়ে পড়েন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার শেখ বলেন, ‘আমি সবেমাত্র নির্বাচিত হয়েছি তার পরেও বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর।’ মেম্বর শিমুল হোসেন বলেন, ‘আমি নতুন নির্বাচিত হয়েছি। সুযোগ হলেই বিষয়টি দেখব। সমাজসেবা অফিসে বলা হয়েছে খুব তাড়াতাড়িই তার একটা বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করা হবে।’

No comments:

Post a Comment