নতুন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়েছে। বুধবার শপথ নেয়ার পরই
সিইসি ও চার কমিশনার তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরে নির্বাচন ভবনে এক
সংবাদ সম্মেলনে সিইসি জানান, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়াই তাদের প্রধান
চ্যালেঞ্জ। সরকার বা কোনো পক্ষের প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ, আপসহীন ও
সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। আশ্বাস দেন,
বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় আনতে কাজ করবে এ কমিশন। শপথ নেয়ার পর
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন সিইসি খান
মো. নুরুল হুদা। সার্চ কমিটির মাধ্যমে প্রস্তাব আসা ১০ জনের মধ্য থেকে গত ৬
ফেব্রুয়ারি সিইসি পদে খান মো. নুরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মাহবুব
তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.)
শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বুধবার বেলা
৩টায় সুপ্রিমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে নতুন সিইসি ও চার কমিশনারকে শপথবাক্য
পাঠ করান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা।
শপথ অনুষ্ঠানে বিচারপতি, ইসির
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কমিশনারদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তাদেরকে
নিয়ে চা-পানে আপ্যায়িত করেন প্রধান বিচারপতি। সুপ্রিমকোর্ট থেকে সরাসরি
আগারগাঁও ইসি সচিবালয় ‘নির্বাচন ভবনে’ আসনে সিইসি ও কমিশনাররা। সেখানে ইসি
সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্ ও ইসির কর্মকর্তারা তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।
নতুন কমিশনের আগমন উপলক্ষে নির্বাচন ভবন সাজানো হয়। পরে বিকাল ৫টায়
নির্বাচন ভবনের উন্মুক্ত লনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সিইসি ও চার কমিশনার।
এতে শুধু সিইসি বক্তব্য দেন। অন্য কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন, তারা কথা
বলেননি। দায়িত্ব নেয়ার পর ইসির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী- সাংবাদিকদের এমন
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের চ্যালেঞ্জ একটাই- সুষ্ঠু নির্বাচন
উপহার দেয়া। সে ব্যাপারে কাজ করা, পরিকল্পনা করা। কিন্তু কী পরিকল্পনা নেব
তা এ মুহূর্তে বলতে পারব না। আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে
নির্ধারণ করব।’ সিইসি বলেন, ‘সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের বিধান বলে নির্বাচন
কমিশনের প্রধান তিনটি দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে- রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদ
নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা তৈরি করা, ওই সব নির্বাচন পরিচালনা করা এবং
সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা। তাছাড়া
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বও নির্বাচন
কমিশনের ওপর ন্যস্ত। দেশের সব ভোটারকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার
দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর অর্পিত। অভিজ্ঞ এবং নিষ্ঠাবান নির্বাচন
কমিশনারদের সঙ্গে নিয়ে এসব দায়িত্ব পালনে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’ নির্বাচন
কমিশনের ১২তম সিইসি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন সাবেক এই আমলা। কর্মজীবনে তার
বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করে আসছে বিএনপি।
আওয়ামী লীগের একটি জেলার নির্বাচনী বোর্ডের প্রধান থাকার অভিযোগও রয়েছে তার
বিরুদ্ধে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনার সেই সম্পর্ক আছে কিনা- এমন
প্রশ্নের জবাবে সিইসি খান মো. নুরুল হুদা বলেন, ‘আজ (বুধবার) শপথ নেয়ার পর
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
যে শপথ নিয়েছি, নিরপেক্ষতার সঙ্গে
কাজ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, সেভাবেই কাজ করব।’ আওয়ামী লীগের কোনো
নির্বাচনী বোর্ডের দায়িত্বে ছিলেন না বলেও জানান তিনি। জনতার মঞ্চের সঙ্গে
সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে সিইসি বলেন, এটা ঠিক না। মিথ্যা কথা।
নির্বাচনী কাজে সরকার ও রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা চেয়ে সিইসি বলেন, ‘আমরা
সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের শপথ গ্রহণ করেছি। আমরা সংবিধান এবং সংবিধানের
অধীনে প্রণীত আইন-কানুন, বিধি-বিধানের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনে অটল এবং
আপসহীন থাকব। নির্বাচন কমিশনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারের অনুসরণীয়
দিকনির্দেশনা কাজে লাগাব এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দক্ষতা ব্যবহার করব।
তা করতে গিয়ে আমরা সরকার, সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং
জনগণের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’ দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন এ কমিশনের প্রথম
কাজ কী হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা-
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কমিশনার ও কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের
সঙ্গে আলাপ করে দেখব, বুঝব কোথায় কী সমস্যা আছে তা নির্ধারণ করা।’ সংলাপের
বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। এই
মুহূর্তে এ বিষয়ে বলার কোনো সুযোগ নেই।’ প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে সরকারের
উদ্দেশে ইসির আহ্বান কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রতি
আহ্বান, সরকার যেন প্রভাব বিস্তার না করে। সরকারের প্রভাব বিস্তারের কোনো
সুযোগ নেই। আমরা সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করব। কারও প্রভাব
বিস্তারে প্রভাবিত হব না। বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দলকে
আস্থায় আনার জন্য কাজ করে যাব। আস্থার অবস্থান অবশ্যই আমরা সৃষ্টি করতে
পারব- এ আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে।’ নির্বাচনে প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর
একটি অংশ সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও নির্বাচন প্রভাবিত
করে, তাদের জন্য কমিশনের অবস্থান কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন,
‘আমরা কঠোরভাবে দমন করব। সংবিধান ও আইন-কানুনের বাইরে কোনো রকম প্রভাব আমরা
প্রশ্রয় দেব না।’ বক্তব্যের শুরুতে সিইসি ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মার
মাগফিরাত কামনা এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সিইসি পদে নিয়োগ দেয়ায়
রাষ্ট্রপতির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আমাদেরকে
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। সে জন্য আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে
কৃতজ্ঞ।’ পূর্ববর্তী কমিশনগুলোর রেখে যাওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করবেন বলেও
জানান নতুন সিইসি। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়ার কথা রয়েছে নতুন
কমিশনের। এরপর বেলা ১১টায় নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন
তারা। এর মধ্য দিয়েই পুরোদমে কাজে নামবেন নতুন কমিশনাররা।

No comments:
Post a Comment