অ্যান্টিবায়োটিক
প্রতিরোধী হয়ে পড়ায় ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে এক কোটি মানুষ মারা যাবে। নতুন
অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় থাকবে না। তখন রোগে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে কম।
জীবন রক্ষাকারী এ ওষুধটি বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ডের মতো দেশে দ্রুত
প্রতিরোধী হয়ে যাচ্ছে এর অপব্যবহারের কারণে। আন্তর্জাতিকভাবে চিকিৎসা
বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এ ব্যাপারে। তারা বলছেন, পুরনো
অ্যান্টিবায়োটিকগুলো প্রতিরোধী হয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলো অ্যান্টিবায়োটিক
গবেষণায় অর্থ ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পাইপলাইনে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক নেই।
শিগগিরই মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়বে। সিডিসি আটলান্টার মেডিক্যাল অফিসার
ড. আলেকজান্ডার কলেন বলেন, নেভাদায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক মহিলা মারা
গেছে উপসমহীন জীবাণু সংক্রমণে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তার জন্য সব ধরনের
ওষুধ ছিল কিন্তু কোনো ওষুধ কাজ করেনি। কারণ দেহের প্রতিটি সিস্টেমে ওষুধ
প্রতিরোধী জীবাণু ঢুকে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে
টেস্ট করেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিকের
আবিষ্কর্তা আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে নোবেল বক্তৃতায় বলেছিলেন,
‘ভবিষ্যতে পেনিসিলিন পাওয়া যাবে দোকানে। যে কেউ প্রয়োজনীয় এ ওষুধটি ব্যবহার
করবে। অ্যান্টিবায়োটিককে গুরুত্ব না দেয়ার কারণেই ভবিষ্যতে তা মানুষের
জন্য হুমকির কারণ হয়ে দেখা দেবে।’ তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন পেনিসিলিনের
অপব্যবহারই মাইক্রোবায়ালকে প্রতিরোধী করে দেবে। ১৯৫০ সালে নিউ ইয়র্ক
ল্যাবরেটরির গবেষণায় পাওয়া গেছে, ফার্মে মোটাতাজা করা প্রাণীর (লাইভস্টক)
খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক যোগ করায় এদের দৈহিক বৃদ্ধি দ্রুত হচ্ছে। পিএনএএস
নামক গবেষণা সংস্থার ২০১০ সালের রিপোর্টে বলেছে, লাইভস্টক উৎপাদনে
বিশ্বব্যাপী ৬৩ হাজার টন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়েছে।’ লাইভস্টক উৎপাদনে
অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার উন্নয়নশীল দেশেই বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশে
অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ফলে রোগে ভুগে কত লোক মারা যায় এর
কোনো সমীক্ষা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি আটলান্টার রিপোর্ট
অনুসারে, সেখানে প্রতি বছর ২৩ হাজার মানুষ মারা যায় রোগে অ্যান্টিবায়োটিক
কাজ না করায়। সিডিসি বলেছে, বিশ্বব্যাপী বছরে সাত লাখ মানুষ মারা যায় এ
কারণে। অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকরের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্বব্যাপী
বছরে এক কোটি মানুষ মারা যাবে রোগে ওষুধ না পেয়ে। এ কারণে আগের শতাব্দীর
রোগগুলো আবার ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১২ সালে
রিপোর্ট করেছে, বিশ্বব্যাপী যক্ষ্মার জীবাণু প্রতিরোধী (এমডিআর) হয়ে গেছে
সাড়ে চার লাখ মানুষের মধ্যে। নিউমোনিয়া ও ইকোলি ব্যাকটিরিয়া নিজেদের মধ্যে
প্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে তোলায় আরো কয়েক লাখ মানুষ মারা যাবে। সামনের দিনগুলো
হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার, সার্জন ও নার্সরাও এ হুমকি থেকে মুক্ত থাকবে না।
সাদার্ন সুইডেনের মালমো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের জোহন থ্যাম এক রিপোর্টে
বলেছেন, গত দশকে ইকালি ব্যাকটিরিয়ার দ্রুত বিস্তার ঘটেছে।
ই-কোলি তার নিজের
দেহে ইএসবিএল নামে যে এনজাইম উৎপাদন করে তা সুপরিচিত ও কার্যকর অনেক
অ্যান্টিবায়োটিককে অকার্যকর করে দিয়েছে। সুইডেনের উপশালা ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ২০ বছর ধরে সাবধান বাণী প্রচার করে আসছেন যে, এক দেশ
থেকে আরেক দেশে আসা-যাওয়ার কারণে ‘ট্যুরিস্টরা’ ওষুধ প্রতিরোধী
ব্যাকটিরিয়ার বিস্তার ঘটাচ্ছে। ২০১০ সালে উপশালা বিশ্ববিদ্যালয়ের
স্বাস্থ্যবান ১০৫ সুইডিশ স্বেচ্ছাসেবকদের থেকে প্রাপ্ত সমীক্ষায় পাওয়া
গেছে, থাইল্যান্ড ও ভারতে ভ্রমণ শেষে এদের ২৫ শতাংশ ওষুধ প্রতিরোধী
ব্যাকটিরিয়া নিয়ে সুইডেন ফিরেছে। সুইডিশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ওই সব দেশের
চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষ দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং অ্যান্টিবায়োটিক
ব্যবহারে সতর্ক না থাকায় জীবাণুটি ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা
বলছেন, ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুুর স্থান পরিবর্তন যে শুধু সাম্প্রতিক সময়ের
ঘটনা তা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এক হাজার বছর আগেও ইন্দো-ইউরোপিয়ান জাতি
ফুসফুসে আক্রান্ত করেছে এমন যক্ষ্মা রোগ ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। বিজ্ঞানীরা
বলছেন, ২০১৪ সালে জিকা ভাইরাসে ১১ হাজার ৩০০ মানুষ মারা যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী
যেভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে, সে তুলনায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধীজনিত
মৃত্যু নীরবেই রয়ে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এটাকে ‘নীরব সুনামী’ বলেই
অভিহিত করেছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে জেনারেল
প্র্যাকটিশনাররা (জিপি) রোগী অথবা অভিভাবকের চাপে অ্যান্টিবায়োটিক লিখে
থাকেন প্রয়োজন না পড়লেও। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে ভাইরাস
ইনফেকশনেও অ্যান্টিবায়োটিক দেন চিকিৎসকরা।

No comments:
Post a Comment