এক
বন্ধু বছর খানেক আগে বলেছিল, বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানানোর
জন্য কার্ড খুঁজে পেতে হয়রান হতে হয়। দোকানে প্রেমের কার্ড খুঁজলে পাওয়া
যায় অঢেল। কথা মিথ্যে নয়, সেদিন জানলাম। স্ত্রীর জন্মদিনের শুভেচ্ছা
জানানোর জন্য কার্ড খুঁজতে গিয়ে দেখি, পছন্দের সুযোগ নেই, আছে মাত্র দু-চার
রকম। বিক্রেতা বিষণ্নবদনে বলেছিল, চাহিদা কম। আজকাল নিত্যনতুন দিবসের কথা
শুনি। বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস ইত্যাদি ইত্যাদি। দিবসের নাম অশেষ।
সবচেয়ে মাতামাতি চোখে পড়ে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নিয়ে। এ মাসের ১০ তারিখে
একটা নতুন দিবসের নাম শুনেছি। টেডি ডে। সেটা আবার কী?
তেমন প্রশ্ন করিনি।
বুঝে নিয়েছি তুলো আর কাপড়-টাপড় দিয়ে বানানো টেডি বেয়ার বা যারা পুতুল ভালুক
ভালোবাসে ওই দিনটা তাদের জন্য। সব দিনের যদি এক একটা নাম থাকে অসুবিধা কী!
জীবনের প্রত্যেকটা দিন তাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যা প্রতিদিনের তা
হয়ে যায় ডাল-ভাতের মতো। নামেই যদি সব দিনকে পোলাও-কোর্মার মতো বিশেষ
বানিয়ে ফেলা যায় তা বিশেষভাবে উপভোগের ও আনন্দের হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে পালনের
তাগিদ মনে থাকলে মনও ভালো একটা কাজ পেয়ে যায়। মন ভালো থাকে। মনের
স্বাস্থ্য ভালো থাকে। মন মহাশয়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মানুষও হাতে পায়
উত্তম জীবন। শুধু দিন বেছে যাপনের জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ায় আনন্দ হয়তো
মেলে, তা আত্মসম্মান অটুট রাখে কি? বিশ্ব ভালোবাসা দিবস দোরগোড়ায়। লক্ষ মনে
উদ্যাপনের আকাক্সক্ষা, অস্থিরতা আর মহা উত্তেজনা। একটা বিশেষ দিনকে নিয়ে
নিজেকে, মনকে কি বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়? প্রিয়জনের জন্য কার্ড কেনা,
উপহার ক্রয়, তার সঙ্গ উপভোগের আনন্দ এ সবই থাকে। কতসংখ্যক মনে নতুন
নতুনভাবে নিজেকে প্রকাশের আগ্রহ থাকে?
ভালোবাসি। বিষয়টা আনন্দের। গৌরবেরও।
ভালোবাসার অনুভব আনন্দ জোগায়। কিন্তু ভাগ্যে জুটেছে বলে তা গৌরবের বলে
বিবেচনা করা বোকা বোকা ঠেকে। ভাগ্যে যা জুটেছে তা ভাগ্যের দান। প্রাপ্তির
জন্য নিজের ভূমিকা ও যোগ্যতা কতখানি সে হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা
পাওয়ার জন্য ভালোবাসা ধারণ করার জন্য, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধির জন্য নিজেকে
তৈরি করাই আসল কাজ। নিজের প্রতি নিজের প্রধান কর্তব্য। প্রার্থনার জন্য
প্রস্তুতি প্রার্থনা-পূর্ব কর্তব্য। গলা থাকলেই গান হয় না, সুর সাধনের
