Monday, February 13, 2017

ইসির নিরপেক্ষতায় বড় বাধা রাজনীতিকরণ

অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতাসীন দলগুলো নিজেদের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে রাজনীতিকরণ করছে। কমিশনে নিয়োগ থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে দলীয় রাজনীতির ছোঁয়া বিদ্যমান। কমিশনের শীর্ষ পর্যায়সহ অন্যান্য পদে নিয়োগপ্রাপ্তরাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। আইন থাকার পরও তারা ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না। এসব কারণে অধিকাংশ নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ ব্যবস্থাগুলোই অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এখন অনেকটাই স্বাধীন। তবে এই স্বাধীনতার কতটুকু প্রতিফলিত হবে তা নির্ভর করছে ব্যক্তির ওপর। ব্যক্তি যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায়, আইন সেখানে বাধা নয়।’ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশনের চেয়ে আমাদের কমিশনের ক্ষমতা বেশি। তাদের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। আমাদের কমিশন বিধি প্রণয়ন করতে পারে। কিন্তু তাদের কমিশন নিরপেক্ষ। আমাদেরটা দলীয় মোড়কে আবৃত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনীতিকরণ। সরকারি দলের চাপ। এই রাজনীতিকরণই এখন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ৪৫ বছরেও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) হয়নি। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় আসার আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়েই তারা এই প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে উল্টো আরও নির্বাচন কমিশনকে দলীয় মোড়কে আবৃত করছে। ১৯৯০ সালে তিন জোটের রূপরেখায় অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা ভুলে যায়। উল্টো ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আয়োজন করে তারা পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই বিতর্কিত করে। বিশ্লেষকরা বলেন, বিএনপিকে অনুসরণ করে একই পথে হাঁটতে শুরু করে আওয়ামী লীগও। দলটি ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত’ রাখার অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগই চোখে পড়েনি। ক্ষমতায় যাওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগও বিএনপির মতো উল্টোপথেই হেঁটেছে। একই সঙ্গে ইসিতে নিয়োগপ্রাপ্তরাও ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তারাও বেশির ভাগ সময় ক্ষমতাবানদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সময় পার করেছেন। ফলে কার্যকর স্বাধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গড়ে ওঠেনি। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য প্রয়োজনী আইনি ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া আছে। প্রয়োজন শুধু সাহসিকতার সঙ্গে কাজটি করা।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন রয়েছে। অভাব শুধু আন্তরিকতার। এজন্য সুস্পষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজনও বলে মনে করেন তারা। এগুলো হচ্ছে- কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ক্ষমতা। দলনিরপেক্ষ, যোগ্য, স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগদান। সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান। রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের সদাচরণ এবং আইন মেনে নির্বাচন কমিশনকে সব রকম সহায়তা করা। সংশ্লিষ্টরা জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) দেশের মূল নির্বাচনী আইন। ২০০৭-২০০৮ সালের ২ বছরে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরপিওর ব্যাপক সংস্কার করা হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে বেশকিছু সংস্কার আনা হয়। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে এবং প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। কমিশনের অধীনে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আসে। ওই সময়ই নির্বাচন কমিশন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে অধ্যাদেশ জারি করা হয়, পরে তা আইনে রূপ দেয়া হয়। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ নেয়। তারা বিদায় নেয়ার পর নির্বাচন কমিশন আবারও দলীয় মোড়কে আবৃত্ত হতে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর হাত ধরে।
সেই ধারা এখনও চলছে। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় দেশের প্রধান প্রধান দলগুলো নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে তারা সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে। উল্টো আরও কমিশনকে দলীয় মোড়কে আবৃত্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে তারা। এর মধ্য দিয়ে আসলে রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই কথা দিয়ে কথা রাখেননি।’ এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সময় থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী এবং সক্ষম করার কথা বলে আসছে। কিন্তু কমিশনকে শক্তিশালী করার কোনো উদ্যোগ কারও পক্ষ থেকেই নেয়া হয়নি। বরং কমিশন নিজে এবং সরকারও নানা সময়ে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে দুর্বল করারই প্রচেষ্টা চালিয়েছে।’ অভিযোগ রয়েছে, দলীয় পছন্দের লোকজন দিয়ে নির্বাচন কমিশন সাজানোর কারণে নির্বাচন নানা সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যখন যে সরকারের অনুগত কমিশন থাকে, তারা তখন সেই সরকারের পছন্দের প্রার্থীর জয়ের পক্ষেই ভূমিকা রাখে।
এটা শুধু দলীয় সরকারের ক্ষেত্রেই নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোরও সময়ও এমন নজির দেখা গেছে। সে সময়ও নির্বাচন কমিশন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পছন্দের লোকজনের পক্ষে কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এবারও নির্বাচন কমিশন দলীয় ও পছন্দের লোকজনকে দিয়ে সাজানো হয়েছে বলে ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছে বিএনপিসহ তাদের শরিকরা। পর্যবেক্ষকরা বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে দলীয় মোড়কের কমিশন দিয়ে নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু করা যাবে তা নিয়ে ভাবতে হবে।’ সাধারণ মানুষও মনে করেন, এবারও তাদের আশা অনুযায়ী নিরপেক্ষ কমিশন গঠিত হয়নি। দলের বাইরে গিয়ে এ কমিশন কতটা কাজ করতে পারবে সে প্রশ্নও অনেকের মনে। এ অবস্থায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে চলছে নানা মহলে আলাপ-আলোচনা। নির্বাচনের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা কমিশনের অধীনে চলে যান। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও কমিশনের অধীনে থাকে। নির্বাচন অনুষ্ঠান, বাতিল- সব ক্ষমতা কমিশনের হাতে। অনিয়ম বা কারচুপির অভিযোগ থাকলে তাও খতিয়ে দেখার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু অতীতের মতো কমিশন দিয়ে ভোট কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে- তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘সিইসি হিসেবে যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তিনি ১৯৭৩ সালের বিশেষ ব্যাচের সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। আর্থিক সততা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও,
বর্তমান সিইসির বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তিনি চাকরিতে থাকাবস্থায় গত সরকারের আমলে নানাভাবে বঞ্চিতও হয়েছেন। এমন ব্যক্তিকে নিয়োগের স্বচ্ছতা, এমনকি নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ বলেই মনে হয়েছে।’ তারা বলেন, ‘যথার্থ আইনি কাঠামো প্রণীত এবং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হলেও, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কমিশনের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। বস্তুত, যে কোনো স্বাধীন দেশে একমাত্র সরকারই স্বাধীন এবং সরকার না চাইলে কারও পক্ষেই স্বাধীনভাবে কাজ করা প্রায় অসম্ভব। তারা বলেন, যেখানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা করা হয় না। প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ব্যাপক দলীয়করণ বিদ্যমান। সেখানে সরকার বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা খর্ব করতে পারে। ‘এমএ সাঈদের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনকে বেতন-ভাতার জন্য উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। এমনকি গত সরকারের আমলে কমিশনারদের পুলিশ এসকর্ট আংশিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এখনও কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নেই। টাকার জন্য তাদের অন্যজনের কাছে ধরনা দিতে হয়। লোকবল দেয় আরেকজন। লোকবল নিয়োগের ক্ষমতাও কমিশনের নেই। এ থেকেই বোঝা যায়, আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীনতা ভোগ করে বা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।’

No comments:

Post a Comment