জাল
স্বাক্ষরে জমির ভুয়া দলিল জামানত রেখে অর্ধকোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে
ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার ব্যবস্থাপকসহ কয়েকজন কর্মকর্তার
যোগসাজশে মেসার্স মাস্টার প্রিন্টার্সকে এ অনৈতিক সুবিধা দেয়া হয়। ব্র্যাক
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ অনিয়ম তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিক তদন্ত
প্রতিবেদনে ঋণ আবেদন ও বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় জাল কাগজপত্রের ব্যবহার হয়েছে এবং
এ ঘটনায় একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত বলে প্রমাণ মিলেছে। ব্র্যাক ব্যাংক
সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ইন্টারনাল
কন্ট্রোলার অ্যান্ড কমপ্লায়েন্সের (আইসিসি) ব্যবস্থাপক ও তদন্ত কমিটির
প্রধান লুৎফর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ১ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা
দেয়া হয়েছে। তাতে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। ঋণ বিতরণের মূল হোতা তৎকালীন
ব্যাংক কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন। তিনি এখন অন্য একাটি ব্যাংকে চলে গেছেন। তা
না হলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হতো।
তবুও ওই সময়ে চাঁদপুর শাখার ব্যবসায়
উন্নয়ন ব্যবস্থাপক (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার) ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের চাঁদপুর শাখা
ব্যবস্থাপক মো. নুরে আলম বলেন, প্রধান কার্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি এরই
মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণ হয়েছে
কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এখন প্রধান
কার্যালয় যে ব্যবস্থা নেয়, তাই মেনে নেয়া হবে বলে জানান তিনি। জানা গেছে,
২০১৩ সালে চাঁদপুর পুরাতন বাজারে অবস্থিত মেসার্স মাস্টার প্রিন্টার্স নামে
একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠানকে ব্র্যাক ব্যাংকের চাঁদপুর শাখা ৬৫ লাখ টাকা ঋণ
দেয়। এর বিপরীতে ব্যাংক জামানত হিসেবে রাখে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ জমি।
ওয়ারিশ ও মালিকানা সূত্রে এ জমির মালিক ছিলেন ৮ জন। কিন্তু মাস্টার
প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী হিসেবে ঋণ আবেদনকারী মো. শাহজাহান ভূঁইয়া ঋণ
আবেদনকালে বিভিন্ন ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন। তিনি জমির মূল্য অতি মূল্যায়িত করে
দেখান এবং বিদেশে থাকা একজন জমি মালিকের স্বাক্ষর জাল করে মোট ৩ জনের
স্বাক্ষরে বন্ধকী দলিল তৈরি করেন। এ দলিল ব্যাংকে জমা দিলে দ্রুত ঋণ
অনুমোদন করা হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জমির ৮ জন মালিক থাকা সত্ত্বেও ৩ জনের
স্বাক্ষরিত দলিলটির ভিত্তিতেই ঋণ অনুমোদন করেন। এছাড়া জমির মালিকানা নিয়ে
শরিকানদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলমান। অথচ এ বিরোধপূর্ণ জমি যাচাই-বাছাই
ছাড়াই ব্যাংক জামানত হিসেবে গ্রহণ করেছে। এতে পুরো ঋণটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে
পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাক্ষরকারী তিন জনের মধ্যে মো. শাহজাহান ভূঁইয়া ও
মো. সেলিম ভূঁইয়া এ ঘটনার মূল হোতা। যাদের সঙ্গে ব্যাংকের একাধিক
কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। অপরদিকে হারুনুর রশিদ ভূঁইয়ার স্বাক্ষরটি ছিল
জাল। কারণ ঋণ নেয়ার সময় হারুনুর রশিদ সপরিবারে সৌদি আরবে চাকরি করছিলেন। এ
বিষয়ে হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, শাহজাহান ভূঁইয়া ও সেলিম
ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঋণ দিয়েছে। দলিলে
দেয়া আমার স্বাক্ষর পুরোপরি জাল ও ভুয়া।
কারণ আমি তখন সৌদি প্রবাসী। আমার
অগোচরে এসব কিছু হয়েছে। অপর অভিযোগকারী মো. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া যুগান্তরকে
বলেন, জাল স্বাক্ষর ও জমির ভুয়া দলিল জামানত রেখে মেসার্স মাস্টার
প্রিন্টার্সকে ৬৫ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। এসব ঋণ বিতরণে কোনো
ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়নি। কারণ জমির মালিকায় ৮ জন থাকলেও স্বাক্ষর নেয়া
হয়েছে মাত্র তিনজনের। তার মধ্যে হারুনুর রশিদ ভূঁইয়ার স্বাক্ষর পুরোপুরি
জাল ও ভুয়া। অপর দুইজন অনৈতিক সুবিধাভোগী। এছাড়া জামানতের দলিলে বাকি
পাঁচজনের কোনো স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়নি। ঘটনার মূল হোতা শাহজাহান ভূঁইয়া
অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, এ ঋণ গ্রহণে সবার সম্মতি ছিল। হারুনুর
রশিদের স্বাক্ষর জাল কিনা জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি। এ
সংক্রান্ত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, জমির মালিকানায় থাকা লতিফা খাতুন
(মৃত) ও মো. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়াসহ আরও পাঁচজনের কোনো স্বাক্ষর গ্রহণ করা
হয়নি। মূলত ব্যাংকটি যাচাই-বাছাই ছাড়া যোগসাজশ করে এসব ঋণ দিয়েছে।

No comments:
Post a Comment