Wednesday, February 1, 2017

যুগান্তর কাদের কাগজ?

যুগান্তর আঠারো বছরে পা দিল। আঠারো বছর আগে ভাষা আন্দোলনের মাসের প্রথম দিনটিতেই যুগান্তরের জন্ম। ফলে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাসের গন্ধ জন্ম থেকেই যুগান্তরের শরীরে জড়িত। যুগান্তর তাই যুগের হুজুগে মাতেনি। নিরপেক্ষতায় নামার্জন গায়ে পাঠকদের প্রতারিত করতে চায়নি। পত্রিকাটি দল-নিরপেক্ষ, কিন্তু মত-নিরপেক্ষ নয়। দেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির মতাদর্শে যুগান্তর দীক্ষিত। পত্রিকাটির সাংবাদিকতায় অনেক ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু এ একটি ক্ষেত্রে তার কোনো দ্বিধা ও আপস নেই। যুগান্তরের জন্মলগ্ন থেকে আমি কলামিস্ট হিসেবে এর সঙ্গে জড়িত। পত্রিকাটির সম্পাদক কয়েকবার বদলেছেন।
কিন্তু নীতি বদলায়নি। দেশের আরও কয়েকটি দৈনিকের মতো ‘যুগান্তরে’ লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমার লেখায় সম্পাদকীয় কোনো হস্তক্ষেপ নেই। অন্য একটি তথাকথিত দৈনিকে যে হস্তক্ষেপটি অহরহ সহ্য করতে হতো এবং শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে ওই দৈনিকে লেখাই ছেড়ে দিতে হল। ভাবতে বিস্ময় লাগে। যুগান্তরের সতেরো বছর বয়স পার হল। আর আমিও এ কাগজটিতে সতেরো বছর ধরে লিখছি। যতদিন বেঁচে আছি এবং লেখার শক্তি আছে, ততদিন হয়তো লিখব। যুগান্তরের সম্পাদনা পরিষদের সবাই তরুণ এবং আমার পরিচিত। সম্পাদক সাইফুল আলম সম্পাদনায় মুনশিয়ানার পরিচয় দিচ্ছেন। সম্পাদকীয় পরিষদের সিনিয়র সদস্য মাহবুব কামালের ধারালো লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। যায়যায়দিন এবং চলতিপত্র নামে দুটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিকে তার ক্ষুরধার লেখনি আমাকে মুগ্ধ করত। এখন যুগান্তরেও তার লেখা বেরোয়। এককালে ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার শিশু-কিশোরদের পাতা চাঁদের হাটের পরিচালক রফিকুল হক দাদুভাই নামে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তিনিও এখন যুগান্তরে কর্মরত। এক কথায় যুগান্তর পরিবারের সঙ্গে আমার একটা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা আছে। ‘যুগান্তর’ বাংলাদেশের একটি প্রথম শ্রেণীর জাতীয় সংবাদপত্রের মর্যাদায় উন্নীত হওয়া এবং সতেরো বছর ধরে সেই মার্যাদা ধরে রাখা পত্রিকাটির সকল সাংবাদিকতার প্রমাণ। যুগান্তরের মালিক একজন সফল ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি। কিন্তু ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্লুরালিজমের প্রতি বিশ্বাস কাজ করে বলে আমার ধারণা। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন এক সময় ক্ষমতায় ছিল এবং অগণতান্ত্রিক কার্যক্রম দ্বারা বাংলাদেশকে বিরোধী দলশূন্য করার চেষ্টা চালিয়েছিল, তখন বিএনপি থেকে বেরিয়ে ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী একটি নতুন বিরোধী দল গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। বিএনপির অভিযোগ, যুগান্তরের সত্বাধিকারী নুরুল ইসলাম এ চেষ্টার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সম্ভবত এ জন্যই তাকে নানা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে ঢুকিয়ে দীর্ঘদিন হয়রানি করা হয়েছিল।
