বাবুল
আক্তারই তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করেছে। বহুল আলোচিত সাবেক
পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুলের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন ও শাশুড়ি শাহেদা মোশাররফ
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার
কামরুজ্জামানকে মিতু হত্যার বিষয়ে রোববার এ কথা জানিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের ৯
মাস পর একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন মিতুর ছোট বোন শায়লা মোশাররফ নিনজাও। তারা
তিনজনই রোববার রাজধানীর বনশ্রী বাসায় দীর্ঘ সময় কথা বলেন তদন্ত কর্মকর্তার
সঙ্গে। তাদের বক্তব্য রেকর্ড করার পাশাপাশি লিখে নেন তদন্ত কর্মকর্তা। এসব
বক্তব্য নিয়ে সোমবার রাতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রওনা দেন কামরুজ্জামান।
চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়ার আগে রামপুরার একটি হোটেলে সন্ধ্যায় এ পুলিশ
কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় যুগান্তর প্রতিবেদকের। তদন্তের স্বার্থে তিনি
বিস্তারিত কিছু বলতে না চাইলেও জানান, ঢাকা থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেসব
চট্টগ্র্রামে গিয়ে যাচাই করা হবে। এরপর সেখানেই তলব করা হবে বাবুল
আক্তারকে। বাবুলের শ্বশুর-শাশুড়ি সোমবার যুগান্তরকে জানিয়েছেন,
তারা তদন্ত
কর্মকর্তার কাছে মিতুর হত্যাকারী হিসেবে বাবুলের নামই বলেছেন। তারা আরও
জানান, নিনজাও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তাকে। সোমবার রাতে
বনশ্রীর বাসায় যুগান্তরের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন বাবুলের শ্বশুর ও
শাশুড়ি। এদিন বিকালে বাবুল তার ফেসবুক পেজে ‘সবাই বিচারক, আর আমি
তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই খুনি’ শীর্ষক এক স্ট্যাটাস দেন। এ স্ট্যাটাসের বিষয়ে তার
শাশুড়ি শাহেদা মোশাররফ বলেন, ‘বাবুল যে একটা খারাপ লোক এটা তার স্ট্যাটাসের
মাধ্যমেও প্রমাণিত হল। বাবুলের ফেসবুক স্ট্যাটাস আমি পড়েছি। এটা পড়ে হাসি
পাচ্ছে। যে ব্যক্তিটি আমার মেয়ের কোনো ভরণপোষণ দিত না, যার স্ত্রীর
কাপড়-চোপড় আমি কিনে দিতাম, স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের পর যে লোকটি অন্য পুলিশ
নিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে নিজেও আমার বাসায় টানা ছয় মাস থেকেছে- এক কেজি চালও
কেনেনি, তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাইব কীভাবে? আমি পাগল না যে, মৃত মেয়ের বাড়ি
থেকে সবকিছু লুট করে নিয়ে আসব। বিয়ে দেয়ার জন্য আমার কোনো মেয়ে নেই। আমার
দুটি মেয়ে। একটি মেয়েকে (মিতু) সে মেরে ফেলেছে। আরেকটি মেয়ে শায়লা মোশাররফ
নিনজাকে তিন বছর আগে বিয়ে দিয়েছি বিসিএস পাস ডাক্তারের কাছে। তার স্বামী
সাইদুর রহমান এখন মুগদা জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত। নিনজা এবার
ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। নিজের বিয়ের
উপযুক্ত কোনো মেয়ে থাকলেও বিশ্বাস করা যেত যে, শ্যালিকাকে বিয়ে না করার
জন্যই আমরা এখন তার বিরুদ্ধে কথা বলছি।’ এতদিন কেন আপনারা বাবুল আক্তারের
পক্ষে কথা বলেছেন জানতে চাইলে বাবুলের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে
বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই অনেক কিছু জানতাম। হাতে উপযুক্ত প্রমাণ ছিল না।
মনে
করেছিলাম পুলিশ তদন্ত করেই সবকিছু বের করবে। ছোট্ট নাতি ও নাতনির ভবিষ্যতের
কথা চিন্তা করে এতদিন আমরা তার পক্ষেই ছিলাম। এখন যেহেতু আমরা নাতি-নাতনির
মুখও দেখতে পারছি না। বাবুল তার আচার-আচরণের মাধ্যমে সব সীমা অতিক্রম করে
ফেলেছে, তাই বাধ্য হয়ে মুখ খুলেছি।’ শাহেদা মোশাররফ বলেন, ‘আজ আমার নাতি
আক্তার মাহমুদ মাহিরের (৮) জন্মদিন (সোমবার)। মাহির ও নাতনি তাবাচ্ছুম
তানজীন টাপুর (৫) উভয়ের জন্যই গিফট কিনেছি। মসজিদে মিলাদ দিয়েছি। কিন্তু
তাদের দেখতে যেতে পারছি না। অথচ গত বছরের ৫ জুন মিতু হত্যাকাণ্ডের পর গত ৮
ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ছয় মাস তারা আমাদের বাসাতেই ছিল। আজ বাবুলকে অনেকবার
ফোন করেছি। সে ফোনও ধরছে না, মনে করেছিলাম সন্ধ্যার পর তার মগবাজারের
নাহার ভিলার বাসায় যাব। কিন্তু ফেসবুকে তার স্ট্যাটাস দেখে ঘৃণা ও ভয়
হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তার বাসায় গেলে মিতুর মতো আমাদেরও হত্যা করা হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদদ্বীন হাসপাতালে চাকরি পাওয়ার পর ৮ ডিসেম্বর আমাদের বাসা
থেকে নাহার ভিলায় গিয়েই উৎসবমুখর পরিবেশে নিজের জন্মদিন পালন করে বাবুল।
ওইদিন ওই বাসা থেকে কেঁদে কেঁদে বের হয়েছিলাম। এরপর আর ওই বাসায় যাইনি।’
বাবুলের শাশুড়ি আরও বলেন, ‘নাতি মাহিরকে বনশ্রী আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি
করেছিলাম। নাতনি টাপুরকে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু বাবুল তাদের জোর করে এ
বাসা থেকে নিয়ে গিয়ে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে ভর্তি করে। গত ডিসেম্বরে
চট্টগ্রামে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে কিছু সত্য কথা বলি। এর পর থেকেই
বাবুল আমাদের মহাশত্রু মনে করছে। আমরাই পুলিশকে বাবুলের পরকীয়া প্রেমিকা
বর্নির কথা জানিয়েছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে মিতুর মা বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই
বাবুল আক্তার নির্যাতন করত মিতুকে। হত্যাকাণ্ডের দুই মাস আগে বাবুলের বোন
লাবণী মিতুকে ফোন করে বলে, বর্নি নামের এক মেয়ের সঙ্গে বাবুলের বিয়ে ঠিক
করা হয়েছে। তখন আমরা বর্নিকে চিনতাম না। অথচ এর দু’বছর আগে থেকেই বর্নি
বাবুল আক্তারদের মাগুরার বাসায় অবস্থান করত। বিষয়টি মিতু আমাকে ফোনে জানালে
আমি তাকে লাবণীর সঙ্গে আর কথা বলতে নিষেধ করি।’ মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ
দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের এক মাস আগে থেকে বাবুল আলাদা ঘরে তার ছেলে-মেয়ে
নিয়ে ঘুমাত। মিতুকে রাখত একা ঘরে। পৃথক ঘরে বাবুল সারা রাত ফোনে কথা বলত।
ফেসবুক চালাত। বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কর্মকর্তাকে
জানিয়েছি- পরকীয়ার কারণেই বাবুল আক্তার মিতুকে হত্যা করেছে। একজন স্বামী,
একজন পুলিশ কর্মকর্তা এমনকি বাদী হিসেবে মামলার তদন্ত নিয়ে তার (বাবুল)
কোনো আগ্রহ ছিল না, এখনও নেই। দীর্ঘদিনে এ নিয়ে বাবুল কোনো কথা বলেনি।
তার এ
নীরবতাতেই বোঝা যায় যে, সে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত। বাবুলকে পুলিশ ধরে নিয়ে
১৫ ঘণ্টা কোথায় রেখেছিল। তখন তাদের সঙ্গে বাবুলের কী কথা হয়। এসব বিষয় এখনও
গোপন রেখেছে বাবুল।’ এক প্রশ্নেব জবাবে তিনি বলেন, ‘লিখিত বক্তব্যে আমরা
পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ জানতে চেয়েছি। কেন কী কারণে, কারা এ
হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা আমরা বারবার জানতে চাইলেও কেন বাবুল আক্তার জানতে
চাচ্ছে না- এসব বিষয়েও জানতে চেয়েছি লিখিত বক্তব্যে।’ তিনি দাবি করেন,
বর্নির স্বামী নিহত হওয়া ও মিতু হত্যাকাণ্ড এক সুতায় গাঁথা। কারণ, বাবুল
বর্নিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এ ক্ষেত্রে বর্নির জন্য বাধা ছিল তার এসআই
স্বামী আকরাম। আর বাবুলের জন্য বাধা ছিল স্ত্রী মিতু। তাই ষড়যন্ত্র করে
দু’জনকেই দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া হয়। তিনি জানান, ২০১৫ সালে জানুয়ারি
মাসে ঝিনাইদহে নিহত হন এসআই আকরাম। ডাক্তারি রিপোর্টে আকরামের গায়ে ধারালো
অস্ত্রের আঘাতের কথা বলা হলেও আকরাম নিহত হওয়ার বিষয়টি সড়ক দুর্ঘটনা বলে
চালিয়ে দেয়া হয়। মিতু হত্যায় বাবুলকে যেন কোনোভাবেই সন্দেহ করা না হয়
সেজন্য নানা ছলচাতুরী করেছে বাবুল। হত্যার ঘটনা চট্টগ্রামে ঘটে। তখন তিনি
ছিলেন ঢাকায়। এটাও তার একটি কৌশল। বাবুল আক্তারের শ্বশুর বলেন, ‘বাবুল কেন
পুলিশের চাকরি ছেড়েছে? তাকে কী অন্যায়ভাবে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে?
