Wednesday, February 1, 2017

ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় অস্থির বিশ্ব

নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাক, সিরিয়া, ইরান, সুদান, লিবিয়া, সোমালিয়া ও ইয়েমেন- এই সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর ৯০ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। একই সাথে তিনি চার মাসের জন্য সব উদ্বাস্তেুর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশও স্থগিত করেছেন। সিরীয় উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা চলবে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত। নিষিদ্ধ তালিকায় থাকা মুসলিম দেশের সংখ্যা বাড়তেও পারে। বিশেষ করে পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের নাম তালিকায় যোগ হতে পারে বলে হোয়াইট হাউস থেকে আভাষ দেয়া হয়েছে। এই আদেশের ফলে কী হবে? তাৎক্ষণিকভাবে যারা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তাদের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়েছে। অনেক বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রমুখী এসব দেশের নাগরিক আটকে পড়েছেন। এ ছাড়া স্থায়ীভাবে কোটি কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লাখ লাখ পরিবার তাদের প্রিয়জনের বিচ্ছেদ-বেদনায় কাতরাবে। এটা হলো দৃশ্যমান আঘাত। এ ছাড়া যে ক্ষতি হবে, তা সম্ভবত কোনোকালেই সারবে না। সন্ত্রাস, নির্যাতনের পাশে যুক্তরাষ্ট্র আছে- এই ধারণা পুরোপুরি পাল্টে গেল চিরদিনের জন্য। যে ইরাক কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তারাও নিষিদ্ধের তালিকায় পড়ে গেল। আবার নাইন-ইলেভেনের হামলার সাথে যেসব দেশের নাগরিকদের অভিযুক্ত করা হয় সেসব দেশ কিন্তু এই তালিকায় নেই। এতে করে তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
মনে হতেই পারে, দীর্ঘ মেয়াদি কোনো লক্ষ্য হাসিলের জন্য এই কাজটি করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে আদেশ দু’টি স্থগিত হয়েছে, কিন্তু এর রেশ থাকবে অনেক দিন। এর জের ধরে অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করেছেন ট্রাম্প। নিয়োগ দেয়া হয়েছে রক্ষণশীল অ্যাটর্নি জেনারেল। ট্রাম্পের আদেশ দু’টি অবৈধ নাগরিক, এমনকি যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই, তাদের ওপরও প্রযোজ্য হবে। আদেশে এমন কথাও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের কোনো রাজ্য অভিবাসীদের সহায়তা করলে তাদেরও শাস্তি পেতে হবে। এ ছাড়া অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে শাস্তিমূলক বহিষ্কারপ্রক্রিয়া অবলম্বন এবং আটক রাখার মেয়াদ আরো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আদেশে আশ্রয় নিতে ইচ্ছুকদের প্রবেশে বাধাদানের জন্য কড়াকড়িভাবে সীমান্তনীতি কার্যকর করতে বলা হয়েছে। তার এই আদেশে ক্ষুব্ধ হয়েছে পুরো বিশ্ব। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউএস প্রোগ্রামের সহপরিচালক অ্যালিসন পার্কার বলেছেন, ‘এক বড় ধাক্কা দিয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতি তুচ্ছ- কিংবা কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজ না করা কোটি কোটি মানুষকে মারাত্মক বিপদে ফেলে দিতে পারে, মার্কিন নাগরিক পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এই আদেশ অতিরিক্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ধরপাকড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে- যা যুক্তরাষ্ট্রও শঙ্কিত, আতঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত্র সম্প্রদায়গুলোর সাথে দীর্ঘ দিন ধরে সম্পর্ক রক্ষাকারী মানুষজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’ ট্রাম্পের নীতির ফলে আইনসম্মত অধিবাসীসহ দোষী সাব্যস্ত নয় এবং যাদের সর্বোচ্চ অপরাধ তারা কেবল অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করেছে- এমন লাখ লাখ মানুষকে ঢালাওভাবে ঝুঁকিতে ফেলে দেবে। বাস্তবে এটা অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রে বেআইনিভাবে প্রবেশকারী এক কোটি ১০ লাখ মানুষের অর্ধেকের বেশিসহ অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশকারী যে কাউকে বহিষ্কার করার সুযোগ এনে দেবে। আরেকটি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প এমন সীমান্ত আইন কার্যকর করার কথা বলেছেন, যা মানুষজনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকারকে ঝুঁঁকিগ্রস্ত করবে।
এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ প্রবেশকারী মানুষদের বহিষ্কার এবং অপরাধমূলক কাজের বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পরিচিত কার্যক্রমের প্রয়োগ বাড়িয়ে দেবে। ওই আইনের ফলে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষা কামনাকারী আশ্রয়প্রার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছে, যাদের অনেকের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং সেই সাথে নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে আসা শিশুসহ বিভিন্ন মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প আরো ঘোষণা করেছেন, অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব দিতে স্থানীয় পুলিশবাহিনীর সাথেও সমঝোতায় পৌঁছাবে তার প্রশাসন। যেসব নগরী ও রাজ্য ফেডারেল অভিবাসন আইন কার্যকর সীমিত করার জন্য ‘আশ্রয়দানকারী’ নীতি প্রণয়ন করেছে, তিনি তাদেরকে ফেডারেল তহবিল স্থগিত করার নীতিও গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। এ ধরনের ব্যবস্থার ফলে সমাজগুলোকে অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলবে বলে ট্রাম্পের দাবিটিকে ভ্রান্ত এবং সেই সাথে বিপজ্জনক হিসেবে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ক্রমবর্ধমান অভিবাসনের ফলে অপরাধ বাড়ে বলে যে কথাটি বলা হয়ে থাকে, বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, তা স্রেফ মিথ, তাতে কোনো সত্যতা নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন আইন প্রয়োগে স্থানীয় পুলিশকে সম্পৃক্ত করার ফলে অনেক দেশে অভিবাসী ধর্ষণের মতো সহিংস অপরাধের মতো ঘটনার শিকারও হন। অনেকে এ কারণে পুলিশের কাছে এসব অপরাধের কথা বলতেও ভয় পান। পার্কার বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকানদের ‘প্রথম’ বানানোর জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি! কিন্তু বাস্তবে এসব পদক্ষেপ পরিবারগুলোকে একত্রে রাখা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখার মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কংগ্রেস, আদালত এবং সেই সাথে জনসাধারণের উচিত এসব পদক্ষেপ প্রতিরোধ করা ও সবার অধিকারের জন্য দাঁড়ানো। ট্রাম্পের নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের চেয়ে পশ্চিমা বিশ্বেই বরং প্রতিবাদ উঠেছে বেশি। ইরান এবং ইরান-প্রভাবিত ইরাকই মূলত প্রতিবাদ করেছে। বাকি মুসলিম বিশ্ব একেবারেই নীরব। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) খুবই দায়সারা একটি বিবৃতি দিয়েছে একইভাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ এবং আরব লিগ নীরব রয়েছে। সৌদি আরব ও মিসরের নেতারা এই আদেশে স্বাক্ষর করার পর ট্রাম্পের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
তবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তারা তার সাথে আলোচনা পর্যন্ত করেছেন- এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, বিরোধিতা করা তো অনেক পরের ব্যাপার। অথচ যুক্তরাজ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের বিরুদ্ধে একটি আবেদনে ১০ লাখের বেশি সই সংগৃহীত হয়েছে। আমেরিকার বিমানবন্দর ও এয়ারওয়েবগুলোতে পদক্ষেপটির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ উঠেছে যুক্তরাজ্যে ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফর বাতিলের দাবিতে হাজার হাজার লোক বিক্ষোভ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। একটি মার্কিন নাগরিক অধিকার গ্রুপ যে নির্বাহী আদেশের বলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, তার কিছু অংশের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ পেয়েছে। আমেরিকার বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়া লোকজনের সহায়তায় আইনজীবীরা মানবিকতা প্রদর্শনের জন্য বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করে যাচ্ছেন। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল প্রেসিডেন্টকে জেনেভা কনভেনশনের আওতায় তার দেশের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে অবগত করেছেন। ফ্রান্স ও কানাডা উভয়েই পদক্ষেপটির সমালোচনা করেছে, আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আইনপ্রণেতারাও এর সমালোচনা করেছেন। জার্মানি ও ফ্রান্সের পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

No comments:

Post a Comment