Wednesday, February 15, 2017

তিস্তার বুকে বিস্তীর্ণ বালুচর বদলে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য

তিস্তার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ির গজলডোবায় তিস্তা নদীর বাঁধের সবক’টি গেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে দেশের তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় নদীর পানির প্রবাহ আশংকাজনক হারে কমে গেছে। ব্যারাজের উজানে ও ভাটিতে নদীর বুকে বিশাল চর জেগে উঠেছে। হুমকির মুখে পড়েছে ওই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের প্রায় দুই লাখ হেক্টর বোরো ধান চাষের জমি। এ নিয়ে কৃষকদের মাঝে মারাত্মক উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন অফিস সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহ ধরে তিস্তা ব্যারাজ এলাকার পানির প্রবাহ মাত্র আট কিউসেকে নেমে এসেছে। ব্যারাজের সামনেই বিশাল এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চর। একসময়ের প্রমত্তা তিস্তা শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই শুষ্ক খালে পরিণত হয়েছে। এদিকে তিস্তা নদীর পানি সর্বনিন্ম পর্যায়ে নেমে আসার কারণে ব্যারাজ কমান্ড এলাকার দুই লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এবার বোরো মৌসুমে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করা যাবে। তাও রেশনিং পদ্ধতিতে। বাকি জমিতে সেচযন্ত্র বসিয়ে জমি তৈরি, চারা রোপণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী জানান, তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেয়ার পরও ব্যারাজের সামনে বিশাল চর পড়েছে। এ ছাড়া পুরো নদীতে অসংখ্য চর জেগে ওঠায় নৌকার পরিবর্তে হেঁটে নদী পারাপার করছে হাজার হাজার মানুষ। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে মূলত সেচ সুবিধা দেয়ার জন্যই তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যারাজ থেকে শুরু করে রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার দুই লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খাল খনন করা হয়েছে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই ভারত তিস্তা নদীতে তাদের অংশে উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে রেখেছে। ফলে বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিবারই এই শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানির প্রবাহ বন্ধ করে রাখলেও গত বছর এ মৌসুমে পানির প্রবাহ প্রয় দুই হাজার কিউসেক ছিল। কিন্তু এবার ফেরুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে তা এক হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় এপ্রিলের দিকে পানি প্রবাহ ক্রমাগত কমে আসছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার একর জমির বোরো ধান ক্ষেতের ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশংকা করছেন কৃষকরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ ঠিক রাখা ও সেচ সুবিধা দিতে কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার কিউসেক পানি থাকলেই চলে। কিন্তু ভারত তাও দিচ্ছে না। অন্যদিকে তিস্তা নদীসংলগ্ন বালু মাটি এলাকা, বিশেষ করে লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, নীলফামারী জেলার জলঢাকা, কিশোরীগঞ্জ, ডোমার, ডিমলা, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা তিস্তা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পখরচে পানি জমিতে দিয়ে বিশেষ করে বোরো ধান চাষ করে আসছে। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরুতেই ব্যারাজসংলগ্ন জলঢাকা উপজেলার ৮০ নম্বর শাখা খালে কোনো পানি নেই। এবারে পাউবো সেই খালে পানি সরবরাহ করতে পারেনি। একইভাবে চাপানির ৪০ নম্বর খালেও পানি সরবরাহ করতে পারছে না পাউবো। ফলে নীলফামারীর জলঢাকা, কিশোরীগঞ্জ ও লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার তিস্তার সেচনির্ভর ৪৫ ভাগ কৃষক এখন পর্যন্ত জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করতে পারেননি। অথচ ভারতের অংশে তিস্তায় গজলডোবায় পানি থই থই করছে বলে সীমান্তবর্তী এলাকাবাসী জানিয়েছেন। ওই এলাকার কৃষক মমতাজ উদ্দিন, আলেফ উদ্দিন, সালাম,
জহিরুলসহ অনেকে জানালেন, বালু মাটির এলাকা হওয়ায় এখানে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে পানি নিয়ে ধান চাষ করা সম্ভব নয়। কারণ ওই পানি এক ঘণ্টার বেশি থাকে না। এতে খরচও পড়ে অনেক বেশি। আর নদীর পানি প্রয়োজনমতো পাওয়া যায় বলে কোনো সমস্যা হয় না। এমন অবস্থায় তিস্তা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তিস্তা ব্যারাজের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, ব্যারাজ এলাকায় পানির প্রবাহ ছিল এখন ৭০০ থেকে ৮০০ কিউসেকের কাছাকাছি। ওই কন্ট্রোল রুমের নুর ইসলাম নামে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তা মাঝে মধ্যে হাজার কিউসেকে এলেও তা ক্ষণস্থায়ী হয়। এ ব্যাপারে তিস্তা ব্যারাজের প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জানান, পানির প্রবাহ কমপক্ষে তিন-চার হাজার কিউসেক থাকলে কোনো রকমে রেশনিং পদ্ধতিতে সরবরাহ করা যাবে। এ জন্য ভারত সরকারের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করা দরকার। তারা আপাতত তাদের গজলডোবা ব্যারাজের কয়েকটি গেট খুলে দিলেই পানি সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তিনিও জানান, তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় পানির প্রবাহ বর্তমান ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এদিকে ভারত একতরফা পানির প্রবাহ বন্ধ করে রাখায় রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী বেকার হয়ে পড়েছেন। সেই সঙ্গে পুরো তিস্তা নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রায় সহস াধিক খেয়াঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মাঝি পরিবার, যারা কেবল নৌকা চালিয়ে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। এ অবস্থায় রংপুর অঞ্চলসহ আশপাশের আট জেলা মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment