Tuesday, February 21, 2017

বিশ্ব মানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’

বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়- আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে, আমাদের সমাজ গতিশীল হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার বিস্তার ঘটছে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আমাদের পদচারণা বাড়ছে। আমাদের প্রতি বিশ্বের সমীহ বাড়ছে কিন্তু দেশের ভেতরে আমাদের যে মাতৃভাষার ব্যবহার তাতে কোনো কাক্সিক্ষত উন্নয়ন চোখে পড়ছে না। তার একটি কারণ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা ভাষা নিয়ে আবেগাপ্লুত হই। কিন্তু বাকি এগারো মাস ভাষার প্রশ্নে আমরা নীরব থাকি। বাংলা ভাষার বিবর্তন হচ্ছে, এই বিবর্তন যদি ইতিবাচক হতো তাহলে আমি আনন্দিত হতাম কিন্তু এর বিবর্তনে আমি দেখতে পাচ্ছি- দৈনন্দিন ব্যবহারে বাংলা ভাষার কাঠামো শিথিল হচ্ছে। বাংলা ভাষা তার সৌকর্য হারাচ্ছে। তার মধ্যে অকারণ ইংরেজি এমনকি হিন্দিরও অনুপ্রবেশ ঘটছে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, আমরা যেন ভাষাগত ঔপনিবেশিকতার সমস্যা থেকে এখনও মুক্তি পেতে পারিনি।
পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষার ওপর আরবি এবং উর্দু চাপিয়ে দেয়ার একটা প্রয়াস আমরা লক্ষ্য করেছি। রোমান হরফে বাংলা লেখার একটা চেষ্টা নিয়েছিলেন আমাদের দেশের কিছু পণ্ডিত কিন্তু আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ভাষার ঔপনিবেশিকীকরণের সে অপপ্রয়াস বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু ২০১৭ সালে এসে যখন আমরা দেখতে পাই- আমাদের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে কেন জানি আমার মনে হচ্ছে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি নিজের ভাষাকে অন্য ভাষার অধীনস্থ করে ফেলার। টেলিভিশনের টক শোতে, ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায়, শ্রেণীকক্ষের বাইরে কথাবার্তায়, অফিস-আদালতের প্রতিদিনের ব্যবহারিক চর্চায় যে বাংলা ভাষাকে আমরা দেখছি তাতে ইংরেজি ভাষার ভয়াবহ অনুপ্রবেশ এবং ইংরেজি ভাষার বিকৃতির বিপুল বিস্তার- বাংলা ভাষার ক্রিয়া পদগুলো চলে যাচ্ছে ইংরেজি ক্রিয়া পদের অধীনে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, বিশেষ্য আমরা যে কোনো ভাষারই নিতে পারি, কারণ বিশেষ্য হচ্ছে- কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নাম- সেটি ক্রমাগত বাইরে থেকে নেয়া যেতে পারে। প্রযুক্তির কারণে। ‘কম্পিউটার’ আমাদের সৃষ্টি নয়, ‘মোডেম’ আমরা বানাইনি, ‘ফেসবুক’ আমাদের নয়- এগুলোর কোনো তর্জমা করার কারণ নেই। যেমন, একজন মানুষের নামের কোনো তর্জমা হয় না, সেরকম প্রযুক্তিগত বস্তুগুলোর নাম আমরা নিতে পারি। যেমন চেয়ার-টেবিল এসব আমরা বহু আগে আত্তীকৃত করে ফেলেছি। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি, বিশেষণের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিয়া পদও চলে যাচ্ছে ইংরেজির দখলে।
এমনকি ছোট ছোট যেসব শব্দ আমরা ব্যবহার করি মনের ভাব প্রকাশের জন্য ‘কিন্তু’ বা ‘তবে’ সেগুলোও এখন ইংরেজির দখলে চলে যাচ্ছে। ভাষা দূষণ, শব্দ দূষণের কাজে ‘এফএম রেডিও’গুলো এগিয়ে আছে। আমাদের টেলিভিশনও প্রায় সমানভাবে ভাষা দূষণে শামিল হয়েছে। তার সঙ্গে প্রিন্ট মিডিয়াও ভিড়ে যাচ্ছে। এমনকি আমি দেখেছি যে, স্কুল-কলেজগুলোতেও যে-বাংলা ভাষা শেখানো হচ্ছে সেখানেও উচ্চারণ শেখাতে শৈথিল্য থাকে, উচ্চারণ বিকৃতভাবে শেখানো হয়। যে ভাষা লিখতে শেখানো হয় তাতেও শৈথিল্য থাকে। শ্রেণীকক্ষে বাংলা ভাষার এই দুরবস্থা ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় দেখেছি। বানান ভুলের কথা তো বলাই বাহুল্য। শিক্ষকরাও সেখানে অভিনিবেশ দিয়ে ভাষাটি শেখাচ্ছেন না। এটি আমি মনে করি, আমাদের জাতি হিসেবে কোথাও কোনো গৌরবের জায়গা বা