যুগান্তরের ওপরও সেই আঘাত এসে পড়েছিল। যুগান্তর সেই অগ্নিপরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় যুগান্তরের নিজস্ব ভূমিকাটি কী? আমার মনে হয়েছে যুগান্তর শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পাঠকের যেমন কাগজ, তেমনি স্বল্পশিক্ষিত নিন্মবিত্ত মানুষেরও কাগজ। সুবিধাবাদী উচ্চবিত্ত সুশীল সমাজের মুখপত্র এটি নয়। সেই মুখপত্রের একটি আলাদা হাউস আছে। যুগান্তর সাংবাদিকতায় তার এ বৈশিষ্ট্যটি ধরে রেখেছে। সে কোনো বিশেষ শ্রেণীর মুখপত্র হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে যে দু-চারটি দৈনিক সাংবাদিকতায় শ্রেণী স্বার্থের মুখপত্র হয়ে ওঠেনি যুগান্তর তার একটি। উন্নত পশ্চিমা বিশ্বেও এখন সাংবাদিকতায় শ্রেণী বিভাজন ঘটেছে। মিডিয়া এখন কর্পোরেটগুলোর হাতের মুঠোয় এবং তাদের স্বার্থে পরিচালিত। বিলাতে টাইমস, টেলিগ্রাফ, এক্সপ্রেস প্রভৃতি দৈনিকগুলো ধনী ও শাসকশ্রেণীর মুখপত্র। এসব কাগজে সাধারণ মানুষের কথা বলা হয়, কিন্তু তাদের স্বার্থ ও অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং সূক্ষ্মভাবে তার বিরোধিতা করে। স্বল্পশিক্ষিত এবং কর্মজীবী সাধারণ মানুষের জন্য এক সময় মিরর নামে একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা বের করা হয়। ‘মিরর’ একটু বামঘেঁষা পত্রিকা। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এর প্রভাব রোধ করার জন্য অল্প দামের ট্যাবলয়েড পত্রিকা বের করা হয়েছিল, নাম ‘সান’। সেক্স, সাসপেন্স এবং নানারকম সত্য অসত্য উত্তেজক ছবি ও খবর প্রকাশ করে এ কাগজটি শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে তাদের রুটি-রুজির আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চালাত এবং এখনও চালায়। বিলাতে শিক্ষিত ও উদারপন্থী মধ্যবিত্তের জন্য একটি পত্রিকা আছে, নাম ‘গার্ডিয়ান’। মধ্যবিত্ত ব্রিটিশ পাঠকদের মধ্যে এ কাগজটির প্রচার বেশি। লন্ডনে এখন একটা কথা প্রচলিত। কথাটা হল- যারা দেশ শাসন করে তাদের মুখপত্র হল টাইমস, টেলিগ্রাফ প্রভৃতি পত্রিকা। যারা দেশ শাসন করতে চায়, তাদের মুখপত্র হল গার্ডিয়ান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি কাগজ। আর যারা কোনোদিন দেশ শাসনের সুযোগ পায় না, বরং শাসিত এবং নিপীড়িত শ্রেণী তাদের কাগজ হল মিরর,
মরনিং স্টার ইত্যাদি। বাংলাদেশে- তথা উপমহাদেশের সংবাদপত্র জগতে এ ধরনের বিভাজন তথা শ্রেণী বিভাজন এখনও হয়নি। একটা ব্রড বিভাজন আছে। সরকার-সমর্থক ও সরকারবিরোধী পত্রিকা। বিশেষভাবে পেশাজীবী শ্রেণীর কিছু ছোট ছোট পত্রিকা আছে। তার প্রচার সীমাবদ্ধ। অবিভক্ত বাংলায় কুষ্টিয়ার শামসুদ্দীন আহমদ কৃষক-প্রজার মুখপত্র হিসেবে দৈনিক কৃষক নামে একটি পত্রিকা বের করেছিলেন। সেটি পরবর্তীকালে কৃষক প্রজার পরিবর্তে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাগজে পরিণত হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ নামে কাগজ বের করেছিল। কৃষক শ্রমিক আন্দোলনের খবর তাতে বেশি থাকত। কিন্তু সর্বহারা শ্রেণীর কাগজের চেয়েও সেটি বেশি পার্টি-কাগজে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের দৈনিক গণশক্তিও শ্রমিক কৃষক শ্রেণীর মুখপত্র হওয়ার দাবিদার। আসলে পার্টি-কাগজ সেটিও। বাংলাদেশে ঠিক শ্রেণী চরিত্রের কাগজ নয়, বামপন্থী রাজনীতির মুখপত্র দৈনিক সংবাদ। কিন্তু বর্তমানে মিডিয়ায় নব্য ধনিকদের মালিকানার যুগে সংবাদও তার আগের চরিত্র হারিয়েছে। কেবল তার চরিত্র একটু বাম রাজনীতিঘেঁষা। একালের যুগান্তর এদিক থেকে বামঘেঁষা অথবা ডানঘেঁষা কোনোটিই নয়। বলা চলে প্রগতিশীল উদারনীতির কাগজ। সরকারের