শ্যালিকার
দায়িত্ব নেয়ায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে দুলাভাইকে ফাঁসাল এক ভায়রা ভাই।
বোনকে দিয়ে ধর্ষণের মামলা করিয়ে গ্রেফতার করায় তাকে। পরে পুলিশ
কর্মকর্তারাও বুঝতে পারেন- মামলা ভুয়া। বিষয়টি গড়িয়েছে পুলিশের উচ্চ
পর্যায়েও। আসল ঘটনা খতিয়ে দেখতে বাদী এবং আসামিপক্ষকে তলব করেছেন ওয়ারী
বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। ডেমরা বিভাগের সহকারী কমিশনার
ইফতেখায়রুল ইসলামকে এ দায়িত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষকে যেন বুধবার (আজ)
সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে ওয়ারী বিভাগের কার্যালয়ে হাজির করা হয়। কাজলা ব্রিজ
ঢাল এলাকায় ৯৩ ‘বি’ ব্লকে থাকেন মজিবর মুন্সী (৪৮)।
সেখান থেকে রোববার রাতে
পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তার গ্রেফতারের খবর শুনে বৃদ্ধ বাবা আজিম মিয়া
গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি এখন সায়েদাবাদের আল-করিম হাসপাতালের
আইসিইউতে আছেন। আর সেই ভায়রা ভাইয়ের নাম রেজাউল করিম (৩৫)। নারায়ণগঞ্জের
সিদ্ধিরগঞ্জের এক পাওয়ার হাউজের দারোয়ান তিনি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২
সালের ১২ মার্চ রেজাউলের সঙ্গে বিয়ে হয় মজিবরের শ্যালিকা শিরিন আক্তারের।
বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে শিরিনের ওপর নির্যাতন চালায় রেজাউল। বিষয়টি
নিয়ে দুই পরিবারসহ স্থানীয়দের মধ্যে বেশ কয়েকবার দেন-দরবার হয়। কিন্তু
সুরাহা হয়নি। তাই আদালতে মামলা হয়। মামলাটি এখনও চলমান। দুই ছেলে সন্তান
নিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে শিরিন। এ অবস্থায় শিরিন ও তার সন্তানদের দায়িত্ব নেন
মজিবর। শিরিন তার দুই সন্তান নিয়ে দুলাভাই মজিবরের বাসায় ওঠেন। পাশাপাশি
মামলা পরিচালনার বিষয়েও শিরিনকে সহায়তা করেন মজিবর। এতে রেজাউল ক্ষুব্ধ হয়ে
ওঠেন মজিবরের ওপর। রেজাউল একাধিকবার বানোয়াট অভিযোগে মজিবরের বাড়িতে পুলিশ
নিয়ে আসেন। সম্প্রতি শিরিনকে অপহরণ করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ দিয়ে মজিবরকে
গ্রেফতার করতে তার বাসায় পুলিশ আনা হয়। পরে পুলিশ জানতে পারে, শিরিন নিজ
প্রয়োজনে গ্রামের বাড়ি গিয়েছেন। ওই ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মিজানুর
রহমান রেজাউলকে ভর্ৎসনা করে ফেরত যান। স্থানীয়রা জানায়, রোববার রেজাউল তার
বোন নেহারকে দিয়ে মজিবরের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা করান। মামলায় নেহার
তার নাম দিয়েছে সাথী আক্তার। স্বামীর নাম টুলি মিয়া এবং স্থায়ী ঠিকানা
ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার পাতিলঝাপ গ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তার
স্বামী যুগান্তরকে জানান, তার নাম টুলু। তিনি মুন্সীগঞ্জে থাকেন। অনেক দিন
ধরে স্ত্রীর সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই। তার স্ত্রীর গ্রামের বাড়ি
বরিশালের উজিরপুরের চকমা গ্রামে। তিনি জানান, মামলা করার অগে আমার স্ত্রী
আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিল।
আমি তাকে বলেছি, কেউ যদি তোমার ক্ষতি করে থাকে,
তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা করো। অন্যথায় কারও ক্ষতি করো না। মামলার এজাহারে