তার প্রতি অন্যায় করা হলে কেন চাকরি ফিরে পেতে আবেদন করছে না? এসব বিষয়ে
মানুষ জানতে চায়। আমরা জানতে চাই। কিন্তু তার কাছ থেকে জবাব পাওয়া যাচ্ছে
না। এমনকি পরকীয়া প্রেমিকা বর্নির বিষয়েও সে কিছু বলছে না। ছেলে মাহির ও
মেয়ে টাপুরকে নিয়ে কেন কৌশলে বাবুল আমাদের বাসা ছেড়ে গেল? এখন কেন আমাদের
সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে না- তাও জানতে চাই। এখন বাবুলের বক্তব্য শুনে মনে
হচ্ছে আমরাই আমাদের মেয়েকে হত্যা করেছি।’ বাবুলের শাশুড়ি শাহেদা মোশাররফ
বলেন, ‘মিতু হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত অনেক পেপার কাটিং আমাদের বাসায়
রেখেছিলাম। বাসা থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসী কামালের মাধ্যমে ওইসব পেপার
কাটিং চুরি করে নিয়ে গেছে বাবুল। বাবুল এখন আমাদের বাসার পরিবেশ নিয়ে
প্রশ্ন তুলেছে। এ বিষয়ে আমাদেরও অনেক প্রশ্ন আছে।
বাবুল যখন মিতুকে বিয়ে
করে তখন সে ছিল বেকার। বিয়ের পর এ বাসায় থেকেই চাকরির প্রস্তুতি নেয়।
প্রথমে চাকরি নেয় ন্যাশনাল ব্যাংকে। এরপর বিশ্বব্যাংকে। ২০০৫ সালে পুলিশে
চাকরি নেয় এ বাসায় অবস্থান করা অবস্থায়। আমাদের বাসায় যদি স্টার জলসা দিয়ে
দিনের শুরু হয় তাহলে সে কিভাবে এখানে চাকরির প্রস্তুতি নেয়ার পরিবেশ পেল?
কিভাবে আমার ছোট মেয়ে মেডিকেলে পড়ালেখা করছে? কিভাবে বাবুলের অন্তত ১০ জন
বন্ধু এ বাসায় থেকে-খেয়ে বিসিএস অফিসার হয়েছে?’ শাহেদা মোশাররফ আরও বলেন,
‘মিতুর তো কোনো শত্রু ছিল না। তাহলে কেন কারা কী কারণে মিতুকে হত্যা করল?
আমরা জানতে চাই- স্ত্রী হত্যার ক্লু উদ্ঘাটনে বাবুল কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে কেন তার আগ্রহ নেই?’ এক প্রশ্নর জবাবে বাবুলের
শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার তো মনে হয় হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ঘাটন হয়ে
গেছে। বাবুল নিজেও তা জানে। কৌশলগত কারণে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তদন্তে
পুলিশ কী পেয়েছে বা কী পায়নি- সবই বাবুল জানে। সন্দেহভাজন খুনি মুসা ও কালু
বাবুলেরই সোর্স ছিল। তারা এখন কোথায় আছে তাও হয়তো বাবুল জানে।’ এসপি বাবুল
আক্তারের শ্বশুর-শাশুড়ির বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সোমবার বিকালে বাবুল
আক্তার বলেন, ‘আমার যা বলার তার সবই সোমবার ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ
করেছি। এ বিষয়ে আপনার কোনো কোয়ারি থাকলে পরে যোগাযোগ করতে পারেন।’ সন্ধ্যায়
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপকমিশনার কামরুজ্জামান বলেন, ‘গত
ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে গিয়ে বাবুলের শ্বশুর এবং শাশুড়ি তাদের বক্তব্য
দিয়েছেন। ঢাকায় এসেছি বাবুলের শ্যালিকা শায়লা মোশাররফের বক্তব্য নিতে। তার
বক্তব্য পাওয়া গেছে। বাবুলের শ্বশুর-শাশুড়িও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
দিয়েছে। সবই চট্টগ্রামে গিয়ে যাচাই করা হবে। এরপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া
হবে। তদন্তের স্বার্থে এসব নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না।’ এক
প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মিতু হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার
করা হয়েছে। এর মধ্যে ওয়াসিম ও আনোয়ার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। কালু ও
মুসাকে গ্রেফতার করতে পারলেই সব রহস্যের জট খুলে যাবে। অপর এক প্রশ্নের
জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় মামলার বাদীও আসামি হয়ে যায়। মিতু
হত্যার বাদী বাবুলকে আসামি করা হবে কি-না এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার
সময় এখনও আসেনি। যদি তাকে মামলায় আসামি করা হয় তাহলে অবশ্যই তাকে গ্রেফতার
করা হবে। তবে সময়ই সব বলে দেবে। এদিকে সোমবার রাজধানীর মিরপুরে এক
অনুষ্ঠানে পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক বলেন, বাবুলের বিষয়টি এখনও
অস্পষ্ট। যথেষ্ট তথ্য না পওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হবে না। মুসাকে
পাওয়া গেলেই পরিষ্কার হবে- মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুলের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু।

No comments:
Post a Comment