সমর্থক নয় আবার সরকারের বিরোধীও নয়। ভালো ও মন্দ কাজের নিরিখে সে সরকারকে সমর্থন দেয় অথবা সমালোচনা করে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ঘরে যেমন তার সমাদর রয়েছে, তেমনি তার মধ্যে রয়েছে স্বল্পশিক্ষিত নিন্ম মধ্যবিত্ত ও নানা পেশার মানুষের চাহিদা অনুযায়ী খবর, খবর-ভাষ্য এবং নানা ফিচার। উগ্র মৌলবাদী রাজনীতির সে বিরোধী এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় বিশ্বাসী। এক কথায় যুগান্তর যেমন সমাজের উঁচু তলার কাগজ, তেমনি নিচু তলারও। যুগান্তরের এ বৈশিষ্ট্যটা লক্ষ্য করার মতো। পত্রিকার শ্রেণী-বিভাজন নিয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। লন্ডনে আসার পর থেকে গার্ডিয়ান পত্রিকাটি পড়ি। অন্য কাগজ যেমন টাইমস, টেলিগ্রাফ যে পড়ি না, তা নয়। কিন্তু ঘরে রাখি গার্ডিয়ান। আমার মেজ মেয়ে চিন্ময়ী তখন স্কুলের হায়ার গ্রেডে ভর্তি হবে। তাকে পাড়ায় স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেছি। ইন্টারভিউয়ের সময় এক শিক্ষিকা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
তোমরা বাসায় কোন দৈনিক রাখ? আমার মেয়ে বলল ‘গার্ডিয়ান’। শিক্ষিকা একটু ঢোক গিলে বললেন, ওহ্, তোমরা মিডল ক্লাস! পত্রিকা পাঠের নিরিখে বিলাতে শ্রেণী-চরিত্র বিচার করা হয় এটা জেনে বিস্মিত হয়েছিলাম। পরে দেখেছি, বিচারটা ভুল নয়। টিউবে ট্রেনে বাসে দেখেছি সাধারণ মানুষের হাতে সান, মিরর, স্টার, পিপল ইত্যাদি কাগজ। এ ট্যাবলয়েডগুলো ওয়ার্কিং ক্লাসের মানুষের কাগজ বলে পরিচিত। টাইম, গার্ডিয়ান ট্রেনে বাসে বা সাধারণ মানুষের হাতে খুব একটা দেখা যায় না। সে জন্যই অভিজাত দৈনিক টাইমসের প্রচার যেখানে সাত কি আট লাখ, সানের প্রচার সেখানে চল্লিশ থেকে ষাট লাখ। সান বা মিররে আন্তর্জাতিক খবর বড় করে দেয়া হয় না। থাকে খুন, ধর্ষণ, জালিয়াতি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধের ফলাও খবর। সানে পৃষ্ঠাজোড়া নগ্নবক্ষ সুন্দরী তরুণীর ছবি তো ছিল এক সময় প্রধান আকর্ষণ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রুচিকে এখনও আঘাত করেনি। রম্য পত্রিকা অনেক আছে। কিন্তু তারা ওয়েস্টার্ন ন্যুডিজমকে অনুসরণ করে না। আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোও এদিক থেকে শ্রেণী বিভাজিত নয়। কয়েকটি পত্রিকার ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও অধিকাংশ দৈনিককেই সব শ্রেণীর পাঠকের পত্রিকা বলা চলে। এ ক্ষেত্রে যুগান্তরের বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি। যুগান্তর সংবাদ পরিবেশনে অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ। মন্তব্য প্রকাশে দল-নিরপেক্ষ। সব শ্রেণীর এবং মতের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বলেই যুগান্তর এখন বাংলাদেশের অগ্রগণ্য জাতীয় দৈনিকের একটি। যুগান্তরের সাংবাদিকতা সম্পর্কে বলতে পারি, বয়স আঠারো হলেও পত্রিকাটি এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে সব শ্রেণীর মানুষের দল-নিরপেক্ষ পত্রিকা হিসেবে। আগেই বলেছি, পত্রিকাটি মত-নিরপেক্ষ নয়। সেই মত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ও গণতন্ত্রের আদর্শ রক্ষার। এ ধরনের দৈনিকের দীর্ঘ আয়ু যেমন কামনা করি, তেমনি কামনা করি যুগান্তরের মতো কাগজের সংখ্যা দেশে আরও বাড়ুক।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, কবি ও কলামিস্ট

No comments:

Post a Comment