অধিষ্ঠান দেবে না। আমরা যদি পশ্চিমের দিকে তাকাই- কারণ পশ্চিমই আমাদের আদর্শ- তারা কীভাবে তাদের ভাষা ব্যবহার করছে? একজন ইংরেজ বা ফরাসি যখন তার মাতৃভাষা ব্যবহার করেন তখন অকারণে তারা একটিও বিদেশী শব্দ ব্যবহার করেন না। অথচ আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে বেশি দুর্বিষহ তা হল ইংরেজির অকারণ অনুপ্রবেশ। পাঠক, আমার কথায় যদি সংশয় থাকে তাহলে যে কোনো টেলিভিশনের একটি টকশো দেখলেই উপলব্ধি করতে পারবেন। বিষয় নির্দিষ্ট যে কোনো টকশো- ধরুন, ভূমিকম্প নিয়ে কোনো টকশো দেখেন, তবে সেখানে তারা ‘ভূমিকম্প’ না বলে বলছে ‘আর্থকোয়েক’, ‘কাঁপনে’র ‘ট্র্য’মার’, ‘দুর্যোগে’র জায়গায় তারা বলছেন ‘ডিজাস্টার, ‘সমস্যা’র জায়গা তারা বলছেন ‘প্রব্লেম’, ‘সমাধানে’র জায়গায় বলবেন ‘স্যলিউশন’- এটি এত অবলীলায় বলে যায় যে যখন এটি আমাদের সন্তানরা শোনে তারা ভাবে এটিই বাংলা ভাষা। আমি মনে করি, সময় এসেছে, আমাদের সচেতন হওয়ার। আমরা যদি একুশের জন্য গর্বিতই হই আর সারা বছর যদি আমরা আমাদের নানা অর্জনের জন্য অংহকারীই হই তাহলে আমরা মায়ের ভাষার ব্যবহার চর্চায় কেন নিরহংকারী ও হীনম্মন্য হব? আরেকটা প্রবণতা লক্ষ্য করছি সম্প্রতি, ইংরেজির মতো করে বাংলা বলা। ‘আমার’ শব্দটি বলছে ‘আমাড়’- ‘ড়’ দিয়ে, যাতে সেটি ইংরেজির মতো শোনায়। ‘যেন’ বা ‘কারণ’ বলছেন ‘য্যানো’ এবং ‘ক্যারণ’ এভাবে। আমি মনে করি, যারা ইংরেজি শিখতে চায়, ইংরেজি শেখা প্রয়োজন, শুধু ইংরেজি নয়, অনেক ভাষা আমাদের শিখতে হবে। আমাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ থাকতে হবে যারা শুদ্ধ ভাষায় আরবিতে সুন্দরভাবে কথা বলতে পারবে,
কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের কেবল কাজের যোগাযোগই নেই- আত্মিক যোগাযোগ আছে। আমি চাই, স্প্যানিশ ভাষা রপ্ত করে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ব। স্প্যানিশ ভাষা অত্যন্ত সুন্দর। ফরাসি ভাষাও শিখতে হবে এবং সব ভাষাই শিখব প্রথমত এবং প্রধানত মাতৃভাষার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার পর। মাতৃভাষাকে বিসর্জন দিয়ে কোনো বিদেশী ভাষা শিখলে সেই ভাষায় আমরা বিচরণ করতে পারব না। কারণ প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব সংস্কৃতি ও কল্পনা থাকে। আমি যদি আমার ভাষার পরিপূর্ণ অধিকার ছাড়া অন্য ভাষাকে শিখতে যাই তবে তার সংস্কৃতি ও কল্পনা আয়ত্ত বা উপলব্ধি করতে পারব না। যেটা নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছেন, তিনি সমস্ত জীবন দিয়ে দিয়েছেন ইংরেজির সেবায়, ‘ইংরেজ’ হওয়ার ব্রতে কিন্তু তারও সেরা বইগুলো তাকে লিখতে হয়েছে বাংলায়। যিনি মাতৃভাষায় অত্যন্ত দক্ষ এবং কুশলী, যিনি মাতৃভাষার কল্পনা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করতে সক্ষম তিনিই যে কোনো ভাষা তত সহজে শিখতে ও আয়ত্ত করতে পারবেন। কারণ একটি কল্পনা আরেকটি কল্পনার সঙ্গে কথোপকথন করে, একটি সংস্কৃতি আরেকটি সংস্কৃতির সঙ্গে কথোপকথন করে। আমার সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে আমি বেড়ে না উঠলে, অন্যের সংস্কৃতিতে গেলে আমি উন্মূল হয়ে যাব- এই উন্মূল অবস্থাকে কেউই সম্মান করে না। তাই ভাষার মাসে আমাদের এই প্রত্যয় হোক- মাতৃভাষাকে যতভাবে পারি আমার করে নেব। মাতৃভাষার ওপর আমার অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমার ওপর মাতৃভাষার অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়- আমার ভাষার কল্পনা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আমি বিশ্বের কাছে যাব- তখন আমি অনেক সহজে বিশ্বের যে কোনো ভাষার কল্পনা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করতে পারব। আমি চাই বহু ভাষাভাষী বাঙালি হোক কিন্তু যাকে আগে মনে রাখতে হবে- ‘বিশ্ব মানব হবি যদি, কায়মনে বাঙালি হ’।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:

Post a Comment