প্রয়োজন রয়েছে। হাত-পা আছে তাই নৃত্য, ছবি আঁকা হয় তেমন নয়। চর্চার প্রয়োজন
রয়েছে। পূর্ণ মনোসংযোগ, নিবেদন ও নিষ্ঠা বিনা হয় না কিছুই। এককালে
ভালোবাসার জন্য গান শোনা, কবিতা পাঠ, সাহিত্যে ডুবোডুবি ইত্যাদির অভ্যাস
জনে জনে ছিল। সমৃদ্ধ একটা মনকে অন্য মনের উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়ার জন্য সুর,
সাহিত্য, গীতে ডুব মেরে মনিমানিক্য তুলে এনে সেসবে পত্র সাজানো হতো।
মুগ্ধতা অর্জনের, ভালোবাসার ঘনত্ব বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া তখন ছিল প্রবল। এখন
সময় বদলেছে। প্রকাশের ঢংও বদলেছে অনেক। দোকানিরা এখন ভালোবাসার শ্রী
বৃদ্ধির জন্য নানান পসরা সাজিয়ে ভালোবাসায় বিনিয়োগের পথ খুলেছেন। দোকান
বুঝে ঢুকে পড়ে প্রিয়জনকে যেমন উপহার দেয়ার সাধ, খুঁজে নেয়া যায়। ভালোবাসার
উচ্চতা, গভীরতা, সৌন্দর্য বোঝানোর কথা লেখা উচ্চমূল্যের চমৎকার চমৎকার
শুভেচ্ছাপত্র বা কার্ড থাকে। সেগুলোয় যা লেখা আছে শুধু পড়ে দাম দিয়ে অতি
সহজে নিজের করে নেয়া যায়। মন চাইলে একটার বদলে এক গাদা উপহারও বেছে নেয়া
সম্ভব। গাঁট থেকে কত ব্যয় হয়ে গেল তার হিসাব কষে মনে মনে খানিকটা ফুর্তি
ফুর্তিভাবের ছটফটানি পাওয়া যায়। তা গৌরবদানও করে। পয়সা ব্যয় করে গৌরব মেলে
বলে নিজের শুদ্ধ আবেগ প্রকাশের সামর্থ্য থেকে যায় নেপথ্যে। ভালোবাসা দিবস
শেষে কার কোন ভূমিকা, ভাষা,
প্রকাশে এ দিন বিশেষ হিসেবে জীবনে এসেছিল তার
হিসেব কষা কি হয়, হবে? কেনাকাটায় ভালোবাসা দিবস প্রকাশের সংস্কৃতির পাল্লায়
পড়ে কেমন আছে ভালোবাসা? জীবনে ভালোবাসা যদি মেলে তা পরম প্রাপ্তি। সে
সৌভাগ্যকে বিশেষ ভেবে যারা ভালোবাসাকে অশেষ ও আকর্ষণীয় এক ভ্রমণ বিবেচনা
করে সম্মান দেখায়, যারা তার রূপ-রস আবিষ্কারে সদা সচেষ্ট থাকে, ক্লান্ত হয়
না, ভালোবাসা তেমন হৃদয়েই বাড়ি বানায়, বাগান সাজায়। ভালোবাসার গৌরব অর্জন
বলে ভাবতে পারে তেমনই হৃদয়। অসংখ্য বিশেষ দিন জীবনে থাকুক। বিশেষ হয়ে থাকুক
বিশ্ব ভালোবাসা দিবসও। বিশেষ করে তোলার চেষ্টায় ভালোবাসা বিকশিত হোক।
অর্থের বিনিময়ে ভালোবাসার প্রকাশ থাকুক, পাশাপাশি জানা হোক হৃদয় কতখানি
সামর্থ্যবান। হৃদয় দিয়ে ভালোবাসাকে অনুভব ও প্রকাশের চেষ্টা যেখানে,
সেখানেই ভালো থাকে ভালোবাসা। দুর্লভের জন্য চাই সাধনা। সহজ চর্চার পথ মানে
ফাঁকি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘দুর্লভ জিনিসের সুখসাধ্য পথকেই
বলে ফাঁকির পথ।’ আত্মপ্রতারণা নয়, আত্মপ্রেরণা দিক বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।

No comments:
Post a Comment