উল্লেখ করা হয়েছে, মজিবর মুন্সীর দূরসম্পর্কের আত্মীয় সাথী আক্তার। মজিবর
বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। বিদেশ যাওয়ার জন্য তিনি মজিবরকে এক লাখ
টাকা দেন। কিন্তু তিনি শিরিনকে বিদেশে পাঠাতে পারেননি। তাই শিরিন টাকা ফেরত
চাইলে মজিবর তাকে ১৬ ফেব্রুয়ারি তার কাজলার বাসায় যেতে বলেন। খালি বাসায়
এক রুমে তাকে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ছবি মোবাইলে তুলে রাখে। বিষয়টি কাউকে
জানানো হলে ওই ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হবে। তাকে বিদেশ পাঠাবে না, এমনকি
টাকাও ফেরত দেয়া হবে না। সোমবার কাজলায় গিয়ে জানা যায়, মজিবর কখনও বিদেশে
লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি একসময় ঢাকা সিলেট রোডে মিতালী
পরিবহনের গাইড হিসেবে কাজ করতেন। এখন বাড়ি ভাড়া বাবদ (চারতলা বাড়ি) যা পান
তা দিয়েই তার সংসার চলে। মজিবরের বাড়িতে গিয়ে কথা হয়, স্ত্রী আসমা বেগম,
শ্বশুর সেকান্দর আলী, শ্যালিকা শিরিন আক্তার, ছেলে আল আমিন এবং ভাড়াটিয়া
বিউটি বেগম ও নুরুজ্জামানসহ অনেকের সঙ্গে। তারা সবাই জানান, বিনা অপরাধে
এবং মিথ্যা মামলায় মজিবরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই দিন (১৬ ফেব্রুয়ারি)
বাসায় মজিবরের দুই ছেলে, এক মেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি এমনকি শিরিনও ছিল। সেদিন
সাথী বা নেহার নামে কেউ বাসায় এসেছিল বলে কেউ জানে না। আসমা বেগম জানান,
রোববার রাত ১টার দিকে এসআই মো. আইয়ুরের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ এসে তার
স্বামীকে খালি গায়ে ধরে নিয়ে যায়। তাকে শার্ট পরার সুযোগও দেয়া হয়নি। কেন
তাকে ধরে নেয়া হচ্ছে সেটাও তখন জানানো হয়নি। আল আমিন জানান, তার দাদা আজিম
মিয়া বয়সজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বাবা গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি
জানার পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। জানতে চাইলে মামলার বাদী সাথী
আক্তার বলেন, ‘যা বলার সব পুলিশকে বলেছি। মামলায় বিস্তারিত উল্লেখ করা
হয়েছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কিছু জানাতে চাই না।’ কেন নিজের বোনের পরিচয়
গোপন করে ধর্ষণের মামলা করালেন- জানতে চাইলে রেজাউল বলেন, তার বোন অনেক দিন
বিদেশে ছিল। সেখানে তার নাম সাথী। পাসপোর্ট-ভিসাতেও ওই নাম। তাই মামলায় এ
নাম দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ‘তদন্তের পরেই বুঝা যাবে- মামলার
বিষয়বস্তু সত্য না মিথ্যা। এ বিষয়ে আগে কিছু বলতে চাচ্ছি না।’ এ বিষয়ে
জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী টেলিফোনে কিছু বলতে রাজি হননি।
তবে ডেমরা বিভাগের সহকারী কমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি খুবই
সেন্সেটিভ। তাই মামলা নেয়া বা আসামি গ্রেফতারে বিলম্ব করা হয়নি। পুরো
বিষয়টি নিয়েই তদন্ত চলছে।’ যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিছুর রহমান বলেন, ‘আসামি
গ্রেফতারের পর মনে হয়েছে এজাহারের বিষয়বস্তু সঠিক ছিল না। তাই আসামি
রিমান্ডে নেয়া হয়নি।’ ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন,
‘মূল ঘটনা জানতে উভয়পক্ষকে ডাকা হয়েছে।’

No comments:
Post a Comment